ধলাপেট সিন্ধুঈগল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ধলাপেট সিন্ধুঈগল
WB Sea Eagle Pounce.jpg
সংরক্ষণ অবস্থা
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Animalia
পর্ব: Chordata
শ্রেণী: Aves
বর্গ: Falconiformes
(বা Accipitriformes, q.v.)
পরিবার: Accipitridae
গণ: Haliaeetus
প্রজাতি: H. leucogaster
দ্বিপদী নাম
Haliaeetus leucogaster
Gmelin, 1788
Haliaeetus leucogaster distr.png
ধলাপেট সিন্ধুঈগলের বিস্তৃতি
প্রতিশব্দ

Ichthyaetus blagrus Blyth, 1843

ধলাপেট সিন্ধুঈগল (বৈজ্ঞানিক নাম: Haliaeetus leucogaster) (ইংরেজি: White-bellied Sea Eagle), সাদা ঈগল বা কেবলই সিন্ধুঈগল Accipitridae (অ্যাক্সিপিট্রিডি) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত Haliaeetus (হ্যালিয়েইটাস) গণের এক প্রজাতির বড় আকারের সামুদ্রিক শিকারী পাখি।[১][২] ধলাপেট সিন্ধুঈগলের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ ধলাপেট সিন্ধুঈগল (লাতিন: Haliaeetus = সামুদ্রিক ঈগল; গ্রিক: leucos = সাদা, gaster = পেট)।[২] সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫১ লাখ ৩০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে এদের আবাস।[৩] বিগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা ক্রমেই কমে গেলেও আশংকাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছেনি। সেকারণে আই. ইউ. সি. এন. এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে।[৪] বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।[২] ধলাপেট সিন্ধুঈগল একপ্রজাতিক, অর্থাৎ এর কোন উপপ্রজাতি নেই। পৃথিবীতে এদের সংখ্যা সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় নি। তবে ধারণা করা হয় মোট প্রাপ্তবয়স্ক ধলাপেট সিন্ধুঈগলের সংখ্যা ৬৭০-৬৭০০টি।[৩]

বিস্তৃতি[সম্পাদনা]

এশিয়াওশেনিয়ার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা ধলাপেট সিন্ধুঈগলের প্রধান বিচরণস্থল। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, পূর্ব তিমুর, পাপুয়া নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়াভিয়েতনাম জুড়ে এদের বিস্তৃতি।[৪] নিউজিল্যান্ডে এদের দেখতে পাওয়া যায় বলে অনেকক্ষেত্রে দাবি করা হলেও তা প্রমাণিত হয়নি।[৫]

বিবরণ[সম্পাদনা]

ধলাপেট সিন্ধুঈগল

ধলাপেট সিন্ধুঈগল ধূসর পিঠ ও সাদা দেহতলের বৃহদাকার শিকারী পাখি। এর দৈর্ঘ্য কমবেশি ৬৮ সেন্টিমিটার, ডানা ৫৬.৫ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৫.১ সেন্টিমিটার, পা ৯.৫ সেন্টিমিটার ও লেজ ২৩.৫ সেন্টিমিটার।[২] পুরুষ পাখির ওজন ২.৫ থেকে ৩.৭ কিলোগ্রাম। স্ত্রী পাখি সাধারণত ২.৮ থেকে ৪.২ কিলোগ্রাম হয়।[৫] প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী পাখি পুরুষ পাখির থেকে আকারে সামান্য বড়। পূর্ণবয়স্ক পাখির পিঠ ধূসর এবং পেট ও বুক সাদা। মাথা, ঘাড়, ডানার নিচের ডানা ঢাকনি ও লেজও সাদা। লেজের গোড়া ধূসর। ডানার গোটানো অংশ লেজের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে। ওড়ার সময় ডানার কালো অংশ ও মধ্য পালক স্পষ্ট দেখা যায়। ডানা V আকারে মেলে ধরে আকাশে উড়ে বেড়ায়। মজবুত ঠোঁট কালচে। পা ও পায়ের পাতা ধূসরাভ সাদা। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারা একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ বাদামি। বুক লালচে-পীতাভ রঙের। ঊরুসহ দেহতল সাদাটে-পীতাভ। মাথা ও ঘাড় লালচে-বাদামি। বুকের উপরের অংশ হালকা বাদামি, পেট লালচে-সাদা। লেজ সাদাটে, প্রান্তীয় ফিতা বাদামি ও আগা ফিকে রঙের।[২] বহু বছর ধরে ধাপে ধাপে পালক পরিবর্তন করে অপ্রাপ্তবয়স্ক ঈগল পূর্ণবয়স্ক ঈগলের রঙ ধারণ করে।

