তিন গোয়েন্দা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

তিন গোয়েন্দা বাংলাদেশের সেবা প্রকাশনী হতে প্রকাশিত জনপ্রিয়[১] একটি কিশোর গোয়েন্দা কাহিনী সিরিজ। এমনকি দৈনিক প্রথম আলো পরিচালিত একটি জরিপে বেরিয়ে এসেছে যে, বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের পঠিত গল্পের বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বই হচ্ছে 'তিন গোয়েন্দা', আর প্রিয় চরিত্রের মধ্যে আছে যথাক্রমে কিশোর পাশা, রবিন মিলফোর্ড আর মুসা আমান। জরিপে ৪৫০ জনের মধ্যে ৮১ জনই (১৮%) তিন গোয়েন্দার পক্ষে মত দিয়েছে।[২]

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাস থেকে বিদেশী কাহিনী অবলম্বনে শুরু হয় এই সিরিজটি। প্রথম থেকই রকিব হাসানই এই বিখ্যাত সিরিজটি লেখার কাজ করেন। রকিব হাসান একটানা ১৬০টি কাহিনী লেখেন। পরবর্তিতে শামসুদ্দীন নওয়াব এটি লেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।[৩] 'তিন গোয়েন্দা' তিনজন কিশোর গোয়েন্দার গল্প।

তিন গোয়েন্দা পুরোপুরি মৌলিক কাহিনী নয়। ইউরোপআমেরিকার বিভিন্ন গোয়েন্দা কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে রচিত। বিশেষ করে প্রথম দিককার বইগুলো রবার্ট আর্থারের (Robert Arthur) ইংরেজি সিরিজ "থ্রি ইনভেস্টিগেটরস" (The Three Investigators) অবলম্বনে রচিত। আবার কিছু বই এনিড ব্লাইটনের "ফ্যামাস ফাইভ" (Famous Five) অবলম্বনে রচিত।[৪] এই তিনজন গোয়েন্দাকে ঘিরেই 'তিন গোয়েন্দা'র শোভন প্রকাশনা বের হয় তিন বন্ধু নামে প্রজাপতি প্রকাশন থেকে।

হারানো উপত্যকা, তিন গোয়েন্দার ২৩ নম্বর বই এর প্রচ্ছদ, প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি, ১৯৮৯

পরিচিতি[সম্পাদনা]

তিন গোয়েন্দা সিরিজের বইগুলোর শুরুতেই একটা পরিচিতি দেয়া থাকে, যেটা নতুন পাঠকের জন্য সহায়িকার কাজ করে। সাধারণত পরিচিতিটা এভাবে দেয়া হয়:[৫]

হ্যাল্লো কিশোর বন্ধুরা
আমি কিশোর পাশা বলছি অ্যামিরিকার রকি বীচ থেকে। জায়গাটা লস অ্যাঞ্জেলসে, প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে। হলিউড থেকে মাত্র কয়েকমাইল দূরে। যারা এখনও আমাদের পরিচয় জানো না, তাদের বলছি আমরা তিন বন্ধু একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলেছি। নাম
তিন গোয়েন্দা
আমি বাঙালি, থাকি চাচা-চাচীর কাছে। দুই বন্ধুর একজনের নাম মুসা আমান। ব্যায়ামবীর, অ্যামিরিকার নিগ্রো, আরেকজন রবিন মিলফোর্ড, আইরিশ অ্যামিরিকান, বইয়ের পোকা।
একই ক্লাসে পড়ি আমরা।
পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে লোহা-লক্কড়ের জঞ্জালের নিচে পুরোন এক মোবাইল হোম-এ আমাদের হেডকোয়ার্টার।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

