দ্য সুইমিং হোল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দ্য সুইমিং হোল
The Swimming Hole
শিল্পী টমাস এয়াকিনস
বছর ১৮৮৪-৮৫
ধরন ক্যানভাস তৈলচিত্র
আয়তন ৭০ সেমি × ৮৯ সেমি ×  (27⅜ ইঞ্চি × 36⅜ ইঞ্চি)
অবস্থান আমোন কার্টার মিউজিয়াম, ফোর্ট ওয়ার্থ, টেক্সাস

দ্য সুইমিং হোল (ইংরেজি: The Swimming Hole) আমেরিকান চিত্রশিল্পী টমাস এয়াকিনস (১৮৪৪-১৯১৬) অঙ্কিত একটি চিত্র। এটি সুইমিং বা দ্য ওল্ড সুইমিং হোল নামেও পরিচিত। চিত্রটি টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের আমোন কার্টার মিউজিয়ামের গুডরিচ ক্যাটালগ#১৯০-এ রক্ষিত। এটি একটি ক্যানভাস তৈলচিত্র। হ্রদের জলে ছয় জন পুরুষের নগ্ন স্নানের দৃশ্য এই ছবিতে আঁকা হয়েছে। আমেরিকার চিত্রকলার ইতিহাসে এই ছবিটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হিসাবে পরিগণিত হয়।[১] শিল্প ঐতিহাসিক ডোরিন বোলগারের মতে, এটি "সম্ভবত এয়াকিনস অঙ্কিত নগ্ন দেহের সর্বাপেক্ষা অধিক রুচিসম্পন্ন চিত্রণ।"[২] ছবিটিকে "তাঁর অঙ্কিত বহির্দ্বার চিত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে সুচারুভাবে অঙ্কিত" বলেও মনে করা হয়।[৩] রেনেসাঁর সময় থেকেই মানবদেহকে শিল্পীর প্রশিক্ষণের মূল ভিত্তি এবং শিল্পের সর্বাপেক্ষা জটিল বিষয়বস্তু মনে করা হয়ে থাকে।[৪] অন্যদিকে নগ্নচিত্র ছিল পেনসিলভানিয়া অ্যাকাডেমি অফ দ্য ফাইন আর্টসে এয়াকিনসের শিক্ষাপ্রদান কর্মসূচির প্রধান বিষয়বস্তু।[২] এয়াকিনসের ক্ষেত্রে এই ছবিটি ছিল মানবদেহ অঙ্কনে তাঁর দক্ষতা প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ।

এই ছবিতে এয়াকিনস নগ্নতার প্রতি সাধারণ শোভনতাপ্রিয় ভিক্টোরিয়ান মানসিকতার এক ব্যতিক্রমের সুযোগ গ্রহণ করেছেন: নগ্ন সাঁতার সেযুগে সর্বজনগ্রাহ্য ছিল।[৫] বিশেষ করে, পুরুষদের প্রকাশ্য স্থানেও নগ্ন হয়ে সাঁতার কাটতে দেখা যেত। এয়াকিনসই হলেন প্রথম আমেরিকান শিল্পী যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষের জীবনযাত্রার এই প্রকাশ্য নগ্নতাটুকুকে চিত্রায়িত করেন। দ্য সুইমিং হোল তাঁর আগের কয়েকটি ছবিতে ব্যবহৃত বিষয়বস্তুর উন্নততর রূপ। পশ্চাদ্দেশ ও দ্ব্যর্থতাবোধক মানবদেহ অঙ্কনে তাঁর প্রবণতাটি এখানে বিশেষভাবে লক্ষিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর অঙ্কিত মানবদেহটি পুরুষের দেহ না নারীর দেহ তা বোঝাই দুষ্কর হয়ে পড়ে। একই থিম এর আগে লক্ষিত হয়েছে তাঁরই আঁকা দ্য গ্রস ক্লিনিক (১৮৭৫) ও উইলিয়াম রাশ (১৮৭৭) ছবিদুটিতে। পরবর্তীকালেও তাঁর মুষ্টিযোদ্ধা চিত্রমালা (টেকিং দ্য কাউন্ট, স্যালুট্যাটবিটুইন রাউন্ডস) এবং মল্লযোদ্ধা চিত্রে (রেসলারস) তিনি এই পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন।[৬]

পুরুষদের স্নানদৃশ্য পাশ্চাত্য শিল্পে একটি সুপরিচিত ধারণা। মাইকেলেঞ্জেলো থেকে দমিয়ার পর্যন্ত বহু শিল্পী এই বিষয়টিকে উপজীব্য করেছেন তাঁদের শিল্পকর্মে।[৭] কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান শিল্পে এই এয়াকিনসের এই ছবিটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। দ্য সুইমিং হোল ছবিটি "মার্কিন শিল্পের হোমোইরোটিসিজমের একটি বহুউল্লিখিত প্রধান উদাহরণ"।[৮] ২০০৮ সালে শিল্প সমালোচক টম লুবক এয়াকিনসের ছবিটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:


[এটি] মার্কিন চিত্রকলার ইতিহাসে একটি ধ্রুপদি সৃষ্টি। এই ছবিতে ধরা আছে স্বাস্থ্যকর, পুরুষালি বহির্দ্বার কার্যকলাপের দৃশ্য: একদল অল্পবয়স্ক ছেলে জলে ডুব দেওয়ার আগে জামাকাপড় খুলে রাখছে। শিল্পী ও তাঁর ছাত্রদের একটি সাঁতার ক্রীড়ার আয়োজন এই ছবির ভিত্তি। এয়াকিনস নিজে অবতীর্ণ হয়েছেন জলের নিচের ডানদিকে – সাক্ষর ভঙ্গিমায়, যাতে তিনি কথা বলতে পারেন।"[৯]

নাম ও অঙ্কন-কৌশল[সম্পাদনা]

ডাইং গল, ক্যাপিটোলাইন মিউজিয়ামস, রোম। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত এই হেলেনীয় শিল্পকর্মটিকে ছবির একেবারে বাঁয়ের আধ-শোয়া অবয়বটির উৎস মনে করা হয়।[১০]