স্বভাব[সম্পাদনা]

আবাস[সম্পাদনা]

ধলাপেট সিন্ধুঈগল মূলত সমুদ্রের পাখি। বিস্তীর্ন জলাশয় এদের পছন্দের আবাস। এদের প্রধানত সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এছাড়া সাগরের তীর থেকে দূরের চর, প্যারাবন, লেগুন এবং কখনও বড় নদী ও মিঠাপানির হ্রদেও উড়ে বেড়ায়।[২] বড় নদীর মোহনা ও অভ্যন্তরীন জলাভুমিতে এদের দেখা গেছে। এমনকি ঘাসবন, ঘন বন ও হালকা ঝোপযুক্ত সমতল মাঠের উপর দিয়েও এরা চক্ক কেটে বেড়ায়। সমুদ্র-সমতল থেকে ১৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিচরণ করতে পারে।[৫]

সাধারণত ধলাপেট সিন্ধুঈগল একা কিংবা জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়। অন্য কোন প্রজাতির সাথে এদের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায় না।

ডানামেলা সিন্ধুঈগল, কর্ণাটক, ভারত

খাদ্যাভ্যাস[সম্পাদনা]

ধলাপেট সিন্ধুঈগল মোহনা ও উপকূলীয় বনের বড় বড় গাছের পানির উপর বিস্তৃত ডালে ঘন্টার পর ঘণ্টা বসে শিকারের জন্য অপেক্ষা করে। এরা পানির দিকে তাক করে বসে থাকে। আবার উড়ে উড়েও শিকার ধরতে পারে। পানির ২০-৩০ মিটার উপরে এরা মন্থর গতিতে বৃত্তাকারে উড়ে বেড়ায়। শিকার দেখতে পেলে ছোঁ মেরে আথবা হালকা চালে ভেসে এসে পায়ের নখর বিঁধিয়ে শিকার ধরে।[৬] পানিতে বেশি শিকার ধরে, মাটি থেকে কম ধরে। শিকার ধরে উড়ে গিয়ে কোন গাছের ডালে বসে খায়। শিকার ছোট হলে উড়ন্ত অবস্থাতেই খেয়ে নেয়। কিছু খাদ্য এরা আবার মাটিতে নেমে খায়। প্রায়শ অন্যান্য শিকারী পাখি ও সামুদ্রিক পাখির খাবার এরা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। খাবারের উচ্ছিষ্ট পাওয়ার লোভে এদের ডলফিন ও মানুষের পিছু পিছু উড়ে বেড়াতে দেখা গেছে।[৭]

ধলাপেট সিন্ধুঈগলের খাদ্যতালিকায় রয়েছে সাপ, মাছ, কাঁকড়া, ইঁদুর, অন্যান্য ছোট প্রাণী ও পাখি।[২]

ডাক[সম্পাদনা]

ধলাপেট সিন্ধুঈগল সচরাচর উচ্চস্বরে নাকিসুরে ডাকে: কা....কা....কা...। প্রজননকালে স্ত্রী পাখি নাকিসুরে ডাকে: কাঙ্ক....কাঙ্ক....কাঙ্ক...; পুরুষ ঈগল দ্রুত পুনঃপুনঃ ডাকে: ক্যান...ক্যান...ক্যান....ক্যান....[২]

প্রজনন[সম্পাদনা]

