দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভারতের বৌদ্ধ নবজাগরণের প্রতীক

দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন বা নববৌদ্ধ আন্দোলন (পালি : নবযান)[১] হল বিংশ শতাব্দীতে সিংহলি বৌদ্ধ ভিক্ষুগণের সহায়তায় ভারতের দলিতগণকে নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বৌদ্ধ নবজাগরণ। ভারতের দলিত আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ভীমরাও আম্বেডকর বর্ণাশ্রম ভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য হিন্দুসমাজের নিন্দাপূর্বক সমস্ত দলিত অর্থাৎ শূদ্রাদি নিম্নবর্ণীয় ব্যক্তিগণকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হতে আহ্বান করেন এবং এর ফলে এই আন্দোলন বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।

উদ্ভব[সম্পাদনা]

বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক শাক্যমুনি বুদ্ধের পরিনির্বাণলাভের অনতিকাল পরেই বৌদ্ধ ধর্ম বিপুল প্রসার লাভ করে এবং ভারতের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। কিন্তু খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতেই ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থান এবং ইসলামের আগমনের ফলে ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম অবলুপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে সিংহলি বৌদ্ধ ভিক্ষু অনাগরিক ধর্মপাল কর্তৃক মহাবোধি সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উক্ত সংগঠনের নেতৃত্বাধীনে ভারতে পুনরায় বৌদ্ধ ধর্মের নবজাগরণ সূচিত হয়। যদিও সেইসময় মহাবোধি সোসাইটি মূলত উচ্চবর্ণীয় ব্যক্তিদের বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল।

দক্ষিণ ভারত[সম্পাদনা]

উত্তরপ্রদেশ[সম্পাদনা]

নিবন্ধের এই অংশটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এই অংশটিকে সমৃদ্ধ করতে পারেন

ভীমরাও রামজি আম্বেডকর[সম্পাদনা]

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে য়েবলা সম্মেলনে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেডকর ঘোষণা করেন যে তিনি কিছুতেই একজন হিন্দুধর্মাবলম্বী হিসেবে মৃত্যুবরণ করবেন না কারণ হিন্দুধর্ম বর্ণভিত্তিক সমাজব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্য বিভেদ এবং বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এর প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ আম্বেডকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রত্যেকেই তাঁকে স্ব স্ব ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর বিভিন্ন বৈঠকে দলিতদের ধর্মান্তরিত হওয়ার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলি আলোচিত হয়। ১৯৩৬ সালের ২২ মে লখনউতে একটি " সর্বধর্ম সম্মেলন " অনুষ্ঠিত হয়। জগজীবন রাম সহ বহু বিশিষ্ট দলিত নেতৃবর্গ উক্ত সম্মেলনে যোগদান করেন, যদিও বাবাসাহেব আম্বেডকর এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। এই সম্মেলনে ইসলাম, খ্রিস্ট ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিগণ তাঁদের ধর্মের গুণাবলি দলিত নেতাদের সামনে ব্যাখ্যা করেন।

১০ জুন, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ভিক্ষু লোকনাথ বাবাসাহেব আম্বেডকরের দাদরের বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন। পরে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লোকনাথ জানান যে আম্বেডকর বৌদ্ধ ধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং সমগ্র দলিত সম্প্রদায়কে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। ১৯৩৭ সালে লোকনাথ তাঁর সিংহলে অবস্থিত ছাপাখানা থেকে ভারতের নিপীড়িত এবং দলিত সম্প্রদায়ের উদ্দেশে একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন যাতে লিখিত হয়, বৌদ্ধ ধর্ম আপনাদের মুক্তি এনে দেবে

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধে আম্বেডকর একবার কানপুরে অবস্থিত আচার্য ঈশ্বরদত্ত মেধার্থীর বুদ্ধিপুরী বিদ্যালয়ে ভ্রমণ করেন। ইতিপূর্বেই মেধার্থী ভিক্ষু লোকনাথ কর্তৃক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন এবং ১৯৪০ সালের মধ্যভাগে তাঁর আম্বেডকরের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। দিল্লিতে কিছুদিনের জন্য আম্বেডকর আচার্য মেধার্থীর নিকটে পালি ভাষাও শিক্ষা করেন।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কোল্হাপুরের মহারাজ চতুর্থ সাহু কর্তৃক আয়োজিত " অব্রাহ্মণ সম্মেলন "-এ আম্বেডকর প্রথমবার বোধানন্দ মহাস্থবিরের সাক্ষাৎপ্রাপ্ত হন। ১৯৪০ সালে পর পর দু'টি অনুষ্ঠানে তাঁরা পুনরায় সাক্ষাৎ করেন এবং ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করেন। মহাস্থবির আম্বেডকরের দ্বিতীয় বিবাহে আপত্তি প্রকাশ করেন কারণ তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী ছিলেন ব্রাহ্মণ কুলজাতা। পরবর্তীকালে মহাস্থবিরের অনুগামীগণ আম্বেডকরের " রিপাবলিকান পার্টি " (Republican Party)-তে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

আম্বেডকরের দীক্ষা[সম্পাদনা]