১৮৮৫ সালে এয়াকিনস তাঁর ছবিটির নাম দেন সুইমিং। এরপর ১৮৮৬ সালে তিনি এটির নামকরণ করেন দ্য সুইমারসদ্য সুইমিং হোল নামটি ১৯১৭ সালে শিল্পীজায়া সুসান ম্যাকডাওয়েল এয়াকিনস শিল্পীর মৃত্যুর এক বছর বাদে দিয়েছিলেন।[২] চার বছর বাদে তিনি জেমস হুইটকম রিলে রচিত "দি ওল্ড সুইমিং'-হোল" কবিতার নামানুসারে তিনি ছবিটির নামকরণ করেন দি ওল্ড সুইমিং হোল[১১][১২] আমোন কার্টার মিউজিয়াম এয়াকিনসের দেওয়া মূল নাম সুইমিং বজায় রাখে।[১৩]

এই ছবিতে দেখানো হয়েছে এয়াকিনস পাঁচ জন বন্ধু বা ছাত্রের সঙ্গে ফিলাডেলফিয়ার বাইরে মিল ক্রিকে অবস্থিত ডোভ লেক নামে একটি কৃত্রিম হ্রদে স্নান করছেন।[২] প্রত্যেকেই জলের দিকে তাকিয়ে আছে (মার্টিন এ. বার্গারের ভাষায়, "একটি ধ্যানস্থ মুহুর্তে যেন হারিয়ে গেছে"।)[১৪] এয়াকিনসের বিস্তারিত চিত্রাঙ্কণের দৌলতে গবেষকরা প্রত্যেককে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এঁরা হলেন (বাঁ দিক থেকে ডান দিকে): ট্যালকট উইলিয়ামস (১৮৪৯-১৯২৮), বেঞ্জামিন ফক্স (১৮৬৫-১৯০০), জন লরি ওয়ালেশ (১৮৬৪-১৯৫৩), জেসি গডলে (১৮৬২-১৮৮৯), হ্যারি নামক এয়াকিনসের আইরিশ সেটার কুকুরটি (১৮৮০-৯০), জর্জ রেনল্ডস (১৮৩৯-৮৯) ও এয়াকিনস স্বয়ং।[১৪] যে পাথুরে শৈলান্তরীপে কয়েকজনকে বিশ্রাম নিতে দেখা যাচ্ছে, সেটি আসলে মিল ক্রিক মিলের ভিত্তি। মিলটি ১৮৭৩ সালে ভেঙে পড়েছিল। এটিই চিত্রের একমাত্র সভ্যতা-নিদর্শন—এছাড়া কোনো জুতো, জামা বা স্নানাগার ছবিতে দেখা যায় না।[৪] পিছনের ঝোপঝাড় একটা অন্ধকার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, যার বিপরীতে সাঁতারুদের গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল হয়ে দেখা যাচ্ছে।

ফ্রেডেরিক ব্যাজিলসিন দেতে, ১৮৬৯, ক্যানভাস তৈলচিত্র, 62¼ × 62½ in (158 × 159 cm), ফগ আর্ট মিউজিয়াম, কেমব্রিজ, ম্যাসাচুয়েটস। প্যারিসে অধ্যয়নকালে এয়াকিনস এই ছবিটি দেখে থাকবেন।[১৫]

ছবিটির অঙ্কন-কৌশল পিরামিডের মতো। বাঁদিকের আধ-শোয়া অবয়বটি দর্শকের চোখ নিয়ে যায় একটি উপবিষ্ট অবয়বের দিকে। এই অবয়বটি হাত তুলে রয়েছে গডলের দিকে। গডলেই হল এই গঠন-পিরামিডের চূড়া। ডান দিকে যে অবয়বটি জলে ঝাঁপ দিচ্ছে, সেটি দৃষ্টি নিয়ে যায় এয়াকিনসের দিকে। এয়াকিনস সাঁতার কাটছেন। তিনি নিজেকেই এই দৃশ্যে অঙ্কিত করেছেন। তবে তাঁর গতি বাঁদিকে হওয়ায় দর্শকের দৃষ্টি আবার চিত্রের দিকে ফিরে আসে।[৩][১৬] এয়াকিনস ছবির ফোকাসটিকে নিপূণভাবে ব্যবহার করে এই পিরামিডতুল্য ভঙ্গিমাটি এনেছেন। ছবির মূল অংশ, যেখানে সাঁতারুরা রয়েছে, সেটি ঘনপিনদ্ধভাবে অঙ্কিত হয়েছে। অন্যদিকে বাইরের অংশগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। "দুইয়ের মধ্যে কার্যত কোনো মধ্যস্থতাকারী অংশ নেই।"[১৭] ছবিতে আলোর ব্যবহার অপ্রাকৃতিক—কোনো কোনো জায়গায় অতি উজ্জ্বল, আবার কোথাও কোথাও অতিরিক্ত অন্ধকার—তবে যে এফেক্টের মাধ্যমে সাঁতারুদের দেহরেখা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেটি সাধারণ ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম।[১৭]

ছবিটির অঙ্কন-কৌশল এটির অনুষঙ্গ ও অ্যাকাডেমিক ঐতিহ্যের (পূর্ণাঙ্গ অবয়ব অঙ্কনের দক্ষতা) জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহির্দ্বারে একাধিক নগ্ন পুরুষের পরস্পর স্থানবিন্যাসের জন্য এই ছবির বিশিষ্টতা। কেউ জলে ঝাঁপ দিচ্ছে, এমন অবস্থার ছবি পাশ্চাত্য শিল্পের ইতিহাসে বিরল।[৪] কার্যের ধারাবাহিকতা বোঝাতে গিয়ে অন্যান্য অবয়বগুলির ব্যবহারও শিল্পরুচিসম্মত হয়েছে। দেহভঙ্গিমাগুলির মূল উপজীব্য, "আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসা, সেখান থেকে দাঁড়ানো, তারপর ঝাঁপ"। একই সঙ্গে প্রতিটি অবয়ব এতটাই যত্নসহকারে অঙ্কিত হয়েছে যে কারোর যৌনাঙ্গ প্রদর্শিত হয়নি।[৪] আগের ছবিগুলির মতো এই ছবিতেও এয়াকিনস একটি আত্মপ্রতিকৃতি যুক্ত করেছেন; সেটি সাঁতারুর ভূমিকায় নিচের ডানদিকে। দ্য গ্রস ক্লিনিক বা ম্যাক্স মিট ইন আ সিঙ্গল স্কাল ছবিতে ব্যবহৃত আত্মপ্রতিকৃতির ধাঁচটি তিনি এখানে বর্জন করেছে। এখানে তাঁর উপস্থিতি দেখে বোঝা যায় না যে তিনি সঙ্গী, না শিক্ষক, না গোপন দর্শক।[১৮] এয়াকিনসের চারিদিকে জলের ঢেউ ও যে ঝাঁপ দিচ্ছে তার চারপাশে জলের ছিটে একমাত্র নড়াচড়ার লক্ষণ। ছবিতে অন্য সবখানেই গতিকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।[১৮] হ্রদে লাল-চুলওয়ালা অবয়বটির কাছে জল এতটাই শান্ত যে তাতে স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হচ্ছে।[১৯] ছবিতে ধ্রুপদি শিল্পনির্দেশনা ও বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদের পারস্পরিক টানাপোড়েন আলাদা মাত্রা দিয়েছে এই বৈপরীত্য।[২০]