রকিব হাসানই সেবা প্রকাশনীল কর্ণধার কাজী আনোয়ার হোসেনকে প্রস্তাব করেন কিশোরদের উপযোগী একটি কাহিনী শুরু করার। সেবা প্রকাশনী থেকে তখন কুয়াশা সিরিজ শেষ হয়ে যাওয়ায় আনোয়ার হোসেনও সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। অবশেষে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তিন গোয়েন্দার প্রথম বই "তিন গোয়েন্দা"। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টানা লিখে যান রকিব হাসান। তারপর এই সিরিজের হাল ধরেন শামসুদ্দিন নওয়াব। এদিকে কাজী শাহনূর হোসেনের পরামর্শে তিন গোয়েন্দার পুরোন বইগুলো প্রকাশিত হতে থাকে ভলিউম আকারে, কয়েকটি বই একসাথে। পুরোন বইগুলো আর আলাদাভাবে বের হয় না। এদিকে শামসুদ্দিন নওয়াব মূল চরিত্রগুলোর পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত করলেন নতুন চরিত্র কাকাতুয়া কিকো। শামসুদ্দিন নওয়াবের রচনায় কাহিনীগুলো ধার করা হয় এনিড ব্লাইটন, ক্রিস্টোফার পাইকসহ আরো অনেক লেখকের বই থেকে। এছাড়া সেবা প্রকাশনীর অন্যান্য সিরিজ যেমন "গোয়েন্দা রাজু", "রোমহর্ষক" আর কাজী শাহনূর হোসেনের লেখা "নীল-ছোটমামা" সমস্ত বইই রূপান্তর করা হয়েছে তিন গোয়েন্দায়। এছাড়াও শামসুদ্দিন নওয়াবের পাশাপাশি রকিব হাসানও মাঝে মাঝে তিন গোয়েন্দা লিখে থাকেন।[৬]

পৃথিবীর বৃহত্তম সাধারণ-আগ্রহের বাণিজ্যিক প্রকাশনা সংস্থা ‘র‌্যান্ডম হাউস’ (Random House) কর্তৃক প্রকাশিত মূল ইংরেজি ‘থ্রী ইনভেস্টিগেটরস (১৯৬৪-১৯৮৭)’ সিরিজে ৪৩ টি বই প্রকাশিত হয়েছিল যার মধ্যে ১০টি লেখেন রবার্ট আর্থার (Robert Arthur), ১৩টি লেখেন উইলিয়াম আর্ডেন যার আসল নাম ছিল মাইকেল কলিন্স (Michael Collins) , ২টি লেখেন নিক ওয়েস্ট, ১৫টি লেখেন এম ভি ক্যারি বা ম্যারি ভার্জিনিয়া ক্যারি এবং ৩টি লেখেন মার্ক ব্র্যান্ডেল। এই বইগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। একটি জার্মান-দক্ষিণ আফ্রিকান চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা দুটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন- ‘দা থ্রী ইনভেস্টিগেটরস এন্ড দা সিক্রেট অফ স্কেলেটন আইল্যান্ড (২০০৭)’ এবং ‘দা থ্রী ইনভেস্টিগেটরস এন্ড দা সিক্রেট অফ টেরর ক্যাসল (২০০৯)’, যা ব্যপক জনপ্রিয় হয়। চলচ্চিত্র দুটির কাহিনী বই এর থেকে অনেকটা আলাদা এবং আধুনিক সময় এর পটভূমিতে চিত্রিত যেখানে জুপ, পীট এবং বব এর কাছে ‘জিপিএস’, ‘সেলফোন’ এর মত প্রযুক্তি রয়েছে। পরবর্তিতে ‘দা থ্রী ইনভেস্টিগেটরস ক্রাইম বাস্টার্স (১৯৮৯-১৯৯০)’ নামে একটি সিরিজে ১১টি বই প্রকাশিত হয় যার মধ্যে একটি করে লেখেন উইলিয়াম আর্ডেন এবং মার্ক ব্র্যান্ডেল। ক্রাইম বাস্টার্সের অন্যান্য লেখকরা হচ্ছেন- মেগান এবং এইচ উইলিয়াম স্টাইন, জি এইচ স্টোন, উইলিয়াম ম্যাক কে এবং পিটার লের‌্যাঞ্জিস।

