দূর্গাপুর উপজেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দূর্গাপুর
উপজেলা
দূর্গাপুর উপজেলা বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
দূর্গাপুর
দূর্গাপুর
বাংলাদেশে অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৫°৭.৫′ উত্তর ৯০°৪১.৩′ পূর্ব / ২৫.১২৫০° উত্তর ৯০.৬৮৮৩° পূর্ব / 25.1250; 90.6883
রাষ্ট্র  বাংলাদেশ
বিভাগ ঢাকা বিভাগ
জেলা নেত্রকোনা জেলা
আয়তন
 • মোট ২৯৩.৪২
জনসংখ্যা (১৯৯১)
 • ঘনত্ব ৫৭৬
সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)
ওয়েবসাইট দূর্গাপুরের সরকারী মানচিত্র

দুর্গাপুর উপজেলা বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের নেত্রকোনা জেলার একটি উপজেলা।

পরিচ্ছেদসমূহ

অবস্থান[সম্পাদনা]

নেত্রকোনা জেলার সর্ব উত্তরে ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের কোল ঘেসে ছোট্ট জনপদ দুর্গাপুর। এক পাশে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা অন্য পাশে গারো পাহাড় আর উপত্যকা দিয়ে ঘেরা ভারতের মেঘালয় পুর্বে নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলা। আর দক্ষিণে পুর্বধলা উপজেলা

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১২৮০ খ্রীষ্টাব্দে মেঘালয়ের পূর্ব অংশে সু-সঙ্গ নামে এক পরগনার গোড়াপত্তন হয়। অভিযাত্রী মার্কোপোলো তাঁর অভিযানের এক পর্যায়ে যখন তাঁতার সাম্রাজ্যের সম্রাট কুবলাই খাঁর দরবারে তখনই আরেক অভিযাত্রী সোমেশ্বর পাঠক মতান্তরে সোমনাথ পাঠক ভারতের কান্যকুব্জ থেকে ১২৮০ খৃষ্টাব্দ (৬৮৬ বঙ্গাব্দ মাঘ মাস) পূর্ব ময়মনসিংহের উত্তরভাগ ‍‍'পাহাড় মুল্লুকে' প্রচুর সঙ্গীসাথী সহ কামরূপ ভ্রমণের লক্ষ্যে বর্তমান দশভূজা বাড়ির প্রাঙ্গনে অশোক বৃক্ষের নিচে বিশ্রামের জন্য যাত্রাবিরতি করেন। অত্র 'পাহাড় মুল্লুক' ছিল বৈশ্য গারো নামে গারোদের প্রবল পরাক্রমশালী এক নকমা (প্রধান) এর অধীন। সোমেশ্বর পাঠক তাকে যুদ্ধে পরাস্ত করে সু-সঙ্গ অর্থাৎ ভাল সঙ্গ নামে এক সামন্ততান্ত্রিক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই সোমেশ্বর পাঠকই সুসঙ্গ রাজবংশের আদি পুরুষ।

পরবর্তী তিন'শ বছর এই বংশের রাজ পুরুষগণ বহু উপাধী বদলিয়ে অবশেষে সিংহ উপাধী ধারণ করেন। এই রাজবংশের যোগ্য উত্তরসূরী মল্লযোদ্ধা এবং প্রখর কুটনৈতিক জ্ঞানের অধিকারী রাজা রঘুনাথ সিংহ মোঘল সম্রাট আকবরের সিংহাসনোরাহনের পর তাঁর সাথে এক চুক্তি করেন। এই চুক্তির অংশ হিসেবে রাজা রঘুনাথ সিংহকে মানসিংংহ এর পক্ষে বিক্রমপুরের চাঁদ রায়, কোদার রায় এর বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হয়। যুদ্ধে চাঁদ রায়, কেদার রায় পরাস্ত হলে রাজা রঘুনাথ সেখান থেকে অষ্ট ধাতুর এক দুর্গা প্রতিমা নিয়ে আসেন এবং রাজ মন্দিরে স্থাপন করেন যা আজো দশভূজা মন্দির নামে সুপরিচিত। তখন থেকেই সু-সঙ্গের সাথে দুর্গাপুর যোগ করে এই অঞ্চলের নামকরণ হয় সুসঙ্গ দুর্গাপুর। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে হাজংদের হাতির খেদায় বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানোর প্রতিবাদে হাজং নেতা মনা সর্দার নেতৃত্বে হাজং বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ১৯৪২-৪৩ সালে কমরেড মণি সিংহর নেতৃত্বে টংক আন্দোলন পরিচালিত হয়। ১৯৪৬-৪৭ সালে তাঁর নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। পরে আন্দোলন সারা পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পরে।