টমাস এয়াকিনস। আর্কেডিয়া, ১৮৮৩, 38⅝ × 45 in (98 × 114 cm), ক্যানভাস তৈলচিত্র, দ্য মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্টদ্য সুইমিং হোল ছবিটির মতো এই ছবিতেও ধ্রুপদি উৎপ্রেক্ষা ব্যবহৃত হয়েছে।[২১]

দেহগুলির অবস্থান ও পেশীগঠনের ভঙ্গিমা গ্রিক শিল্পের দেহসৌন্দর্য ও পেশীসৌকর্য চেতনার ধ্রুপদি আদর্শগুলির অনুসারী।[২২] আধ-শোয়া অবয়বটি ডাইং গল ভাস্কর্যটির একটি রূপান্তর। এটি শিল্পীর অপেক্ষাকৃত অনেকটাই কম নিয়মতান্ত্রিক আত্মপ্রতিকৃতিটির একটি বিপরীত চিত্র।[১০] সম্ভবত এয়াকিনস একটি প্রাচীন ধারণার সঙ্গে আধুনিক ব্যাখ্যার মিলন ঘটাতে চাইছিলেন। ছবির বিষয়বস্তু সমসাময়িক। কিন্তু কয়েকটি অবয়বের ভঙ্গিমা ধ্রুপদি ভাস্কর্যকলাকে মনে করিয়ে দেয়।[২৩] ১৮৬৯ সালে ফ্রেডেরিক বাজিল অঙ্কিত সেনে দেতে ছবিটি এয়াকিনসের ছবিটির একটি সম্ভাব্য সমসাময়িক অনুপ্রেরণা। প্যারিসে অধ্যয়নকালে এয়াকিনস সালোনে ছবিটি দেখে থাকবেন। সম্ভবত এই ছবিটি দেখেই এক আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুরুষদের স্নানদৃশ্য অঙ্কনে তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল।[২৪]

এয়াকিনসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি দ্য সুইমিং হোল অঙ্কনের পর আর্কেডিয়া থিমে এই ধরনের অনেকগুলি ছবি অঙ্কিত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যকলা সম্পর্কে বক্তৃতাও দিয়েছেন। পার্থেনন মার্বেলস থেকে ফিডিয়াসের প্যান-এথেনিয়ান শোভাযাত্রায় পেনসিলভানিয়া অ্যাকাডেমির দলটিও তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।[২১] প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একগুচ্ছ ফটোগ্রাফ, রিলিফ ভাস্কর্য ও তৈল স্কেচের ফসল ১৮৮৩ সালে শিল্পীর আর্কেডিয়া ছবিটিও দ্য সুইমিং হোল ছবিটির অন্যতম অনুপ্রেরণা। আর্কেডিয়া ছবিটিতেও রাখালিয়া প্রাকৃতিক দৃশ্যে নগ্ন মানবদেহ অঙ্কিত হয়েছে। এই ছবিতে চিত্রকর মডেল হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন এক ছাত্র, এক ভাগিনেয় ও চিত্রকরের প্রণয়ীকে।[২৫]

অধ্যয়ন[সম্পাদনা]

দ্য সুইমিং হোল ছবিটি আঁকার আগে এয়াকিনস অনেকগুলি অয়েল স্কেচ ও ফটোগ্রাফ অধ্যয়ন করেছিলেন। ফটোগ্রাফ না অয়েল স্কেচ, কোনটি আগে তোলা বা আঁকা হয়েছিল (বা দুটিই একই দিনের কিনা), তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

১৮৮০-এর দশকের প্রথম দিকে চলনের অনুবর্তিতা বোঝার জন্য এবং চিত্রকলার সূত্র হিসাবে এয়াকিনস ফটোগ্রাফি ব্যবহার করতে শুরু করেন।[২৬] ১৮৮৩ বা ১৮৮৪ সালে তিনি তাঁর ছাত্রদের বহির্দ্বার কার্যকলাপের কয়েকটি ফটোগ্রাফ তোলেন।[২২] ডোভ লেকে তাঁর ছাত্রদের নগ্ন সাঁতারের চারটি ফটোগ্রাফ অক্ষত রয়েছে। এগুলির সঙ্গে দ্য সুইমিং হোল ছবিটির যোগ সুস্পষ্ট। সাঁতারুদের একই অবস্থায় একই জায়গায় দেখা যায় এই ফটোগ্রাফে। তবে তাদের অবস্থান ছবির অবস্থানের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। কোনো ফটোগ্রাফের সঙ্গেই ছবির অবয়বগুলির "পোজ"-এর সম্পূর্ণ মিল পাওয়া যায় না। এয়াকিনসের ক্ষেত্রে সচরাচর এমন ঘটতে দেখা যায় না। কারণ তিনি তাঁর ফটোগ্রাফি অধ্যয়নকে একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করতেন। "ফটোগ্রাফির এই সেটটিতে যে অসাদৃশ্য লক্ষিত হয়, তা থেকে অনুমান করা যায়, যে কয়েকটি ছবি হারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। অথবা এও বলা চলে যে ফটোগ্রাফগুলি আগে তোলা হয়েছিল। তারপর এয়াকিনসের মনে চিত্রকল্পটি রূপ নেয় এবং তারপর তিনি প্রথম অয়েল স্কেচটি আঁকেন।"[২৭] ফটোগ্রাফির "পোজ"-গুলি অনেক বেশি স্বতঃস্ফুর্ত। কিন্তু ছবির "পোজ"-গুলির মধ্যে একপ্রকার আরোপিত ধ্রুপদি "কঠোরতা" লক্ষিত হয়।[৩] তবে ফটোগ্রাফি অধ্যয়নের কোনো লিখিত সূত্র পাওয়া যায় না, যা থেকে ফটোগ্রাফ ও ছবিটির পারস্পরিক সম্পর্কের দিকটি আরও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা যায়। তা সত্ত্বেও আধুনিক গবেষকেরা ক্যানভাসে কয়েকটি কাটা দাগ আবিষ্কার করেছেন, যা থেকে মনে করা হচ্ছে যে এয়াকিনস লাইট-প্রোজেক্টেড ফটোগ্রাফ ব্যবহার করেছিলেন।[২৮]

