দেলোয়ার হোসেন সাঈদী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হযরত আল্লামাহ
দেলোয়ার হোসেন সাঈদী
সহকারী আমির of
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
শাইখ, আল্লামাহ & উলামা
Member of সংসদ
for পিরোজপুর-১
কার্যালয়ে
১২ জুন ১৯৯৬ – ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮
পূর্বসূরী শুধাংশু শেখর হালদার
উত্তরসূরী একেএমএ আওয়াল (সাইদুর রহমান)
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম পিরোজপুর, বাংলাদেশ
জাতীয়তা বাংলাদেশী
রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী
সন্তান রাফিক বিন সাঈদী, শামীম সাঈদী, মাসঊদ সাঈদী, নাসিম সাঈদী
জীবিকা রাজনীতি, ইসলাম, দাওয়াত
পেশা ইসলামী বাগ্মী
ধর্ম ইসলাম

দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসির এবং বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন সংসদ সদস্য, যাকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাজাকার বাহিনী-এর সদস্য হিসাবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থেকে হত্যার মতো মানবতাবিরোধী কার্যক্রমে সাহায্য করার[১][২][৩][৪][৫][৬] অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর একজন শীর্ষ নেতা ও বর্তমানে দলটির মূল নীতিনির্ধারক (মজলিশ-এ-শুরা) সদস্য। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির। তিনি ১৯৯৬ সালের সাধারন নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবার এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তিনি একজন ধর্মীয় নেতা। মুগ্ধকর বাগ্মীতার জন্য তিনি দেশব্যাপী বিখ্যাত। তার ইসলামিক বক্তৃতাসমূহ (ওয়াজ) গ্রামে-গঞ্জে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। [৭]

২০১১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয়। তাঁর বিরূদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ২০ দফা অভিযোগ আনা হয়। [৮]। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিচার করে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রদত্ত বিচারের রায়ে আটটি অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং দু'টি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। [৯]। তাঁর ফাঁসীর রায় ঘোষণা হলে জামায়াত শিবির দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সহিংসতা শুরু করে।[১০][১১][১২][১৩]

জন্ম[সম্পাদনা]

দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর জন্ম পিরোজপুর জেলায়, ১লা ফেব্রুয়ারী, ১৯৪০ সালে। তার বাবা ইউসুফ সাঈদী একজন স্বনামখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত বা আলেম ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে।[৭] তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নেতা নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনী জোট গঠন করে এবং তিনি এই নির্বাচনে পুনরায় তিনি জাতীয় সংসদ এর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বিতর্কিত বিদেশ ভ্রমণ[সম্পাদনা]

২০০৬ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যের যথাযথ কতৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদনের পর সাঈদী যুক্তরাজ্যে যান লন্ডন ও লুটনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখার জন্য। [১৪] যদিও তার এই লন্ডন প্রবেশ ছিল বিতর্কিত। কিছু ফাঁস হওয়া ইমেইল নিয়ে দি টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখান থেকে জানা যায় যে একজন উপদেষ্টা, এরিক টেইলর বলেছেন, "যুক্তরাজ্যে সাঈদীর পূর্ববর্তী ভ্রমণেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে তার অনুসারীদের আক্রমণাত্নক আচরণের জন্য।" [১৫] ২০০৯ সালের ২৪শে জুলাই হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা সাঈদীকে বিদেশ ভ্রমণে বাধা দেন। তার বিদেশ ভ্রমণের উপর সরকারের এই বিধিনিষেধ আরোপকে অস্বীকার করে সাঈদী হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন ফাইল করেন ২৭শে জুলাই। চেম্বার জজের সামনে এটর্নী জেনারেল বিধিনিষেধের সপক্ষে যুক্তি দেখান যে, ১৯৭১ সালে সাঈদী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন এবং সাঈদীকে যদি বিদেশ যেতে বাধা না দেওয়া হয় তাহলে তিনি যুদ্ধাপরাধীদেরকে আদালতে অভিযুক্ত করার সরকারের যে উদ্যোগ, এর বিরূদ্ধে বিদেশে প্রচারণা চালাতে পারেন। [১]

ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রচারের অভিযোগ[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে বৃটিশ মিডিয়া যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সাঈদীর ভিসা বাতিলের জন্যে অনুরোধ জানায়। [১৬]

গ্রেফতার[সম্পাদনা]

"ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত করেছে" মর্মে অভিযোগে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২১ মার্চ তারিখে দায়েরকৃত বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর মামলার প্রেক্ষিতে ঐ বছর ২৯ জুন তারিখে রাজধানীর শাহীনবাগের বাসা থেকে পুলিশ দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে গ্রেপ্তার করে।[১৭]

যুদ্ধাপরাধ ও অন্যান্য অভিযোগ[সম্পাদনা]

  • অভিযোগ রয়েছে যে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী তৎকালীন সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার ফায়জুর রহমান কে হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন।[১৮]
  • ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত একটি গণ তদন্ত প্রতিবেদনে সাঈদী কে আল বদর বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাথে যুক্ত থাকার জন্য অভিযুক্ত করা হয়।[১৯] মানিক পশারী নামে একজন ২০০৯ সালের ১২ই আগস্ট পিরোজপুরে সাঈদী সহ আরও চার জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। [২০] মানিক পশারী অভিযোগ করেন যে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর নেতৃত্বে তাদের বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করা হয়েছিল এবং বাড়ির তত্বাবধায়ক কে হত্যা করা হয়েছিল।[২১]
  • আরও একটি মামলা পিরোজপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তার নামে দায়ের করা হয়। এ মামলা দায়ের করেন মহিউদ্দীন আলম হাওলাদার নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা।[২২][২৩]
  • দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী দাবী করেন আদালত ফতোয়া (ধর্মীয় অনুশাসন) নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং ফতোয়াই আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করবে।[২৪].
  • তাবলীগি কর্মকান্ডের আড়ালে তিনি বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য প্রদান করেন।[২৫].
  • ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সাঈদীর ভূমিকার কথা লেখার কারনে তিনি বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার পিরোজপুরের স্থানীয় সাংবাদদাতাদের হুমকি দেন।[২৬]

মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির রায়[সম্পাদনা]

তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্মান্তর করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে[২৭] এর মধ্যে দুটি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।[২৮][২৯] ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বৃহস্পতিবার বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় দেন।[৩০] সাঈদীর বিরুদ্ধে থাকা ২০টি অভিযোগের মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬, ১৯ নম্বর অভিযোগ। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তাঁকে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়।[৩১][৩২][৩৩][৩৪] এই জন্য ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯নং অভিযোগ প্রমাণিত হলেও এতে কোনো সাজার কথা ঘোষণা করেননি ট্রাইব্যুনাল।[৩৫][৩৬] তবে,তার বিরুদ্ধে আনা অন্য ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে সেগুলো থেকে খালাস দেওয়া হয়।[২৮]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ A report on New Age National , The Daily Newspaper, published on August 13, 2009.
  2. 30-yr-old Delu punished
  3. http://www.bbc.co.uk/news/world-asia-21611769
  4. Bangladesh party leader accused of war crimes in 1971 conflict | World news | The Guardian
  5. REUTERS, 28th February, 2013
  6. "Seeking war crimes justice, Bangladesh protesters fight 'anti-Islam' label", CNN.com, 27 February 2013
  7. ৭.০ ৭.১ সাইদখালির শিকদার যেভাবে হলেন সাঈদী
  8. http://www.hindustantimes.com/world-news/Bangladesh/Bangladesh-1971-war-crimes-trial-begins/Article1-771835.aspx
  9. "সাঈদীর ফাঁসির আদেশ"। বিডিনিউজ২৪.কম। 
  10. Julfikar Ali Manik; Jim Yardley (1 March 2013)। "Death Toll From Bangladesh Unrest Reaches 44"New York Times। সংগৃহীত 1 March 2013 
  11. Arun Devnath; Andrew MacAskill (1 March 2013)। "Clashes Kill 35 in Bangladesh After Islamist Sentenced to Hang"। Bloomberg। সংগৃহীত 1 March 2013 
  12. Naim-Ul-Karim (2 March 2013)। "4 dead, hundreds injured as riots continue in Bangladesh"। Xinhua। সংগৃহীত 2 March 2013 
  13. "Bangladesh deaths rise as Jamaat protest strike begins"। BBC। 3 March 2013। সংগৃহীত 3 March 2013 
  14. A report on Daily Mail , by Benedict Brogan, published on July 13, 2006.
  15. A report on The Times, By Richard Ford, Nicola Woolcock and Sean O’Neill , published on July 14, 2006.
  16. "Preaching Hatred : Jamaat MP Saidee in UK hot soup", Julfikar Ali Manik and Bishawjit Das
  17. "নিজামী, মুজাহিদ ও সাঈদী গ্রেপ্তার", নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ২৯-০৬-২০১০
  18. Report on the findings of the People's Inquiry Commission on the activities of the war criminals and the collaborator.
  19. A South Asia Analysis Group report. Paper no. 232..
  20. "SC stays Sayedee bail in war crime case"। The Daily Star। 
  21. "পিরোজপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তের সংবাদ"। প্রথম আলো। 
  22. Bangladesh2day: an online news portal, September 01, 2009.
  23. A report on the newspaper The Daily Star, published on September 01, 2009.
  24. God willing: the politics of Islamism in Bangladesh, by Ali Riaz, p. 3.
  25. Genocide 1971, An Account Of The Killers And Collaborators Genocide’71, published by Muktijuddha Chetana Bikash Kendra, p. 100.
  26. An article by BangladeshCenter for Development, Journalism and Communication, published on May 13, 2002.
  27. "সাঈদীর ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল"দৈনিক কালের কণ্ঠ। ২৮-০২-২০১৩। 
  28. ২৮.০ ২৮.১ "মানবতাবিরোধী অপরাধে সাঈদীর ফাঁসি"দৈনিক প্রথম আলো। ২৮-০২-২০১৩। 
  29. "রাজাকার সাঈদীর ফাঁসির আদেশ"। বিডিনিউজ। ২৮-০২-২০১৩। 
  30. "সাঈদীর ফাঁসির রায়"দৈনিক ইত্তেফাক। ২৮-০২-২০১৩। 
  31. "বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাঈদীর ফাঁসির রায়"। বিবিসি বাংলা। ২৮-০২-২০১৩। 
  32. "Bangladesh Jamaat leader sentenced to death"। আল জাজিরা। ২৮-০২-২০১৩। 
  33. "Bangladesh sentences Jamaat-e-Islami leader to death for war crimes"। গার্ডিয়ান। ২৮-০২-২০১৩। 
  34. "সাঈদীর ফাঁসি"। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ২৮-০২-২০১৩। 
  35. "সাঈদীর ফাঁসি"বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর। ২৮-০২-২০১৩। 
  36. "সাঈদীর ফাঁসির আদেশ"সময় টিভি। ২৮-০২-২০১৩।