প্রশাসনিক এলাকা[সম্পাদনা]

দুর্গাপুরের প্রশাসনিক মানচিত্র

এর আয়তন ২৯৩.৪২ বর্গ কিমিঃ উপজেলা শহর ৯টি ওয়ার্ড, এবং ২৭ টি মহল্লা নিয়ে গঠিত। এটি সোমেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রাচীন জনপদ। এই জনপদটি একটি পর্যটক এলাকা হিসাবে সমধিক পরিচিত। ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে এখানে দেওয়ানী ও ফৌজদারি আদালত রয়েছে। প্রশাসন দুর্গাপুর থানা গঠিত হয় ১৮৭৪ সালে এবং থানা উপজেলায় রূপান্তরিত হয় ১৯৮২ সালে।[১]

  • পৌরসভাঃ ১টি (দুর্গাপুর সদর)
  • ইউনিয়নঃ ৭টি
  • মৌজাঃ ১৩৪টি
  • গ্রামঃ ২০৫টি
  • জনসংখ্যা ঘনত্বঃ ৭১০ (প্রতি বর্গ কিমি)
  • শিক্ষার হারঃ শহরে ৫২.৩% এবং গ্রামে ৩১.০%
  • জনসংখ্যাঃ শহরে ২২,৬৬১ এবং গ্রামে ১৭৫,৬৬৫

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

মোট জনসংখ্যাঃ ১৭৩৩৫৪(সর্বশেষ হালনাগাদ), পুরুষঃ ৫০.৮৯% মহিলাঃ ৪৯.৫১। মুসলমান ৮০%, হিন্দু ১২% খ্রিষ্টান এবং আদিবাসী ৮%, গারো এবং হাজং নামক দুটি আদিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। এরা সর্বমোট ৮৫০ টি পরিবার এখনো বিদ্যমান। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানঃ মসজিদ ২৬৭, মন্দির ২২, গির্জা ৫।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

সুসঙ্গ আদর্শ বিদ্যানিকেতন অন্যতম সেরা স্কুল

শিক্ষার হার গড় ৩৩%, তন্মধ্যে নারী শিক্ষার হার ২৮%। প্রাথমিক বিদ্যালয়ঃ ৫৮ টি (সরকারি) ৭০ টি (বেসরকারি), মাধ্যমিক ২৮ টি বালিকা বিদ্যালয়ঃ ৮ টি। কলেজ ২ টি। মহারাজা কুমুদচন্দ্র মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সবচেয়ে প্রাচীন স্কুল, প্রতিষ্ঠা কাল: ১৯১৮ ইং; সুসঙ্গ আদর্শ বিদ্যানিকেতন একটি প্রসিদ্ধ স্কুল। অন্যতম সেরা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের তালিকা নিম্নরূপঃ

  • মহারাজা কুমুদচন্দ্র মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়:
  • দুর্গাপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
  • বিরিশিরি পিসি নল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়
  • সুসং কলেজ
  • দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রী কলেজ
  • সুসঙ্গ আদর্শ বিদ্যানিকেতন
  • দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
  • জহুরা জালাল বালিকা বিদ্যালয়য়
  • গুজিরকোনা উচ্চ বিদ্যালয়
  • চন্ডিগর উচ্চ বিদ্যালয়
  • কোনাপাড়া আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৭৩.০১%, উপজেলার মোট জনগোষ্ঠীর ৪৬.৭৩% কৃষিজীবি, ২৫.১৭% কৃষি শ্রমিক, ৮.৯৬% চাকুরীজীবী, ১.৭৭% মৎসজীবি, অকৃষি শ্রমিক ৩.০৪%, শিল্প ০.৪৭%, ব্যবসা ৯.৮৩%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ১.০২%, নির্মাণ ০.৬০%, ধর্মীয় সেবা ০.২০%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.৩২% এবং অন্যান্য ৮.৩০%। কৃষি ভূমির মালিকানা ভূমি মালিক ৫৭.১৫%, ভূমিহীন ৪২.৮৫%। শহরে ৩৫.৩১% এবং গ্রামে ৫৯.৯১% পরিবারের কৃষিজমি রয়েছে।[২]