সাধারণত সমাপ্তিচিত্রে একনিষ্ঠভাবে তাঁর স্কেচগুলিকে অনুসরণ করলেও, এই ছবির ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি অবৈশিষ্ট্যমূলক পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। এই পরিবর্তনগুলি ছিল মূলত অবয়বগুলির চলন বা অবস্থান সংক্রান্ত।[৩০] এয়াকিনসের বন্ধু ও ছাত্র চার্লস ব্রেগলার এই প্রক্রিয়াটির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন:


...দ্য সুইমিং হোল-এর মতো একটি ছবির জন্য, একটি ৮ X ১০ ইঞ্চি [২০ X ২৫ সেন্টিমিটার] আকারের ছোটো স্কেচ অঙ্কিত হয়, তারপর পৃথক পৃথক ভাবে তিনি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অবয়বগুলির পাঠ প্রস্তুত করেন, যাতে রং, বর্ণসংগতি ইত্যাদি সঠিকভাবে ধরা যায়। যে অবয়বটি ঝাঁপ দিচ্ছে সেটির অঙ্কন ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। এই অবয়বটির মডেল প্রথমে মোম দিয়ে তৈরি করা হয়। এইভাবে তিনি প্রতিটি আকৃতি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জন করেন।[৩১]

কমিশন ও প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

১৮৮৪ সালে এডওয়ার্ড হরনর কোটেস নামে ফিলাডেলফিয়ার এক ব্যবসায়ী ছবিটি কমিশন করেন। উল্লেখ্য, এই ব্যক্তি এয়াকিনস যেখানে পড়াশোনা করতেন, সেই পেনসিলভানিয়া অ্যাকাডেমি অফ দ্য ফাইন আর্টসের কমিটি অন ইনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। কোটেস এয়াকিনসকে ৮০০ মার্কিন ডলার দিতে চেয়েছিলেন। এটিই ছিল সেই সময় এয়াকিনসের সবচেয়ে মহার্ঘ্য কমিশন।[৩২][৩৩]

কোটেস ছবিটিকে পেনসিলভানিয়া অ্যাকাডেমি অফ দ্য ফাইন আর্টসে প্রদর্শিত করতে চেয়েছিলেন। ১৮৮৫ সালের হেমন্তে এটি অ্যাকাডেমির প্রদর্শনীতে প্রদর্শিতও হয়। যদিও কোটেস এটিকে এয়াকিনসের প্রতিনিধিত্বমূলক কাজ বলে স্বীকার করেননি এবং সেই কারণে এটি প্রত্যাখ্যানও করেছিলেন।[১৪] ১৮৮৫ সালের ২৭ নভেম্বর একটি চিঠিতে ইয়াকিনসকে কারণ ব্যাখ্যা করে কোটেস লেখেন:


...আপনার হয়ত মনে আছে, আমার প্রধান ভাবনাটি ছিল আপনার থেকে এমন একটি ছবি নেওয়া যেটি "হয়ত" একদিন অ্যাকাডেমির সংগ্রহের একটি অংশ হতে পারবে। বর্তমান ক্যানভাসটি আমি নানা কারণে তারিফযোগ্য মনে করছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস আপনার কাছে থাকা অন্য কয়েকটি ছবি অনেক বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক। আমার মনে হয়, সেই ছবিগুলি আমার ধারণার সঙ্গে অনেক বেশি খাপ খায়। মনে করবেন না, আমি আপনার এই কাজটির অপ্রশংসা করছি - আমার উদ্দেশ্য অবশ্যই তা নয়।[৩৪]

কোটেস সঠিক কী কারণে এই ছবিটি কিনতে পারেননি, তা জানা যায় না। সম্ভবত, তাঁর মনে হয়েছিল যে, এই ছবিটি সংগ্রহ করলে বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে।[৩৫] কোটেস যেহেতু নিজে এয়াকিনসের অ্যাকাডেমির হেড অফ ইনস্ট্রাকশন ছিলেন, তাই এয়াকিনসের কাজকর্ম সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা থাকা স্বাভাবিক। এই ছবির নগ্নতা তাঁকে অবাক বা চমকিত করেছিল, এমন কথা সেই কারণে বলা যায় না।[৩৬] বরং মনে করা হয়, কোটেস ছবির অবয়বগুলিকে চিনতে পেরেছিলেন। কারণ, একজন বাদে এঁরা সকলেই ছিলেন অ্যাকাডেমিতে এয়াকিনসের ছাত্র। সন্দেহ নেই, ছবিতে যে জায়গাটির দৃশ্য অঙ্কিত হয়েছে, তাও তিনি চিনতেন। কারণ, এই জায়গাটি ছিল যে হ্যাভারফোর্ড কলেজ থেকে কোটেস স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করেছিলেন, সেখান থেকে মাত্র আধ মাইল (৮০০ মিটার) দূরে।[১৪] অ্যাকাডেমির এক শিক্ষক ও তাঁর ছাত্রদের নগ্ন ছবি অ্যাকাডেমির পরিচালকদের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠতে পারত। কারণ, মডেলিং-এর কাজ সেই যুগে ঘৃণিত বলে বিবেচিত হত বলে তাঁরা এয়াকিনসকে অ্যাকাডেমির ছাত্রদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিলেন।[৩৬] কোটেস দ্য সুইমিল হোল ছবিটির বদলে এয়াকিনসের "অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত দৃশ্য বর্গ"-এর দ্য প্যাথেটিক সং ছবিটি নির্বাচিত করেন। তিনি আগের কমিশনের ৮০০ মার্কিন ডলারই এয়াকিনসকে দিয়েছিলেন। উক্ত ছবিটি এখন করকোরান গ্যালারি অফ আর্টে রক্ষিত আছে।[২]

