নীলগাই

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নীলগাই
Nilgai.jpg
পুরুষ নীলগাই
সংরক্ষণ অবস্থা
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Animalia
পর্ব: Chordata
শ্রেণী: Mammalia
বর্গ: Artiodactyla
পরিবার: Bovidae
উপপরিবার: Bovinae
গণ: Boselaphus
Blainville, 1816
প্রজাতি: B. tragocamelus
দ্বিপদী নাম
Boselaphus tragocamelus
(Pallas, 1766)

নীলগাই (Bocephalus tragocamelus) (ইংরেজী: Bluebull) ভারতীয় উপমহাদেশে অ্যান্টিলোপ জাতীয় প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। পুরুষ অ্যান্টিলোপ নীলগাও নামেও পরিচিত।

ভৌগোলিক বিস্তার[সম্পাদনা]

ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলেই নীলগাই দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মালাবার উপকূলবঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলগুলো বাদে উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে কর্ণাটক প্রদেশ পর্যন্ত এদের দেখা মেলে। এছাড়া পাকিস্তাননেপালের ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় নীলগাই দেখা যায়।[১] চীনেও নীলগাই রয়েছে বলে জানা যায়।[২] ১৯৫০ এর পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে নীলগাই দেখা গেলেও বর্তমানে তা বিলুপ্ত।[৩] যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে নীলগাই অবমুক্ত করা হয়েছে।

বিবরণ[সম্পাদনা]

মুখের গঠনঃ অঙ্কিত চিত্র

নীলগাই এমনিতে সুন্দর, তবে দেখতে অনেকটা বিদঘুটে চেহারার ঘোড়ার মত। দেহের পেছনের দিক কাঁধ থেকে নীচু। কারণ সামনের পা পেছনের পা থেকে লম্বা। ঘাড়ে বন্য শূকরের কেশরের মত গাঢ় লোম থাকে। পুরুষ সদস্যের গায়ের রং ধূসর। অনেকসময় গায়ে নীলচে আভা দেখা যায় বলে এদের নীলগাই নামকরণ। স্ত্রী নীলগাই ও বাচ্চা লালচে বাদামী কিন্তু বয়স্ক পুরুষ গাঢ় ধূসর, প্রায় কালচে রঙের। খুরের উপরের লোম সাদা এবং প্রত্যেক গালে, চোখের নীচে ও পেছনে দুটি সাদা ছোপ থাকে। ঠোঁট, থুতনি, কানের ভেতরের দিক ও লেজের নিচের তল সাদাটে।[৪]

পুরুষেরই শুধু শিং হয়। শিং দুটি মসৃণ, ছোট কোণাকার ও সামনের দিকে সামান্য বাঁকানো। শিঙের গোড়া ত্রিকোণ, ডগায় বৃত্তাকার।

দেহের মাপ[সম্পাদনা]

পুরুষ নীলগাইয়ের উচ্চতা সাধারণত ১৩০-১৪০ সেন্টিমিটার (৫২-৫৬ ইঞ্চি)। তবে ১৫০ সেন্টিমিটার (৫৮ ইঞ্চি) পর্যন্তও হতে পারে। স্ত্রী নীলগাই আকারে একটু ছোট হয়। শিঙের দৈর্ঘ্য গড়ে ২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি), রেকর্ড পরিমাণ দৈর্ঘ্য ২৯.৮ সেন্টিমিটার (১১.৭৫ ইঞ্চি)।[৪]

বিচরণস্থল[সম্পাদনা]

নীলগাই ছোট ছোট পাহাড় আর ঝোপ-জঙ্গলপূর্ণ মাঠে চড়ে বেড়াতে ভালবাসে। ঘন বন এড়িয়ে চলে।

আচরণ[সম্পাদনা]

সচরাচর ৪ থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়েই নীলগাই ঘুরে বেড়ায়। দলে কখনও ২০ বা তার বেশি সদস্যও থাকতে পারে। শিশু-যুবা-বৃদ্ধ একসঙ্গে থাকে।

নীলগাই গাছেঢাকা উঁচুনিচু সমতলে বা তৃণভূমিতে যেমন স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারে, তেমনি আবার শস্যক্ষেত্রে নেমে ব্যাপক ক্ষতি করতে পটু। সকাল আর বিকেলে খাওয়ার পাট চুকিয়ে দিনের বাকি সময়টা গাছের ছায়ায় বসে কাটায়। মহুয়া গাছের রসালো ফুল এদের দারুণ পছন্দ। পানি ছাড়া এরা দীর্ঘসময় কাটিয়ে দেয়, এমনকি গরমের দিনেও এরা নিয়মিত পানি খায় না।[৪] আত্মরক্ষার প্রধান উপায় দৌড়ে পালানো। দ্রুতগামী ও শক্তিশালী ঘোড়ার পিঠে না চড়ে নীলগাই ধরা প্রায় অসম্ভব।

গন্ডারের মত নীলগাইও একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মলত্যাগ করে ঢিবি বানিয়ে ফেলে।[৪]

সাংস্কৃতিক লেখালেখি[সম্পাদনা]

বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তাঁর আরণ্যক উপন্যাসে বার বার নীলগাইয়ের উল্লেখ করেছেন। বিহারের কড়া গ্রীষ্মের ভয়াবহতা বোঝাতে উপন্যাসের একজায়গায় তিনি লিখেছেন-

উষ্ণ বাতাস অর্ধশুষ্ক কাশ-ডাঁটার গন্ধে নিবিড় হইয়া উঠিয়াছে, লোকালয় হইতে বহু দূরে আসিয়াছি, দিগ্বিদিকের জ্ঞান হারাইয়া ফেলিয়াছি। কুণ্ডীতে প্রায় নিঃশব্দে জল খাইতেছে এক দিকে দুটি নীলগাই, অন্য দিকে দুটি হায়েনা; নীলগাই দুটি একবার হায়েনাদের দিকে চাহিতেছে, হায়েনারা একবার নীলগাই দুটির দিকে চাহিতেছে- আর দু’দলের মাঝখানে দু-তিন মাস বয়সের এক ছোট নীলগাইয়ের বাচ্চা। অমন করুণ দৃশ্য কখনো দেখি নাই-দেখিয়া পিপাসার্ত বন্য জন্তুদের নিরীহ শরীরে অতর্কিতে গুলি মারিবার প্রবৃত্তি হইল না।[৫]

কবি শহীদ কাদরী তাঁর কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই কাব্যগ্রন্থের সঙ্গতি কবিতাটিতে নীলগাইয়ের উল্লেখ করেছেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ Mallon, D.P. (2008). Boselaphus tragocamelus. 2008 IUCN Red List of Threatened Species. IUCN 2008. Retrieved on 29 March 2009. Database entry includes a brief justification of why this species is of least concern.
  2. [১], কোকোসিলির কয়েক হাজার নীলগাই মূল বিচরণভূমিতে ফিরে যাচ্ছে, চীন আন্তর্জাতিক বেতার, বাংলা বিভাগ।
  3. Mammals of Bangladesh: a field guide,M. A. R. Khan, Nazma Reza, Dhaka, 1985.
  4. ৪.০ ৪.১ ৪.২ ৪.৩ বাংলাদেশের বিলুপ্ত বন্যপ্রাণী, গাজী এস. এম. আসমত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা (২০০১), পৃ. ৮৯-৯০।
  5. [২], আরণ্যক, তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

External links[সম্পাদনা]