ধলাপেট সিন্ধুঈগল, ডারউইন, অস্ট্রেলিয়া

ধলাপেট সিন্ধুঈগল সারাজীবনের জন্য জোড়া বাঁধে। অবশ্য জোড়ার একটি মারা গেলে অপরটি খুব দ্রুত সঙ্গী খুঁজে নেয়।[৮] অক্টোবর থেকে জানুয়ারি এদের প্রধান প্রজনন ঋতু[২] স্থানভেদে প্রজনন ঋতুর বিভিন্নতা দেখা যায়।

এরা উঁচু গাছের শক্ত ডালে, ঝোপ-ঝাড়ে, গুহায়, পাহাড়ের অভিক্ষেপে, মাটিতে এমনকি মনুষ্যনির্মিত বাসায় বাসা করে।[৮] বাসা বিশাল ও আগোছালো প্রকৃতির। সাধারণত গাছের ডাল ও পাতা দিয়ে বাসা বানায়। এক জোড়া ঈগল বছরের পর বছর একই এলাকায় বসবাস করে এবং কখনও কখনও একই বাসা মেরামত করে বাচ্চা তোলে। অনেকসময় অতিরিক্ত ভারে বাসা ভেঙে পড়ে যায়।[১] বাসা বানানো হয়ে গেলে ২-৩টি ডিম পাড়ে। ডিমের রঙ সাদা বা ফ্যাকাসে সাদা। ডিমের মাপ ৭.৭ × ৫.৩ সেন্টিমিটার।[২] স্ত্রী ঈগল বেশিরভাগ সময় ধরে তা দেয়। প্রায় ছয় সপ্তাহ পরে ডিম ফুটে ছানা বের হয়।[৯] বাবা-মা দু'জনেই সন্তান প্রতিপালন করে ও খাওয়ানোর ভার নেয়। ৬৫-৭০ দিন পর্যন্ত ছানারা বাসায় থাকে। উড়তে শেখার তিন মাস পর পর্যন্ত ছানারা বাবা-মার সাথে থাকে। চার মাস পরে তারা পিতা-মাতা কর্তৃক বিতাড়িত হয় ও নিজস্ব এলাকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়।[১০] ছয় বছর বয়সে এরা প্রজননক্ষম হয়। খুব কম সংখ্যক ছানাই পূর্ণবয়স্ক সিন্ধুঈগলে পরিণত হতে পারে। এরা ত্রিশ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ রেজা খান, বাংলাদেশের পাখি (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০০৮), পৃ. ১৮৬।
  2. ২.০ ২.১ ২.২ ২.৩ ২.৪ ২.৫ ২.৬ ২.৭ ২.৮ ২.৯ জিয়া উদ্দিন আহমেদ (সম্পা.), বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ: পাখি, খণ্ড: ২৬ (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৯), পৃ. ২৩৬।
  3. ৩.০ ৩.১ Haliaeetus leucogaster, BirdLife International এ ধলাপেট সিন্ধুঈগল বিষয়ক পাতা।
  4. ৪.০ ৪.১ Haliaeetus leucogaster, The IUCN Red List of Threatened Species এ ধলাপেট সিন্ধুঈগল বিষয়ক পাতা।
  5. ৫.০ ৫.১ ৫.২ White-bellied Sea-Eagle, Department of Sustainability, Environment, Water, Population and Communities, Australian Government.
  6. del Hoyo, J., A. Elliott & J. Sargatal, (eds.), Handbook of Birds of the World. In: Volume 2: New World Vultures to Guineafowl, (Barcelona: Lynx Edicions, 1994).
  7. Ferguson-Lees, J. & D.A. Christie, Raptors of the World, (London: Christopher Helm, 2001).
  8. ৮.০ ৮.১ Marchant, S. & P.J. Higgins, (eds.), Handbook of Australian, New Zealand and Antarctic Birds. Volume 2 - Raptors to Lapwings (Melbourne, Victoria: Oxford University Press, 1993).
  9. Bilney, R.J. & W.B. Emison, "Breeding of the White-bellied Sea-eagle in the Gippsland Lakes Region of Victoria, Australia". Australian Bird Watcher, vol. 10, 1983, p. 61-68.
  10. Hollands, D. Eagles, Hawks and Falcons of Australia, Second Edition, (Melbourne: Bloomings Books, 2003).

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]