১৮৮৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ইয়াকিনসকে বলপূর্বক অ্যাকাডেমি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ছাত্রীদের সামনেই এক পুরুষ মডেলের কটিবস্ত্র খুলে দিয়েছিলেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠিতে পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে এয়াকিনস শিল্পকর্মে নগ্নতার প্রসঙ্গে লেখেন:


আমার আঁকা অবয়বগুলি মাথা আর হাত বের করে থাকা পোষাকের গুচ্ছ নয়, এগুলি সেই শক্তিশালী জীবন্ত দেহের প্রতিকৃতি যা অধিকাংশ ছবিতে দেখানো হয়ে থাকে। জীবনের শেষভাগ এইভাবে অধ্যয়নে আত্মনিয়োগ করে নিশ্চয় বুঝতে পারছ, আমার কাছে চিত্রকলা একটি খুব ভাবগম্ভীর অধ্যয়নের বিষয়। অবয়ব অঙ্কনশৈলীর সবচেয়ে বড়ো শত্রু নকল শালীনতার প্রতি আমার ধৈর্য খুবই কম। প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম নগ্ন অবয়বের দিয়ে তাকানোকে আমি অনুচিত মনে করি না। যদি অনুচিত হয়, তবে এই অনৌচিত্যের সূত্রপাত কোথায় হয়েছিল? নগ্ন অবয়বের ছবি বা নগ্ন মূর্তির দিকে তাকানো কি ভুল? আগের প্রজন্মের ইংরেজ ভদ্রমহিলারা তাই মনে করতেন। তাই তাঁরা স্ট্যাচু গ্যালারিতে যেতেন না। কিন্তু আজ আর তাঁরা তা করেন না। বা এটি কি লিঙ্গের প্রশ্ন। পুরুষদের কি শুধু পুরুষদের দেখার জন্যই পুরুষ মূর্তি বানানো উচিত? আর মেয়েদের দেখার জন্য মেয়েদের মূর্তি মেয়েদেরই বানানো উচিত? পুরুষ-চিত্রকরেরা শুধু পুরুষ-ঘোড়ার আর বৃষ আঁকবে আর রোজা বনহেরের মতো মেয়ে-চিত্রকরের আঁকবে মাদী-ঘোড়া আর গোরুর ছবি? শবব্যবচ্ছেদাগারে যে হতভাগ্য পুরুষ দেহটি পড়ে আছে, সেটি মিস প্রুডারির নৈতিকতা ক্ষুন্ন হওয়ার আগেই কি নষ্ট করে ফেলতে হবে?... এমন অপমানজনক ব্যবস্থাই আমাকে রাগিয়ে তোলে। কেউ কি দেখতে পাচ্ছে না যে কী লজ্জাজনক বৈষম্যের দিকে এই সব ভ্রান্ত ধারণা আমাদের ঠেলে দিচ্ছে? কী ভয়ানক তা? আমার বিবেক পরিষ্কার। আমার যন্ত্রণাও তাই শেষ।[৩৭]

সংগ্রাহক[সম্পাদনা]

টমাস এয়াকিনস, ১৮৮২

কোটেসের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আমৃত্যু এয়াকিনসেরই কাছে ছিল এই ছবিটি। শিল্পীর জীবদ্দশায় মাত্র দু-বার প্রদর্শিত হয়েছে ছবিটি: ১৮৮৬ সালে কেনটাকির লুইসভিলের সাউদার্ন এক্সপোজিশনে এবং ১৮৮৭ সালে শিকাগোর ইন্ট্রা-স্টেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সপোজিশনে। দুই ক্ষেত্রেই সমালোচকেরা ছবিটিকে উপেক্ষা করেছিলেন। ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে ছবিটি একপ্রকার উধাও হয়ে গিয়েছিল। এয়াকিনস বা তাঁর বন্ধুদের কাছ থেকে শিল্পীর জীবদ্দশায় এই ছবিটির কোনো সূত্রই পাওয়া যায় নি।[৩৮] তাঁর মৃত্যুর পর ১৯১৭ সালে ফিলাডেলফিয়া ও নিউ ইয়র্কের একটি স্মরণ-প্রদর্শনীতে ছবিটি প্রদর্শিত হয়।

১৯২৫ সালে শিল্পীজায়ার কাছ থেকে টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের কমিউনিটি ছবিটি কিনে নেয় ৭৫০ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে।[৩৯] সেই থেকে ছবিটি মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম অফ ফোর্ট ওয়ার্থের আদি-সংস্থা ফোর্ট ওয়ার্থ আর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সম্পত্তি হিসেবে শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রদর্শিত হতে থাকে। ১৯৯০ সালে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন যে, আধুনিক শিল্পকর্ম ক্রয়ের টাকা জোগাড়ের জন্য ছবিটি বিক্রি করে দেওয়া হবে।[২] কিন্তু কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হলে, মিউজিয়াম স্থানীয় ক্রেতার সন্ধান করতে থাকে। এরপর অনেক দরকষাকষির পর আমোন কার্টার মিউজিয়াম ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে দ্য সুইমিং হোল ছবিটি কিনে নেয়।[৪০][৪১]

পুনরুদ্ধার[সম্পাদনা]

আমোন কার্টার মিউজিয়াম দ্য সুইমিং হোল ছবিটি কেনার পূর্বে ছবিটিকে সাতবার বিতর্কিতভাবে সংস্কার করা হয়।[২] সম্ভবত ১৯১৭ সালে এয়াকিনসের স্মরণ-প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হওয়ার আগেও একবার এটির সংস্কার করা হয়েছিল। সেই সময়কার একটি ফটোগ্রাফে ছবিটির গ্লেজে একটি ফাটল ও কস্টিক তরলের (সম্ভবত) ছিটের দাগ দেখা যায়।[২] ফোর্ট ওয়ার্থ আর্ট অ্যাসোসিয়েশন ছবিটি কেনার পর মাঝেমধ্যেই প্রদর্শনীতে পাঠাত। ফলে ছবিটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে নিউ ইয়র্ক সিটির একটি প্রাইভেট গ্যালারিতে ছবিটির সংস্কার করে ছিটের দাগটি নির্মূল করা হয়। ১৯৪৪ সালে এটিকে সংস্কার ও পুনরুদ্ধার করা হয়। এরপর ১৯৪৭ সালে ফের পুনরুদ্ধার করা হয়। দু-বারই পুনরুদ্ধারের কাজ করেছিল নিউ ইয়র্কের এক প্রাইভেট ডিলার।[২] ১৯৫৪ ও ১৯৫৭ সালে ব্রুকলিন মিউজিয়াম ছবিটির দুটি অপ্রধান পুনরুদ্ধারের কাজ করে। এরপর বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হলেও ১৯৯৩ সালের আগে ছবিটির কোনো সংস্কার করা হয়নি।