এনিড ব্লাইটন ২১টি ফ্যামাস ফাইভ (১৯৪২-১৯৬৩) সিরিজের বই লেখেন যা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এই সিরিজের ভিত্তিতে ১৯৭৭ সাল এবং ১৯৯৫ সালে টিভি সিরিজ চিত্রিত হয়েছিল। বর্তমানে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা ‘ফ্যামাস ফাইভ’ সিরিজের চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষনা দিয়েছে। ‘ফ্যামাস ফাইভ’ সিরিজ়ের দুই ভাই জুলিয়ান, ডিক এবং তাদের বোন অ্যান কে তিন গোয়েন্দার কিশোর, মুসা, রবিন এ পরিবর্তন করা হয়। তিন ভাই-বোনের চাচাত বোন হল জর্জিনা কিরিন। গোয়েন্দা রাজু সিরিজও ‘ফ্যামাস ফাইভ’ অবলম্বনে লেখা যাতে চরিত্রগুলো ছিল- রাজু, অপু, বাবলী এবং মিশা যারা তিন ভাই-বোন আর এক চাচাত বোনই ছিল। পরবর্তিতে গোয়েন্দা রাজু সিরিজের বই গুলোও তিন গোয়েন্দায় পরিণত করায়, সম্পূর্ণ ‘ফ্যামাস ফাইভ’ সিরিজই তিন গোয়েন্দা সিরিজে অন্তর্ভূক্ত আছে।

‘রোমহর্ষক’ বা রেজা-সুজা সিরিজ লেখা হয়েছে ‘হার্ডি বয়েজ’ (Hardy Boys) সিরিজ অবলম্বনে যেখানে ছেলেরা তিন গোয়েন্দার চেয়ে বয়সে অল্প বড় এবং আপাতদৃষ্টিতে অপেক্ষাকৃত বিপদজনক অভিযানে অংশ নেয়। ‘রোমহর্ষক’ সিরিজের বই গুলোও তিন গোয়েন্দায় পরিণত করায়, ‘হার্ডি বয়েজ’ সিরিজের বইও তিন গোয়েন্দা সিরিজে অন্তর্ভূক্ত আছে। ১৯২৭ সাল থেকে আজ (২০১৪) পর্যন্ত ‘হার্ডি বয়েজ’ সিরিজের ৪৮৯ টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

শামসুদ্দিন নওয়াবের রচনায় কাহিনীগুলোতে ক্রিস্টোফার পাইকের (Christopher Pike) কিছু বই অবলম্বনে লেখা হয়েছে। ক্রিস্টোফার পাইকের আসল নাম কেভিন ক্রিস্টোফার ম্যাকফাডেন এবং তিনি ১৯৮৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ৭৫টি ‘অ্যাডাল্ট ফিকশন’, ভৌতিক এবং ‘ভ্যাম্প্যায়ার’ কাহিনী লেখেন।

প্রধান চরিত্রসমূহ[সম্পাদনা]

তিন গোয়েন্দা বলতেই বোঝায় তিনজন কিশোর, যারা রহস্য সমাধানে প্রচন্ড আগ্রহী, তবে রহস্য সমাধানের পাশাপাশি এডভেঞ্চারও তাদের অন্যতম আকর্ষণ। কিশোর পাশা, মুসা আমান এবং রবিন মিলফোর্ড এই তিনজন কিশোরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তিন গোয়েন্দার কাহিনী। মাঝেমধ্যে জর্জিনা পার্কার (সংক্ষেপে 'জিনা') ও তার কুকুর রাফিয়ান (সংক্ষেপে 'রাফি') তাদের অভিযানে সহায়তা করে। তিন গোয়েন্দা 'গ্রীণ হিলস স্কুল'-এ একই শ্রেণীতে লেখাপড়া করে। তবে তারা কোন শ্রেণীতে পড়ে, বইতে তার উল্লেখ না থাকায় পাঠক কিশোর-কিশোরীরা তিন গোয়েন্দাকে নিজের শ্রেণীর বলে কল্পনা করে নেয়। কিশোর, মুসা এবং রবিন -তিনজনেই বাস করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার রকি বীচ শহরে। তাদের বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী নিয়েই তিন গোয়েন্দা সিরিজ।