  • চাষযোগ্য ভুমির পরিমাণ ১৮৯৬২.৩৬ হেক্টর,
  • পতিত জমির পরিমাণ ৬৯৯.৭২ হেক্টর।
  • সেচের আওতায় আবাদী জমির পরিমাণ ৭৬%।

কৃষি ফসল[সম্পাদনা]

প্রধান কৃষি ফসল হলোঃ ধান, পাট, গম, সরিষা, চিনাবাদাম, ভুট্টা, তুলা শাকসবজি। বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় ফসলাদি তিসি, খেসারি, কলাই, মিষ্টি আলু, অড়হর। প্রধান ফলফলাদি আম, কাঁঠাল, জাম। প্রধান রপ্তানিদ্রব্যঃ ধান, চিনামাটি।[২]

শিল্প ও কলকারখানা[সম্পাদনা]

বরফকল, আটাকল, স’মিল ওয়েল্ডিং কারখানা।[২]

কুটির শিল্প[সম্পাদনা]

স্বর্ণশিল্প, মৃৎশিল্প, লৌহশিল্প, তাঁতশিল্প, সূচিশিল্প, কাঠের কাজ।[২]

হাটবাজার ও মেলা[সম্পাদনা]

হাটবাজার ২৮, মেলা ৩।[২]

  • দুর্গাপুর- বুধবার ও শনিবার।
  • ঝাঞ্জাইল- বুধবার ও শনিবার
  • শিবগঞ্জ- শুক্রবার ও সোমবার।
  • কুমুদগঞ্জ- রবিবার ও বৃহস্পতিবার।
  • কাপাসটিয়া-শনিবার ও মঙ্গলবার।
  • গুজিরকোণা- শুক্রবার ও সোমবার।
  • কৃষ্ণেরচর- রবিবার ও বৃহস্পতিবার।
  • বিপিনগঞ্জ- রবিবার ও বৃহস্পতিবার।
  • শংকরপুর- শুক্রবার ও মঙ্গলবার।
  • বড়বাট্টা- বৃহস্পতিবার ও রবিবার।
  • লক্ষ্মীপুর- বৃহস্পতিবার ও রবিবার।
  • চৈত্রসংক্রান্তির মেলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

স্বাস্থ্য সেবা[সম্পাদনা]

পানীয়জলের উৎস নলকূপ ৮৭.৫৯%, ট্যাপ ০.৭৫%, পুকুর ১.১২% এবং অন্যান্য ১০.৫৪%। এ উপজেলার অগভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। আয়রন সমস্যা এখানকার নলকূপের আর একটি প্রধান সমস্যা

স্যানিটেশন ব্যবস্থা এ উপজেলার ১৬.৫৮% (গ্রামে ১৪.১০% ও শহরে ৩৬.৩১%) পরিবার স্বাস্থ্যকর এবং ৫৮.৮৭% (গ্রামে ৬০.৩৭% ও শহরে ৪৬.৯৫%) পরিবার অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। ২৪.৫৫% পরিবারের কোনো ল্যাট্রিন সুবিধা নেই।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রঃ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১টি, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ১টি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ৭টি, ক্লিনিক ৩টি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ভূমিকম্পে উপজেলায় অনেক প্রাণহানির ঘটনাসহ ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং বেশকিছু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।

খনিজ সম্পদ[সম্পাদনা]

এই এলাকার প্রধান খনিজ সম্পদ হচ্ছে- চিনামাটি বা সাদা মাটি। নিচে খনিজ সম্পদের তালিকা দেয়া হলো :

  • চিনা মটি।
  • কাকর মাটি।
  • নূড়ী পাথর।
  • কয়লা।

উল্লেখযোগ্য পত্রপত্রিকা[সম্পাদনা]

পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী ত্রৈমাসিক পত্র

  • স্বাধীন
  • একুশ শতকের স্রোত
  • সোমেশ্বরী
  • জলসিড়ি
  • মাটির সুবাস

গবেষণা পত্রিকা

  • জানিরা

মাসিকপত্র

  • আর্য প্রদীপ
  • কৌমুদী
  • আর্যপ্রভা (অবলুপ্ত)

সাহিত্যপত্র

  • স্মৃতি কানন

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

লাইব্রেরি ৩টি, ক্লাব ৪০টি, হল ১টি, মহিলা সংগঠন ১টি, খেলার মাঠ ১৪টি, নাট্যমঞ্চ ২টি, নাট্যদল ৩টি।