আমোন কার্টার মিউজিয়াম ১৯৯৩ সালের জুন মাসে ছবিটি ক্রয় করে। আমোন কার্টার ও কিমবেল আর্ট মিউজিমারের ক্লেয়ার এম. ব্যারি ও অন্যান্য কর্মীরা এরপর ছবিটির প্রধান পুনরুদ্ধারের কাজে হাত দেন। ব্যারির মতে, "পুনরুদ্ধারের সময় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষয়ক্ষতির দিকগুলি আবিষ্কৃত হয়, যেগুলি আগে ধরা পড়েনি। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া বার্নিশ বা অতিরঞ্জনের বেশ কয়েকটি লেয়ার বাদ দেওয়া হয়। তুলির কাজের এক সমৃদ্ধ ও বিচিত্র উপরিতল প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এখানে ধরা পড়ে নিসর্গ দৃশ্যের মুক্ততর ব্যবহারে অবয়বগুলির নিয়ন্ত্রিত এবং প্রায় মিনিয়েচার-প্রতীম অঙ্কণশৈলী।"[২]

মূল গ্লেজ ও পূর্ববর্তী পুনরুদ্ধারের সময় আরোপিত গ্লেজগুলিকে পৃথক করার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়। পূর্বতন আরোপিত অংশগুলি বাদ দিয়ে একটি প্রাকৃতিক রেজিন বার্নিশ যুক্ত করা হয়। ১৯৯২ সালে ছবিটির আদি ফ্রেমটিকেও আবিষ্কার করা হয়। এই ফ্রেমটিও পরিষ্করণ ও পুনরুদ্ধার করে ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।[২]

পুনরুদ্ধারের সময় দেখা যায়, ১৮৮৩ সালটিকে এই ছবির অঙ্কণকাল ধরা হলেও তা ভুল। শিল্পীর অস্পষ্টে হস্তাক্ষরে লিখিত ১৮৮৫ সাল অভিলেখটি পূর্বতন পুনরুদ্ধারকারীর ভুলবশত হয়ে গিয়েছিল ১৮৮৩।[২]

ব্যাখ্যা[সম্পাদনা]

দ্য সুইমিং হোল ছবিটি এয়াকিনসের পদ্ধতি ও শিক্ষাগত আদর্শের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি। তিনি লাইফ স্টাডি, ফটোগ্রাফি, ওয়াক্স স্টাডি ও নিসর্গ স্কেচের সাহায্য নিয়েছেন এই ছবিটি আঁকতে। এটি মানবরূপের প্রতি তাঁর আগ্রহের একটি মূর্ত স্বরূপ।[৪২] লয়েড গুডরিক (১৮৯৭-১৯৮৭) মনে করতেন, এই ছবিটি "এয়াকিনসের শ্রেষ্ঠ নগ্নতা-চিত্রণ"। অবয়বের ধারণা এখানে নিটোল এবং অবয়বগুলিও যথাযথভাবে নিসর্গের সঙ্গে খাপ খেয়ে গেছে। ছবিটি সূক্ষ্ম বর্ণসৃজন ও শিল্পীর "সমৃদ্ধ চিত্রসমূহের" অন্যতম।[৪৩] শিল্পীর অপর এক জীবনীকার উইলিয়াম ইনেস হোমার (জন্ম ১৯২৯) অবশ্য ছবিটি সম্পর্কে সংযত মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি অবয়বগুলির "পোজ" খুব কঠোরভাবে অ্যাকাডেমিক রীতির অনুসারী বলে উল্লেখ করেন। চিত্রের মান ও পরিবেশের প্রভাব সংক্রান্ত কয়েকটি অসঙ্গতির উল্লেখ করেছেন হোমার। তিনি লিখেছেন ধ্রুপদি ও প্রকৃতিবাদী ধারণার চিত্রণে এই ছবিটি অসফল। তাঁর মতে, "নগ্ন অবয়বগুলিকে যেন স্টুডিও থেকে তুলে এনে নৈসর্গিক পরিবেশে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।"[৪৪]

মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বাবধি নগ্ন পুরুষ অবয়ব পশ্চিমী শিল্পকলায় ছিল ধ্রুপদি বিষয়বস্তু। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বালক ও পুরুষদের প্রকাশ্য নগ্ন সাঁতার অস্বাভাবিক দৃশ্য ছিল না। কিন্তু আমেরিকান চিত্রকলায় এই ছবির কোনো পূর্বসূরিকেও দেখা যায় না।[৪৫] বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নগ্ন নারীদেহ অঙ্কণ অবশ্য চলত। তবে আমেরিকায় এই ধরনের ছবি সাধারণত পানশালাতেই শোভা পেত, শিল্প প্রদর্শশালায় নয়। এয়াকিনস কেবল লিঙ্গটিকে পরিবর্তন করে নিয়ে সেটিকে চারুকলার বিষয়বস্তু করে তুললেন।[৪৬] বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে গেলে, দ্য সুইমিং হোল ছবিটি ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকান চিত্রকলার সেই অল্প কয়েকটি নিদর্শনের অন্যতম যা পুরুষদের স্নানদৃশ্য অঙ্কনের "নব-উত্থিত ইউরোপীয় প্রথাটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে।"[৪৭] সেই সময় ফ্রান্সে সমান্তরালভাবে এক সমুন্নত বিষয়গত পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল। বাজিলের সামার সিন, জর্জেস সুরাতের (১৮৫৯-৯১) বাথার্স অ্যাট আসনিরেস (১৮৮৪) ও পল সেজেনের (১৮৩৯-১৯০৪)[৪৮] চিত্রকর্মের প্রগতিশীল শৈলীর ছবি এয়াকিনস আঁকেননি।[৪৯] ১৯০৬ সালে নাবি আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা পল সেরুসিয়ার তিন বালকের নগ্ন সাঁতারের ছবি আকেন। এই ছবিটির নাম বয়েজ অন আ রিভারব্যাঙ্ক