কিশোর পাশা[সম্পাদনা]

কিশোর পাশা তিন গোয়েন্দা সিরিজের প্রধান চরিত্র, গোয়েন্দা প্রধান। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। বাবা জাহেদ পাশা। মাত্র ৭ বছর বয়সে এক ঝড়ের রাতে গাড়ি দুর্ঘটনায় তার মা-বাবা দুজনেই মারা যান। চাচা রাশেদ পাশা (মূল চরিত্র- টিটাস জোন্স) ও চাচী মেরিয়ান পাশার (কিশোরদের 'মেরি চাচি', মূল চরিত্র- মাথিল্ডা জোন্স ) কাছেই সে মানুষ (মূল সিরিজে জুপিটারের বাবা মা দুজনেই পেশায় যুগল নৃত্য শিল্পী ছিলেন এবং জুপের ৪ বৎসর বয়সে দুজনে একসাথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান)। চাচা রাশেদ পাশার একটি স্যালভিজ ইয়ার্ড আছে, নাম "পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ড"। রাশেদ পাশা বিশাল পাকানো গোঁফের অধিকারী।[৬] এদিকে কিশোর পাশার কোঁকড়া চুল, গভীর কালো দুচোখে বুদ্ধির ঝিলিক! ক্ষুদ্র জিনিসও তার চোখ এড়ায় না। যে জিনিস একবার দেখে সেটা মনে থাকে দীর্ঘদিন। কিশোর পাশা একজন চমৎকার অভিনেতাও বটে। ছোটবেলায় একটি কমেডি সিরিজে একটা হাসির চরিত্র করেছিলো বলে এখনও সে বেশ লজ্জাবোধ করে (মূল সিরিজে এই অনুষ্ঠানের নাম ‘বেবি ফ্যাটসো’ বা বাংলা সিরিজের ‘পাগল সঙ্ঘ’ বই অনুযায়ী অনুষ্ঠানটির নাম ‘পাগল সঙ্ঘ’ যাতে কিশোরের চরিত্রটি ছিল ‘মোটুরাম’। উল্লেখ্য যে, কিশোর চরিত্রটিকে দেখান হয়েছে সে ছোটবেলায় মোটাসোটা ছিল কিন্তু বর্তমানে আর মোটা নেই। অপরদিকে, মূল সিরিজে জুপিটার সবসময়ই মোটাসোটা, একটু ভারি স্বাস্থ্যের অধিকারী)। ইলেকট্রোনিক্সের কাজে সে বেশ পটু, তাই তাকে "ইলেক্ট্রোনিক্সের যাদুকর"ও বলা হয়। তার মুদ্রাদোষ হলো: গভীর চিন্তামগ্ন অবস্থায় সে ক্রমাগত নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে থাকে। তাছাড়াও সময় নাহলে কখনোই কাউকে কোনো কিছু বলতে চায় না! কোনো বইতে তার 'বাঘা' এবং 'টিটু' নামে দুটি কুকুরের নামও পাওয়া যায়। "থ্রি ইনভেস্টিগেটরস"-এ কিশোর পাশার প্রতিসঙ্গী চরিত্র হলো জুপিটার জোনস (মূল চরিত্র- Jupiter Jones, ডাক নাম জুপ, মূল ইংরেজি সিরিজের প্রচ্ছদ অনুযায়ি জুপ ১৩-১৪ বছর বয়েসি কাল চুলের শেতাঙ্গ আমেরিকান কিশোর। ) ।[৪]

মুসা আমান[সম্পাদনা]