বেসরকারি সংস্থা[সম্পাদনা]

  • ব্র্যাক
  • কারিতাস
  • প্রশিকা
  • আশা
  • ওয়ার্ল্ড ভিশন
  • সাদবাংলা
  • ওয়াশ প্রভৃতি

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

কমরেড মনি সিংহ বিপ্লবী টঙ্ক যোদ্ধা

হাজং নেতা মনা সর্দার, কমরেড মণি সিংহ, অধ্যাপক শহিদ আরজ আলি; যার স্বারক ডাক টিকিট ও একটি চলচ্চিত্র রয়েছে। আরজ আলী সরকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারী কমান্ডার। বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মেহের আলী তালুকদার, সমাজ সেবক প্রয়াত কছর উদ্দিন তালুকদার, সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত জালাল উদ্দিন তালুকদার, ভাষা সৈনিক প্রয়াত দিলীপ কুমার মজুমদার।

প্রধান নদনদী সমুহ[সম্পাদনা]

সোমেশ্বরী নদী[সম্পাদনা]

সোমেশ্বরী নদী
সোমেশ্বরী নদী আর ধুধু আকাশ

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীর সৃষ্টি। অবশ্য এক সময় সমগ্র নদীটি সিমসাং নামে পরিচিত ছিল। মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা বাজার (পূর্ব নাম বঙ বাজার) হয়ে বাংলাদেশের রাণীখং পাহাড়ের কাছ দিয়ে সোমেশ্বরী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাণীখং পাহাড়ের পাশ বেয়ে দক্ষিণ দিক বরাবর শিবগঞ্জ বাজারের কাছ দিয়ে সোমেশ্বরী নদী বরাবর পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়।

কংশ নদী[সম্পাদনা]

কংশ নদী ভারতের মেঘালয় ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতের শিলং মালভূমির পূর্বভাগের তুরার কাছে গারো পাহাড়ে এই নদীটির উৎপত্তি। উৎস থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হওয়ার পর শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলা সদরের প্রায় ১৬ কি.মি. উত্তর দিয়ে কংস বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সেখান থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীতে মিশেছে। কংস ও সোমেশ্বরী মিলিত স্রোত বাউলাই নদী নামে পরিচিত। প্রবাহ পথে নদীটি ফুলপুর, নালিতাবাড়ি, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, পূর্বধলা, র্দুর্গাপুর, নেত্রকোনা সদর, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ ও ধর্মপাশা উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

আত্রাখালি নদী[সম্পাদনা]

আত্রাখালি নদী সুসঙ্গ দুর্গাপুর বাজারের উত্তর দিক দিয়ে সোমেশ্বরী নদী থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। কিছু দূর এগিয়ে সোমেশ্বরীর মূলধারা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আত্রাখালি নদী এখন খুব বেশি খরস্রোতা নয়।

দর্শনীয় স্থান[সম্পাদনা]

উল্লেখযোগ্য স্থানের বর্ণনা নিচে দেয়া হলোঃ

গারো পাহাড়[সম্পাদনা]

গারো পাহাড়ের দৃশ্য

গারো পাহাড় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো-খাসিয়া পর্বতমালার একটি অংশ। এর কিছু অংশ ভারতের আসাম রাজ্য ও বাংলাদেশের নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত। গারো পাহাড়ের বিস্তৃতি প্রায় ৮০০০ বর্গ কিলোমিটার। সুসং দুর্গাপুর এর উত্তর সিমান্তে নলুয়াপাড়া, ফারংপাড়া, বাড়মারি, ডাহাপাড়া, ভবানিপুর , বিজয়পুর ও রানিখং সহ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এর বিস্তার। এই পাহাড়ে প্রচুর পরিমানে মুল্যবান শাল গাছ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। এই পাহাড় গুলো প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্যের আধার।[৩]

সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি[সম্পাদনা]