জর্জ বেলোজফর্টি-টু কিডস, ১৯০৭, ক্যানভাস তৈলচিত্র, করকোরান গ্যালারি অফ আর্ট

এয়াকিনসের এই ছবিটি পরবর্তীকালে আমেরিকান বাস্তবতাবাদী প্রজন্মটিকেও প্রভাবিত করেছিল। জর্জ বেলোজের (১৮৮২-১৯২৫) ফর্টি-টু কিডস (!৯০৭) ছবিটি দ্য সুইমিং হোল ছবিটির সঙ্গে এক নিশ্চিত সমরূপতা বহন করে। যদিও বেলোজের ছবিটিকে এয়াকিনসের ছবিটির প্যারোডি মনে করা হয়। তাছাড়া এই ছবিতে গ্রামীণ পরিবেশের পরিবর্তে নিউ ইয়র্ক সিটির হাডসন নদে অনেক নগ্ন শিশুর স্নান প্রদর্শিত হয়েছে।[৫০] এয়াকিনসের দর্শনকে প্রতিফলিত করে বেলোজ পরে তাঁর ফর্টি-টু কিডস চিত্রাঙ্কণের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন: "পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা ও সাঁতারুরাই ছিল একমাত্র বিষয় যাদের পেশীসঞ্চালন আইনত নগ্নভাবে আঁকা যেত।"[৫১]

শিল্পীর মৃত্যুর পর শিল্পীজায়া ছবিটির যে পুনর্নামকরণ করেছিলেন, তার সঙ্গে জড়িত ছিল রিলের কবিতার স্মৃতিমেদুর চেতনার অনুষঙ্গ।[১২] আরও সাম্প্রতিককালে ছবির বিষয়বস্তুটিকে ওয়াল্ট হুইটম্যান (১৮১৯-৯২) রচিত সং অফ মাইসেলফ কাব্যের (বিশেষত "টোয়েন্টি-এইট ইয়াং মেন বেদ বাই দ্য শোর" অংশ যেখানে পুরুষদের নগ্নস্নানের প্রসঙ্গ রয়েছে) সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।[১০][৫২] হুইটম্যান সম্ভবত এই ছবির অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। নগ্নতার উদযাপন হুইটম্যানের ক্ষেত্রে ছিল সমকামিতার প্রকাশ্য অভিব্যক্তি। এই নগ্নতা উভয়ের শিল্পকর্মেই উপস্থিত।.[৫৩] ১৮৯৫ সালে এয়াকিনসের এক পুরুষ ছাত্র স্মৃতিচারণায় "আমরা হুইটম্যান-অনুগামীরা" শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। এটিকে সমকামিতার অনুষঙ্গে দেখা হয়।[৫৪] "কিন্তু উভয়ের বৈবাহিক সম্পর্ক এমনই ছিল যে একমাত্র এয়াকিনস ছাড়া (দ্য সুইমিং হোল ছবির) ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিগত জীবন বা যৌনপ্রবৃত্তি সম্পর্কে কোনো ধারণাই পাওয়া যায় না।"[৫৫]