মুসা আমান তিন গোয়েন্দা সিরিজের দ্বিতীয় চরিত্র, গোয়েন্দা সহকারী। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। বাবা-মায়ের সাথে থাকে। বাবা রাফাত আমান হলিউডের বড় টেকনিশিয়ান এবং মা মিসেস আমান গৃহিনী। মুসাকে ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করা, লনের ঘাস ছাটা এসব কাজ প্রায়ই করতে হয়। নিয়মিত ব্যায়াম করে আর পেশিশক্তিতে সবল। প্রয়োজনে প্রচন্ড শক্ত মাথা দিয়ে শত্রুর পেটে আঘাত করতে তার জুড়ি নেই। তার মাঝে মাঝেই নানারকম বাতিক জাগে। কিছুদিন পর তা মিটে গেলে আরেকটা শখে মন চলে যায়। তার মুদ্রাদোষ হলো: কথায় কথায় "খাইছে" কিংবা "ইয়াল্লা" বলা। সে একটু ভোজনরসিকও বটে। কিছুটা ভীতু প্রকৃতির, ভূতে তার যত ভয়। তবে বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সাহসী হয়ে উঠে মুসা। মুসা মোটামুটির দক্ষতার সাথে বিমান চালাতেও পারে।[৫] তবে মুসা বই পড়তে অপছন্দ করে। "থ্রি ইনভেস্টিগেটরস"-এ মুসা আমানের প্রতিসঙ্গী চরিত্র হলো পীট ক্রেনশো (মূল ইংরেজি সিরিজের প্রচ্ছদ অনুযায়ি পীট ১৩-১৪ বছর বয়েসি বাদামী চুলের শেতাঙ্গ আমেরিকান কিশোর। পীট তিন জনের ভিতরে সবচেয়ে লম্বা এবং গঠনে শক্তিশালী)।[৪]

রবিন মিলফোর্ড[সম্পাদনা]

তিন গোয়েন্দার নথি গবেষক হিসেবে পরিচিত রবিন মিলফোর্ড। আয়ারল্যান্ডের বংশোদ্ভূত। বাবা মিস্টার মিলফোর্ড একজন সাংবাদিক এবং মা মিসেস মিলফোর্ড গৃহিনী। রবিনের কাজ হচ্ছে তিন গোয়েন্দার সকল কেসের রেকর্ড রাখা বা নথি সংরক্ষণ করা। পাহাড়ে চড়ায় সে ওস্তাদ; কয়েকবার পাও ভেঙেছে একারণে। বই পড়তে খুব ভালোবাসে আর বইয় থেকে দ্রুত উদ্ধৃতি দিতে পারে বলে সে "চলমান জ্ঞানকোষ" হিসেবে পরিচিত। তিন গোয়েন্দার সবার মধ্যে সবচেয়ে কেতাদুরস্ত আর দেখতেও সুন্দর। রবিন রকি বীচ লাইব্রেরীতে একটি খন্ডকালীন চাকরীও করে। কিছুদিন অবশ্য একটি ব্যান্ডের দলের সঙ্গেও কাজ করেছে। তাছাড়া রবিনও বিমান চালাতে পারে, তবে সে অতোটা দক্ষ নয়।[৫] দলের অন্যান্য সদস্যের মতো সে কারাতে খেলায় দক্ষ। "থ্রি ইনভেস্টিগেটরস"-এ রবিন মিলফোর্ডের প্রতিসঙ্গী চরিত্র হলো রবার্ট বব এন্ড্রুজ (মূল ইংরেজি সিরিজের প্রচ্ছদ অনুযায়ি বব ১৩-১৪ বছর বয়েসি সোনালী চুলের শেতাঙ্গ আমেরিকান কিশোর, চোখে চশমা পরিধান করে। বব তিন জনের ভিতরে লম্বায় এবং সাইজে সবচেয়ে ছোটখাট)।[৪]

সহায়ক চরিত্রসমূহ[সম্পাদনা]

জর্জিনা পারকার ও রাফিয়ান[সম্পাদনা]

