পুনরায়নীকরণ
পুনরায়নীকরণ (ইংরেজি ভাষায়: Reionization) বলতে এমন এক প্রক্রিয়া বোঝায় যার মাধ্যমে অন্ধকার যুগের পর মহাবিশ্বের বস্তুগুলো আয়নীত হয়েছিল। পুনরায় আয়নীকরণ বলার কারণ, প্রথমবারের মত যখন বস্তুকণা তৈরি হয়েছিল তখন সেগুলো আয়নীত অবস্থায়ই ছিল। মহা বিস্ফোরণের ৪০০,০০০ বছর পর সেই আয়নীত কণাগুলো মিলিত হয়ে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন পরমাণু গঠিত হয়। সে সময় মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ বিচ্ছুরিত হয় এবং অন্ধকার যুগের সূচনা ঘটে। পুনরায়ীকরণের মাধ্যমেই আবার অন্ধকার যুগ শেষ হয়। অন্ধকার যুগ বলার কারণ এই যুগে দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ নিঃসরণ করার মত কোন উৎস ছিল না। প্রথম দিককার তারা, কোয়েজার, কৃষ্ণ বিবর, গামা রশ্মি বিস্ফোরণ এবং অতিনবতারা গঠনের মাধ্যমেই আসলে আয়নীকরণ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল।
পরিচ্ছেদসমূহ |
পুনরায়নীকরণের ইতিহাস [সম্পাদনা]
মহা বিস্ফোরণ ঘটার মাত্র তিন সেকেন্ডের মাথায় ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রিনো, তাদের প্রতিকণা এবং ফোটন তৈরি হয়। তাপমাত্র অনেক বেশি থাকায় সে সময় বিচ্ছিন্ন ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলে পরমাণু গঠন করতে পারছিল না। সময়ের সাথে সাথে মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে এবং এর তাপমাত্রাও কমতে থাকে। মহা বিস্ফোরণের ৪০০,০০০ বছর পর (যার লাল সরণ, z=১১০০) তাপমাত্রা ৩০০০ কেলভিনে নেমে আসে। এই তাপমাত্রায় প্রোটন এবং ইলেকট্রন মিলে পরমাণু গঠন করে, যাকে পুনর্মিলন নামে ডাকা হয়। এ সময় কণা এবং বিকিরণের যুগলায়ন (coupling) ভেঙে যায় এবং বিকিরণ মুক্ত হয়ে সমগ্র মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ মহাবিশ্ব সে সময় অনচ্ছ থেকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। এর মাধ্যমে অন্ধকার যুগের সূচনা ঘটে। এই যুগে মহাবিশ্ব ছিল স্বচ্ছ। কারণ অনচ্ছ করার জন্য কণা-বিকিরণ যুগলায়নের প্রয়োজন পড়ে। পরমাণুর মধ্যস্থিত ইলেকট্রন কোন নির্দিষ্ট শক্তিস্তর থেকে উপরের শক্তিস্তরে যাওয়ার জন্য শক্তি শোষণ করে, পরে যখন সে আবার পূর্বের শক্তিস্তরে ফিরে আসা তখন শোষিত শক্তিটি তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ হিসেবে নিসৃত হয়। এর মাধ্যমেই মহাবিশ্বে অনচ্ছতা তৈরি হয়। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পরমাণুর মধ্যকার ইলেকট্রনকে এভাবে আয়নীত করার মত কোন শক্তি সে সময় ছিল না বিধায় মহাবিশ্ব স্বচ্ছ থাকে। উল্লেখ্য, পুনর্মিলনের আগে কণা-প্রতিকণার অবিরাম সৃষ্টি ও পুনর্বিলয়ের মাধ্যমে যে কণা-বিকিরণ যুগলায়ন ঘটছিল তার মাধ্যমেই অনচ্ছতার সৃষ্টি হয়েছিল।