সুসং রাজবাড়ির ছোট রাজার বাড়ি

এক সময় দুর্গাপুর ছিল সুসং রাজ্যের রাজধানী। ৩ হাজার ৩শ' ৫৯ বর্গমাইল এলাকা ও প্রায় সাড়ে ৯শ' গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। বর্তমানে এটি নেত্রকোনার একটি উপজেলা। সোমেশ্বর পাঠক থেকে শুরু করে তাঁর পরবর্তী বংশধররা প্রায় ৬৬৭ বছর শাসন করেন এ রাজ্য। কিন্তু রাজকৃষ্ণ নামে এক রাজার শাসনামল থেকে সুসং রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজপরিবারে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ফলে এক সময় গোটা রাজ্য চারটি হিস্যায় ভাগ হয়ে যায় এবং চারটি পৃথক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাড়িগুলো 'বড় বাড়ি', 'মধ্যম বাড়ি', 'আবু বাড়ি' (ছোট অর্থে) ও 'দু'আনি বাড়ি' নামে পরিচিত ছিল। '৪৭-এর দেশ বিভাগ এবং পরবর্তীতে '৫৪ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হবার পর রাজবংশের সদস্যরা ভারতে চলে যান। আর এর মধ্য দিয়েই অবসান ঘটে অনেক শৌর্য-বীর্যখ্যাত সুসং রাজ্যের।[৪]

সুসং রাজবাড়ি দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। পরিখাবেষ্টিত রাজবাড়ির অভ্যন্তরে ছিল সৈনিকদের আবাস, বিচারালয়, কারাগৃহ, অস্ত্রাগার, চিড়িয়াখানা, হাতিশালা, রাজপরিবারের সদস্যদের প্রাসাদ, শয়নকক্ষ, কাছারি, বৈঠকখানা ইত্যাদি। ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সুসং রাজ্যের রাজা জগতকৃষ্ণ সিংহ প্রাচীর চাপা পড়ে নিহত হন এবং রাজবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়। বর্তমানে যে নিদর্শনগুলো টিকে আছে তার অধিকাংশই জগতকৃষ্ণের পরবর্তী বংশধরদের নির্মিত।

সুসং রাজাদের 'বড় বাড়ি'র সামনে তিনতলা একটি বড় ঘরকে 'রংমহল' বলা হতো। দেশ বিভাগের পরও ঘরটি ছিল। ১৯৭০ সালে সেখানে সুসং ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে কলেজ কর্তৃপক্ষ রংমহলের ভগ্নপ্রায় ঘরটি বিক্রি করে দেয়। একটি পানির ইঁদারা ও সীমানা প্রাচীর ছাড়া বড় বাড়ির কোন স্মৃতিচিহ্ন নেই এখন। 'মধ্যম বাড়ি'র বাইরের পূর্ব দিকের একটি ঘর এখন দুর্গাপুর সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ বাড়ির একটি কাছারি ঘর ব্যবহৃত হচ্ছে দুর্গাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে। ১৯৬৯ সালে মধ্যম বাড়ির অভ্যন্তরের কয়েকটি ঘর নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় দুর্গাপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এর মধ্যে দক্ষিণ পাশের একটি ঘর (রাজাদের বাসগৃহ) প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়, উত্তর দিকের ঘরটি (রাজাদের বাসগৃহ) বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকের ঘরটি এখনও শিক্ষক-শিক্ষিকার মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ বাড়িতে আর আছে একটি পুকুর যা এখনও 'রাজবাড়ির বড় পুকুর' নামে পরিচিত। 'আবু বাড়ি'তে স্বাধীনতার চার-পাঁচ বছর আগেও অমরেন্দ্র সিংহ শর্মা নামে সুসঙ্গ রাজবংশের এক সদস্য বসবাস করতেন। এলাকায় তিনি 'মিনি বাহাদুর' নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর দেশত্যাগের পর ওই বাড়ির কয়েকটি ঘর বিভিন্ন সময় সরকারী কর্মকর্তাদের বাসাবাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ওই ঘরটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত। এর ভেতর বাড়ির পেছনের ঘরটিতে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় 'সুসঙ্গ আদর্শ বিদ্যানিকেতন' নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এদিকে, দু'আনি বাড়ির অনেক স্মৃতিচিহ্ন এখনও অক্ষত আছে। বর্তমানে ওই বাড়িতে বসবাস করছেন গোপাল দাস নামে এক ব্যক্তি। তিনি রাজবাড়ির সাবেক কর্মচারী সাধুচরণ দাসের পৌত্র। এ বাড়ির সামনের ঘর (যেখানে রাজারা বসবাস করতেন), পুজোমন্ডপ ও পানির ইঁদারা আজও রাজবংশের স্মৃতি বহন করে চলেছে। পুজোমন্ডপটি 'নিত্যপূজামন্ডপ' হিসেবে পরিচিত। সেখানে আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজো ছাড়াও সারা বছর বিভিন্ন ধর্মীয় পুজো-পার্বণ হয়। কাঠের তৈরি এ ঘরগুলোর নির্মাণশৈলীও বেশ নান্দনিক। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