বর্তমানে ডোভ লেক

ছবিটিকে প্লেটোনিক দৃষ্টিতে নৈসর্গিক পরিবেশে আত্মসচেতনতাহীন পুরুষ নগ্নতার অভিপ্রকাশ মনে করা হলেও,[৫৬] ১৯৭০-এর দশকে কয়েকজন আমেরিকান লেখক এয়াকিনসের চিত্রকর্ম, বিশেষ করে দ্য সুইমিং হোল ছবিটির সঙ্গে হোমোইরোটিক অনুষঙ্গ খুঁজে পান।[৫৭] সমালোচকেরা দণ্ডায়মান অবয়বটির পশ্চাদ্দেশ অঙ্কনের নিখুঁত শৈলীটি পর্যবেক্ষণ করে এটির সঙ্গে "হোমোইরোটিক মনোভাবের" মিলের কথা বলেছেন।[৫৮] জোনাথান ওয়েনবার্গের মতে, দ্য সুইমিং হোল আমেরিকান শিল্পে হোমোইরোটিক চিত্রকল্পের দরজা খুলে দেয়।[৫৯] এয়াকিনসের শিল্পকর্মে যৌনতা সম্পর্কে এক দ্ব্যর্থতাবোধক অথচ চিত্তাকর্ষক উপাদান পাওয়া যায়। ফোটোগ্রাফ, অয়েল স্কেচ এবং সাঁতারুদের একটি সম্পূর্ণ ছবি পর্যবেক্ষণ করে শিল্প ঐতিহাসিকেরা শিল্পীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন।[৫৯]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Bolger, vii
  2. ২.০০ ২.০১ ২.০২ ২.০৩ ২.০৪ ২.০৫ ২.০৬ ২.০৭ ২.০৮ ২.০৯ ২.১০ ২.১১ Bolger, Doreen; Barry, Claire M. (March, 1994)। "Thomas Eakins' 'Swimming Hole.' – 1885 painting in the Amon Carter Museum, Fort Worth, Texas"Magazine Antiquesআসল থেকে August 27, 2006-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত January 6, 2009 
  3. ৩.০ ৩.১ ৩.২ Goodrich, 239
  4. ৪.০ ৪.১ ৪.২ ৪.৩ Bolger, 1
  5. Adams, 305
  6. Adams, 306
  7. Brown Price, Aimee (December, 1997)। "How the 'Bathers' emerged — the painting 'Bathers at Asnieres' – Georges Seurat, National Gallery, London, England"Art in Americaআসল থেকে December 30, 2007-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত January 6, 2009 
  8. Figliano, Laurie। "Naked and Exposed: A Historical, Psychosexual and Comparative Analysis of Thomas Eakins' Masterpiece, The Swimming"Concordia Undergraduate Journal of Art History, Issue #2। সংগৃহীত December 21, 2008 
  9. Lubbock, Tom (February 1, 2008)। "Eakins, Thomas The Swimming Hole (1885): The Independent's Great Art series"The Independent। সংগৃহীত January 6, 2009 
  10. ১০.০ ১০.১ ১০.২ Sewell, 90
  11. Adams, 306–07
  12. ১২.০ ১২.১ Bolger, 28–29
  13. "Description page for 'Swimming'". Amon Carter Museum. Retrieved January 7, 2009
  14. ১৪.০ ১৪.১ ১৪.২ ১৪.৩ Martin A. Berger (Autumn, 1997). "Modernity and Gender in Thomas Eakins' "Swimming"". American Art, Vol. 11, No. 3, 33–47. Published by the University of Chicago Press on behalf of the Smithsonian American Art Museum. Retrieved on January 10, 2009.
  15. Glueck, Grace (September 3, 2004)। "European Influences On Americans' Views"The New York Times। সংগৃহীত January 6, 2008 
  16. Kirkpatrick, 285
  17. ১৭.০ ১৭.১ Bolger, 1–3
  18. ১৮.০ ১৮.১ Bolger, 66
  19. Eakins himself said "There is so much beauty in reflections that it is generally worthwhile to try to get them right." – Bolger, 25
  20. Homer, 116
  21. ২১.০ ২১.১ Sewell et al., 113
  22. ২২.০ ২২.১ "Eakins' Students at the "The Swimming Hole""। The Getty Museum। February 1, 2008। সংগৃহীত January 4, 2009 
  23. Sewell, 89–90
  24. Glueck, Grace (September 3, 2004)। "European Influences On Americans' Views"The New York Times। সংগৃহীত January 6, 2008 
  25. Eakins later gave the unfinished painting to William Merritt Chase. Sewell et al., 113
  26. Homer, 116, 141–45
  27. Bolger, 21–22
  28. Sewell et al., 235–36
  29. McCoy, Garnett (1972)। "Some Recently Discovered Thomas Eakins Photographs"Archives of American Art Journal, Vol. 12, No. 4 (The Smithsonian Institution)। সংগৃহীত January 6, 2008  15–22
  30. Bolger, 19
  31. Sewell, 89
  32. Bolger, 13
  33. At the time, Eakins' annual salary was $1,200. See Bolger, 15–16
  34. Bolger, 44
  35. Bolger, 45
  36. ৩৬.০ ৩৬.১ Bolger, 26
  37. Foster, Kathleen A। "Thomas Eakins – Scenes from a Modern Life: Biography 1886: Indicted by Rumor"PBS। সংগৃহীত January 6, 2008 
  38. "During the following three decades, likely no one beyond the painter's immediate circle of family and friends saw the painting. Nor is there any extant anecdotal or pictorial data to testify to the painter's sense of the work during these years ... The painting simply failed to register in any significant, public way during Eakins' lifetime." – Bolger, 4
  39. Bolger, Doreen; Barry, Claire M. (May 13, 2004)। "Thomas Eakins' 'The Swimming Hole.'"Resource Library Magazine। সংগৃহীত January 6, 2008 
  40. Reif, Rita (April 21, 1990)। "Fort Worth Strives to Keep Eakins' 'Swimming Hole'"The New York Times। সংগৃহীত January 14, 2008 
  41. Kimmelman, Michael (June 16, 1990)। "An Eakins Classic Stays In Texas"The New York Times। সংগৃহীত January 14, 2008 
  42. Sewell et al., 100
  43. Goodrich, 239–40
  44. Homer, 116
  45. Adams, 305, 311
  46. Adams, 311
  47. Bolger, 83
  48. Cézanne, Paul। "Bathers"। Musée d'Orsay। সংগৃহীত January 6, 2009 
  49. Bazille seems to have drawn back from his own more radical instincts, having first painted the figures in Summer Scene completely nude, before deciding to clothe them. Bolger, 80–95
  50. Levander, Caroline Field; Singley, Carol J (2003). The American Child: A Cultural Studies Reader. Rutgers University Press, 211–12. ISBN 0-8135-3223-X
  51. Zurier, Rebecca (2006). Picturing the City: Urban Vision and the Ashcan School. University of California Press, 216. ISBN 0-520-22018-8
  52. Bolger, 7
  53. Several years after the painting was completed, Eakins and Whitman became friends, and in 1887 Eakins traveled to the poet's home in Camden, New Jersey to paint his portrait. Homer, 116, 210–13
  54. Homer, 116; Bolger, 59. See also Whitney Davis, "Erotic Revision in Thomas Eakins Narratives of Male Nudity
  55. Bolger, 59
  56. Sewell, 100
  57. Bolger, 7–8 refers specifically to Sexual Perspective: Homosexuality and Art in the Last 100 Years in the West by Emmanuel Cooper, Homoerotic Photograph: Male Images from Durieu / Delacroix to Mapplethorpe by Allen Ellenzweig, Realism, Writing, Disfiguration by Michael Fried, and Eakins in the Wilderness by Adam Gopnik.
  58. Adams, 306–08
  59. ৫৯.০ ৫৯.১ Adams, 308–09. Referenced from Male Desire: The Homoerotic in American Art by Jonathan Weinberg

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Adams, Henry. Eakins Revealed: The Secret Life of an American Artist. New York: Oxford University Press, 2005. ISBN 0-19-515668-4
  • Bolger, Doreen; Cash, Sarah; et al. Thomas Eakins and the Swimming Picture. Amon Carter Museum, 1996. ISBN 0-88360-085-4
  • Goodrich, Lloyd. Thomas Eakins, Volume I. Harvard University Press, 1982. ISBN 0-674-88490-6.
  • Homer, William Innes. Thomas Eakins: His Life and Work. Abbeville, 1992. ISBN 1-55859-281-4
  • Kirkpatrick, Sidney. The Revenge of Thomas Eakins. Yale University Press, 2006. ISBN 0-300-10855-9, ISBN 978-0-300-10855-2
  • Sewell, Darrel. Thomas Eakins: Artist of Philadelphia. Philadelphia Museum of Art, 1982. ISBN 0-87633-047-2
  • Sewell, Darrel; Kathleen A. Foster; Philadelphia Museum of Art; Musée d'Orsay; Metropolitan Museum of Art. Thomas Eakins. Yale University Press, 2001. ISBN 0-87633-143-6

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]