অন্ধকার যুগ চলতে থাকে। পুনর্মিলনের সময় মহাবিশ্ব প্রায় সমসত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও এর মধ্যে কিছুটা ঘনত্বের হেরফের ছিল যাকে ঘনত্বের ফ্লাকচুয়েশন বলা হয়। এই ফ্লাকচুয়েশন মহাবিশ্বের প্রসারণের সাথে সাথে বিবর্তিত হতে থাকে। এই বিবর্তনকে লিনিয়ার বিবর্তন বলা হয়, এই সময়কার সকল ঘটনাকে লিনিয়ার গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু লিনিয়ার বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি ফ্লাকচুয়েশনের ঘনকীয় ধ্বসের (spherical collapse) মাধ্যমে তৈরি হয় নন-লিনিয়ার বিবর্তনের। এর মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত ঘন অঞ্চলগুলোতে বেশি বস্তুকণা জমা হতে থাকে এবং বিভিন্ন ছোট ছোট ছায়াপথ গঠিত হয়। এগুলোকে বামন ছায়াপথ নামে ডাকা হয়। এই ছায়াপথগুলোর মধ্যেই প্রথমবারের মত আলোক নিঃসরণে সক্ষম উৎস গঠিত হয়। এই উৎসগুলো বিভিন্ন কম্পাঙ্কের তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ নিঃসরণ করতে থাকে। সে সময় গঠিত কোয়েজার থেকে এ ধরনের বিকিরণের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রথম দিককার পপুলেশন ৩ তারাগুলো অতিবেগুনী রশ্মি নিঃসরণ করত, আর কৃষ্ণ বিবর থেকে নিসৃত হতো এক্স রশ্মি।
এই অতিবেগুনী ও এক্স রশ্মি এবং এই পরিমাণ শক্তি বিশিষ্ট বিকিরণগুলোই আন্তঃছায়াপথীয় মাধ্যমের হাইড্রোজেনকে আয়নীত করে। উল্লেথ্য সব হাইড্রোজেনই বামন ছায়াপথগুলোর মধ্যে ছিল না, বরং এক ছায়াপথ থেকে অন্য ছায়াপথের মধ্যবর্তী স্থানেও হাইড্রোজেন ছিল। সেখানে অবশ্য ঘনত্ব অনেক কম ছিল। হাইড্রোজেনকে আয়নীত করার মত শক্তি সম্পন্ন উৎসগুলো ছায়াপথের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তারা ছায়াপথের মধ্যকার হাইড্রোজেনকে আয়নীত করতে পারেনি। কারণ আয়নীত হওয়ার সাথে সাথেই সেগুলো পুনর্মিলিত হয়ে যাচ্ছি। অধিক ঘনত্বের কারণে তাদেরকে আলাদা রাখার মত শক্তি উৎসগুলোর ছিল না। কিন্তু যেসব বিকিরণ উৎস থেকে নিসৃত হয়ে ছায়াপথ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল সেগুলো আন্তঃছায়াপথীয় মাধ্যমের অনেক কম ঘনত্ববিশিষ্ট হাইড্রোজেনকে আয়নীত করতে পারছিল এবং সেগুলো পুনর্মিলিত হওয়ার সুযোগও অনেক কম পাচ্ছিল। তাই পরিশেষে আয়নীকরণেরই জয় হয়। এই আয়নীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে মহা বিস্ফোরণের ১৫০ মিলিয়ন বছর পর। অনেকে মনে করেন ১ বিলিয়ন বছর পর পর্যন্ত এটা চলেছিল। তার মানে ২০>z>৬ এর মধ্যেই ঘটেছিল পুনরায়নীকরণ।
পুনরায়নীকরণ কোন আকস্মিক প্রক্রিয়া নয়। হঠাৎ শুরু হয়ে আবার হঠাৎ শেষ হয়ে যায়নি। পালিয়ে আসা বিকিরণের মাধ্যমে আন্তঃছায়াপথীয় মাধ্যমে আয়নিত হাইড্রোজেন বুদবুদের সৃষ্টি হচ্ছিল। এগুলোকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় H II অঞ্চল নামে ডাকা হয়। এই বুদবুদগুলো ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে। একসময় এক বুদবুদের সাথে অন্য বুদবুদের উপরিপাতন ঘটে। এভাবে পুরো আন্তঃছায়াপথীয় মাধ্যমই আয়নিত হাইড্রোজেনের বুদবুদে ছেয়ে যায়। আয়নিত থাকা অবস্থায় হাইড্রোজেন তথা মুক্ত ইলেকট্রন ও প্রোটন ফোটন শোষণ বা নিঃসরণ করতে পারে না। কিন্তু তাদের সাথে লেগে সে সময় ফোটন বিক্ষিপ্ত হতে পারে। কিন্তু আয়নিত তথা প্লাজমা অবস্থার ঘনত্ব অনেক কম থাকায় সে বিক্ষেপণও ছিল বেশ বিরল, ঘন ঘন ঘটে না আর কি। তাই যে মহাবিশ্বে কম ঘনত্বের আয়নিত হাইড্রোজেন বিদ্যমান সেটি তুলনামূলকভাবে ট্রান্সলুসেন্ট হবে। মহাবিশ্ব বর্তমানে এই অবস্থায়ই আছে।
আরও দেখুন [সম্পাদনা]
- মহা বিস্ফোরণ
- কোয়েজার
- হাইড্রোজেন শ্রেণী (২১ সেমি শ্রেণী)
তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]
বহিঃসংযোগ [সম্পাদনা]
|
||||||||