জর্জিনা পারকার, সংক্ষেপে তাকে সবাই ডাকে 'জিনা' বলে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী হ্যারিসন জোনাথন পারকারের (মূল চরিত্র- কোয়েন্টিন কিরিন) একমাত্র মেয়ে জিনা।প্প্রথমে জিনা রকি বীচে থাকত না, শ্রেফ ছুটি কাটাতে এসে সে তিন গোয়েন্দার সাথে রহস্যোদঘাটনে জড়াত। পরবর্তীতে সে রকি বীচেই স্কুলে ভরতি হয় (ছুটি গল্প দ্রষ্টব্য)। জিনা পোষা প্রাণীর প্রতি খুব মমতাশীল। 'রাফিয়ান' (মূল চরিত্র- টিমি) নামে তার একটি পোষা কুকুর আছে, যাকে আদর করে সংক্ষেপে 'রাফি' বলে ডাকা হয়- তিন গোয়েন্দার অনেকগুলো তদন্তে সাথে ছিলো রাফিয়ান। জিনা প্রায়ই নিজেকে ছেলেদের সমকক্ষ করে তুলতে ছেলেদের মতো করে ভাবে আর তখন নিজের নাম বলে 'জর্জ গোবেল'। মায়ের থেকে জিনা 'জর্জ গোবেল' নামে একটি দ্বীপের মালিক।এটির মালিক ছিল মূলত তার নানা।

ধারণা করা হয় যে, জিনা চরিত্রটি এনিড ব্লাইটনের (Enid Blyton) "ফ্যামাস ফাইভ" (Famous Five) সিরিজের 'জর্জিনা জর্জ কিরিন' (Georgina George Kirrin) চরিত্র থেকে ধার করা হয়েছে।[৬]

লেখিকা ব্লাইটন প্রকাশ করেন যে, জর্জিনা চরিত্রটি তার নিজের স্বভাবের ছায়া অবলম্বনে রচিত। কাহিনীতে দেখা যায় যে, জর্জিনা বা জর্জ ছেলেমি স্বভাবের, দুঃসাহসী, বদমেজাজি এবং বিশ্বস্ত।

উল্লেখ্য যে, মূল ইংরেজি “দা থ্রি ইনভেস্টিগেটরস" সিরিজ এর পটভূমি মূলত আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসের রকি বিচ এলাকা হলেও, ফ্যামাস ফাইভ সিরিজ এর পটভূমি হল দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ড এর ডরসেট কাউন্টি, অন্যান্য ইংলিশ এবং ওয়েলস কাউন্টি এবং সমুদ্র সৈকত এলাকা।

অন্যান্য চরিত্রসমূহ[সম্পাদনা]

ডেভিস ক্রিস্টোফার[সম্পাদনা]

ডেভিস ক্রিস্টোফার হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যাঁর কাছ থেকে তিন গোয়েন্দার গোয়েন্দাগিরির হাতেখড়ি। (মূল চরিত্র- আলফ্রেড হিচকক (Alfred Hitchcock), তিনি বাস্তব চরিত্র ছিলেন, তার তৎকালীন খ্যাতির কারনে তার নাম অনেকগুলো বই সিরিজ জনপ্রিয় করতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার করা হয়) তিনি হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক। প্রথম গল্পে তিন গোয়েন্দা তাকে একটি ভূতুড়ে বাড়ি খুঁজতে সহায়তা করে, সেই থেকে পরিচয়। পরবর্তীতে প্রায়ই নানারকম কেস তিন গোয়েন্দার হাতে গছিয়ে দিয়েছেন। করেছেন অনেক সাহায্যও। এছাড়া তিন গোয়েন্দার প্রায় প্রতিটি কেসের কাহিনী নিয়েই তিনি কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।

ভিক্টর সাইমন[সম্পাদনা]