দলিতদের জন্য একমাত্র বৌদ্ধ ধর্মই মঙ্গলপ্রদ, এই তত্ত্বের উপর বহু গ্রন্থ প্রকাশের পর আম্বেডকর ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ অক্টোবর নাগপুরের দীক্ষাভূমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছ থেকে ত্রিরত্ন এবং পঞ্চশীল গ্রহণ করেন। এরপর সেখানে উপস্থিত তাঁর ৩৮০০০০ অনুগামীও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই দীক্ষানুষ্ঠানে আচার্য ঈশ্বরদত্ত মেধার্থী এবং তাঁর শিষ্য ভোজদেব মুদিত-ও উপস্থিত ছিলেন।

এর পরবর্তীকালে বহু ধর্মান্তরিত দলিত নিজেদের " আম্বেডকর বৌদ্ধ " বলে অভিহিত করেছেন কারণ আম্বেডকরের দীক্ষাগ্রহণের মাধ্যমেই এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ এই আন্দোলনকে নববৌদ্ধ আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কারণ এর ফলে ভারতে অবলুপ্তপ্রায় বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়েছিল।

আম্বেডকর কর্তৃক গৃহীত ২২টি শপথ[সম্পাদনা]

স্বয়ং দীক্ষাগ্রহণের পর আম্বেডকর তাঁর অনুগামীগণকে দীক্ষাপ্রদান করেন। ত্রিরত্ন এবং পঞ্চশীল গ্রহণের পর তাঁরা সম্মিলিতভাবে ২২টি শপথ গ্রহণ করেন। এরপর ১৬ অক্টোবর ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে আম্বেডকর অপর একটি গণদীক্ষার আয়োজন করেন এবং সেখানেও নবদীক্ষিত বৌদ্ধগণকে নিম্নোল্লিখিত ২২টি শপথ প্রদান করেন।

  1. আমি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের প্রতি কোন বিশ্বাস রাখব না এবং তাদের উপাসনা করব না।
  2. আমি রাম এবং কৃষ্ণ, যারা ঈশ্বরের অবতার রূপে পরিচিত, তাদের প্রতি কোন বিশ্বাস রাখব না এবং তাদের উপাসনা থেকে বিরত থাকব।
  3. আমি গৌরী, গণপতি সহ অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীগণের প্রতি কোন বিশ্বাস রাখব না এবং তাদের আরাধনা করব না।
  4. আমি ঈশ্বরের অবতারে বিশ্বাস করি না।
  5. আমি ভগবান বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে স্বীকার করি না এবং ভবিষ্যতেও করব না। আমি মনে করি এই তত্ত্বটি একটি মিথ্যা প্রচারমাত্র।
  6. আমি শ্রাদ্ধানুষ্ঠান এবং মৃতের উদ্দেশে পিণ্ডদান করা থেকে বিরত থাকব।
  7. আমি সেই সমস্ত কার্যাবলি থেকে বিরত থাকব যার দ্বারা ভগবান বুদ্ধের শিক্ষার অবমাননা হয়।
  8. আমি ব্রাহ্মণগণকে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে হিন্দু শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে ধর্মীয় ক্রিয়াদি সম্পাদন করতে দেব না।
  9. আমি মানুষের মধ্যে সাম্যে এবং ঐক্যে বিশ্বাস করব।
  10. আমি মানবসমাজে সাম্য এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠার্থ আপ্রাণ প্রয়াস করে যাব।
  11. আমি ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত অষ্টাঙ্গ মার্গ অনুসরণ করে চলব।
  12. আমি ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত দশ পারমিতা মান্য করে চলব।
  13. আমি জগতের সকল জীবের প্রতি দয়া এবং করুণা প্রদর্শন করব এবং তাদের রক্ষা করব।
  14. আমি চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করব না।
  15. আমি মিথ্যা বাক্য উচ্চারণ করব না এবং কখনও মিথ্যাচার করব না।
  16. আমি ইন্দ্রিয়কাম চরিতার্থ করার জন্য কোন অসাধু কার্যে লিপ্ত হব না।
  17. আমি মদ্যাদি মাদকদ্রব্য সেবন করব না।
  18. আমি জীবনে প্রতিনিয়ত অষ্টাঙ্গ মার্গ অনুশীলনের প্রয়াস করব এবং সকলের প্রতি করুণা অভ্যাস করব।
  19. আমি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করছি কারণ হিন্দুধর্ম মনুষ্যত্বের পক্ষে ক্ষতিকর। হিন্দুধর্ম বর্ণাশ্রমভিত্তিক সমাজব্যবস্থার মাধ্যমে মানবসমাজে বিভেদের প্রাচীর সৃষ্টি করেছে এবং সাম্য প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করেছে। তাই আমি বৌদ্ধ ধর্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমার ধর্ম হিসেবে অবলম্বন করলাম।
  20. আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম।
  21. আমি বিশ্বাস করি যে আমি জন্মান্তরিত হয়েছি।
  22. আমি এতদ্দ্বারা ঘোষণা করছি যে আমি ভবিষ্যতে ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত ধর্ম দর্শন এবং শিক্ষানুসারে জীবনযাপন করব।

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Omvedt, Gail. Buddhism in India : Challenging Brahmanism and Caste. 3rd ed. London/New Delhi/Thousand Oaks: Sage, 2003. pages: 2, 3-7, 8, 14-15, 19, 240, 266, 271

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