এছাড়াও দুর্গাপুরের সুসঙ্গ রাজাদের স্মৃতিচিহ্নকে আজও ধরে রেখেছে ১৯১৮ সালে স্থাপিত মহারাজা কুমুদচন্দ্র মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়, দশভুজা মন্দির (যেখানে সোমেশ্বর পাঠক প্রথম ধর্মীয় উপসনালয় স্থাপন করেছিলেন) ও রাজবাড়ির এক ম্যানেজারের বাসভবন। মহারাজা কুমুদচন্দ্র মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়টি দুর্গাপুরের প্রথম উচ্চ বিদ্যালয়। বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ সরকারী। দশভুজা মন্দিরটি পরিচালিত হয় একটি কমিটির মাধ্যমে। এটি স্থানীয় হিন্দু সমপ্রদায়ের অন্যতম উপাসনালয়।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী[সম্পাদনা]

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী

দুর্গাপুরের বাসস্ট্যান্ড এর পাশেই অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী । এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার নানা নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এখানে। সুসং দুর্গাপুর ও এর আশপাশের উপজেলা কলমাকান্দা, পূর্বধলা, হালুয়াঘাট এবং ধোবাউড়ায় রয়েছে গারো, হাজং, কোচ, ডালু, বানাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এদের জীবনধারা যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি বৈচিত্র্যময় এদের সংস্কৃতিও। তাদের এসব ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং চর্চার জন্যই ১৯৭৭ সালে সুসং দুর্গাপুরে তৎকালীন রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর সময়কালে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী । এখানে প্রায় সারা বছরই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ[সম্পাদনা]

টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ

১৯৪৬-৫০ সালে তখনকার জমিদার বাড়ির ভাগ্নে কমরেড মণিসিংহের নেতৃত্বে জমিদারদেরই বিরুদ্ধে শুরু হয় টঙ্ক আন্দোলন। টংক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয় স্মৃতিসৌধ। সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে কিছ দূর গেলে এম.কে.সি.এম হাই স্কুলের পাশে গেলেই চোখে পড়বে এ স্মৃতিসৌধটি। মরহুম রাজনীতিবিদ জালাল উদ্দিন তালুকদারের দানকৃত জমিতে এ স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর কমরেড মণিসিংহের মৃত্যু দিবসে এখানে পাঁচ দিনব্যাপী মণিসিংহ মেলা নামে লোকজ মেলা বসে।

সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী[সম্পাদনা]

সুসং দুর্গাপুর থেকে সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে রিকশায় যেতে হয় রানিখং গ্রামে। এখানে আছে সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। রানিখং গ্রামের এ ক্যাথলিক গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯১২ সালে।

হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ[সম্পাদনা]

সাদা মাটির পাহাড় আর নীল পানির লেক

দুর্গাপুর বাজার থেকে বিজয়পুর পাহাড়ে যাওয়ার পথে কামারখালীতে অবস্থিত রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি সংঘটিত কৃষক ও টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের নেত্রী হাজং মাতা রাশমণির স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে রাশমণি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এখানে নির্মাণ করেছে এ স্মৃতিসৌধটি।

সাদা মাটির পাহাড়[সম্পাদনা]

বিজয়পুরের শসার পাড় এবং বহেরাতলী গ্রামে আছে চীনা মাটির পাহাড়। এখান থেকে চীনা মাটি সংগ্রহের ফলে পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট পুকুরের মতো গভীর জলাধার। পাহাড়ের গায়ে স্বচ্ছ নীল রঙের জলাধার গুলো দেখতে অত্যন্ত চমৎকার।

গ্যালারী[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. দুর্গাপুর উপজেলা (নেত্রকোনা), বাংলাপিডিয়া
  2. ২.০ ২.১ ২.২ ২.৩ ২.৪ আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো; দুর্গাপুর উপজেলা সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭।
  3. http://manobkantha.com/2013/05/08/119891.html
  4. http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=27&dd=2011-05-21&ni=59300

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]


নেত্রকোনা জেলা Flag of Bangladesh
উপজেলা/থানাঃ নেত্রকোনা সদর | মোহনগঞ্জ | মদন | খালিয়াজুড়ি | কেন্দুয়া | দূর্গাপুর | কলমাকান্দা | আটপাড়া | বারহাট্টা | পূর্বধলা