ভিক্টর সাইমন হলেন একজন পেশাদার প্রাইভেট গোয়েন্দা (মূল চরিত্র- হেক্টর সেবাস্তিয়েন, একজন লেখক, আলফ্রেড হিচকক এর মত বাস্তব চরিত্র নন। সেবাস্তিয়েন তিন গোয়েন্দার কাছ থেকে শুনে তাদের অভি্যান লিপিবদ্ধ করেন)। তিনি বিভিন্ন সময় নিজের কাছে আসা বিভিন্ন ছোটখাটো কেস ধরিয়ে দেন তিন গোয়েন্দাকে। আবার অনেক সময়ই তিনি নিজে তিন গোয়েন্দার সাথে একই কেসে কাজ করেন। এছাড়া বিভিন্ন রহস্যোদঘাটন শেষে তিন গোয়েন্দা তাঁর কাছে গিয়ে রিপোর্ট জমা দেয়। তিনি খুবই সম্পদশালী ব্যক্তি। ভিক্টর সাইমনের বাসায় একজন ভিয়েতনামী রাঁধুনী আছেন, নাম নিসান জাং কিম, যিনি প্রায়ই উদ্ভট উদ্ভট সব খাবার রান্না করে প্রথমবার মুসাকে দিয়ে চাখিয়ে দেখেন।

ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার[সম্পাদনা]

ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার হলেন রকি বীচ পুলিশ চীফ (মূল চরিত্র- স্যামুয়েল রেনল্ডস, সবাই ‘চীফ রেনল্ডস’ বলে ডাকে। তিনি ভারি, বিশালদেহী এবং মাথায় হালকা টাক রয়েছে। দ্রষ্টব্যঃ ইংরেজি ‘দ্যা থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’ সিরিজের চতুর্থ বই ‘দ্যা মিস্ট্রি অফ দ্যা গ্রীন ঘোস্ট’, লেখক- রবার্ট আর্থার, প্রকাশ- ১৯৬৫ সাল)। তিনি অনেক সময়ই তিন গোয়েন্দাকে বিভিন্ন কেস দিয়ে থাকেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, জটিল নকশার মর্ম উদ্ধার করার জন্য কিশোর পাশার মতো এমন যোগ্য লোক আর তাঁর জানামতে কেউ নেই। ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচারই তিন গোয়ন্দার ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি তিন গোয়েন্দা কে যেকোনো জায়গায় তদন্ত করবার অনুমতি দিয়ে তার নিজের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি সবুজ কার্ড দিয়েছিলেন। এই কার্ডের মাধ্যমে পরবর্তীতে তিন গোয়েন্দা অনেক সুবিধা পায়। এই সবুজ কার্ডে লেখা আছে- “প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে যে, এই কার্ডের বাহক রকি বীচ পুলিশকে সহায়তাকারী একজন স্বেচ্ছাসেবক জুনিয়র সহকারি ডেপুটি। তাকে যেকোন সহযোগীতা প্রদান করলে প্রসংসিত করা হবে।” [৫]

ওমর শরীফ[সম্পাদনা]

ওমর শরীফ মিশরীয় বংশোদ্ভুত রোমাঞ্চপ্রিয় দক্ষ বৈমানিক। তিনি চিত্র পরিচালক ডেভিস ক্রিস্টোফারের পছন্দের পাইলট। গায়ে তাঁর বেদুইনের রক্ত, তাই সাহসের কমতি নেই। ওমরের সাথে তিন গোয়েন্দার বেশ কিছু অভিযান রয়েছে, যেমন: জলদস্যুর দ্বীপ ১ ও ২, গোপন ফর্মুলা, দক্ষিণের দ্বীপ, ওকিমুরো কর্পোরেশন ইত্যদি। 'ওকিমুরো কর্পোরেশন' হলো তিন গোয়েন্দা আর ওমর শরীফের সম্মিলিতভাবে খোলা একটি ফ্লাইং ক্লাব, যার 'ও' দ্বারা বোঝায় ওমর, 'কি' দ্বারা কিশোর, 'মু' দ্বারা মুসা আর 'রো' দ্বারা রবিনকে। ধীরে ধীরে ওমর, তিন গোয়েন্দার পছন্দের 'ওমর ভাই' হয়ে যান।

গোয়েন্দা শোঁপা[সম্পাদনা]

গোয়েন্দা শোঁপা হচ্ছে ইউরোপের একজন বিখ্যাত চিত্রকলা চোর (মূল চরিত্র- ভিক্টর হিউজেনে, ফরাসি নাগরিক এবং বিপদজনক আন্তর্জাতিক চিত্রকলা চোর)। চমৎকার এই বুদ্ধিমান মানুষটির কিশোরের জন্য রয়েছে অন্যরকম এক শ্রদ্ধা। গোয়েন্দা শোঁপার সাথেও তিন গোয়েন্দার কয়েকটি অভিযান রয়েছে। যেমন: কাকাতুয়া রহস্য, ঘড়ির গোলমাল[৬]

শোফার হ্যানসন[সম্পাদনা]

হ্যানসন (মূল চরিত্র- ওরদিংটন) হচ্ছে "রোলস রয়েস"-এর ব্রিটিশ শোফার। মধ্যপ্রাচ্যের এক শেখের জন্য প্রস্তুত করা হয় এই রোলস রয়েস। কিন্তু তিনি নিতে আপত্তি জানানোয় এর প্রতিষ্ঠান "রেন্ট-এ-কার অটোরেন্টাল কোম্পানী" গাড়িটিকে বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় এবং একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেই প্রতিযোগিতায় বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দিয়ে গাড়িটি ৩০দিনের জন্য ব্যবহারের সুযোগ পায় কিশোর পাশা, সেই সুবাদে তিন গোয়েন্দা। সেই গাড়ির চালক হ্যানসন। ৩০ দিনের সুযোগ শেষ হয়ে গেলে অত্যন্ত মূল্যবান "রক্তচক্ষু" পাথর খুঁজে দেবার পর এর মালিক অগাস্ট অগাস্ট তাঁর নামে তিন গোয়েন্দাকে রোলস রয়েস ব্যবহারের অনুমতি এনে দেন। এভাবেই হ্যানসনের সাথে মিত্রতা আরো গভীর হয় তিন গোয়েন্দার। পুরোন প্রায় সব বইগুলোতেই তাঁকে দেখা যায়; অনেক সময় অনেক কেসে সহায়তাও করে থাকেন তিন গোয়েন্দাকে।

ফগর‌্যাম্পারকট[সম্পাদনা]

হ্যারিসন ওয়াগনার ফগর‌্যাম্পারকট একজন পুলিশ কনস্টেবল। তিন গোয়েন্দা তাকে একবাক্যে "ঝামেলা" বলে সম্বোধন করে থাকে, কেননা তিনি কথা কথায় নাক সিঁটকিয়ে 'ঝামেলা' শব্দটি উচ্চারণ করেন। সাধারণত এই চরিত্রটি প্রজাপতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দার শোভন প্রকাশনা তিন বন্ধু সিরিজে দেখতে পাওয়া যায়। ছোটবেলায় যখন 'গ্রিন হীলস' নামক গ্রামে রবিন, মুসা আর মুসার চাচাতো বোন ফারিয়া থাকতো, কিশোর মাঝে মাঝে সেখানে ছুটি কাটাতে যেতো, তখনকার ঘটনাগুলো সাধারণত তিন বন্ধু সিরিজের মুখ্য বিষয়। তিন বন্ধুর এখানেও ঝামেলা বইতে দেখা যায় ফগর‌্যাম্পারকটকে বদলি করে দেয়া হয়েছে গোবেল বীচে।

ববর‌্যাম্পারকট[সম্পাদনা]

উইলিয়াম ববর‌্যাম্পারকট, তিন বন্ধু সংক্ষেপে যাকে বব বলে ডাকে, ফগর‌্যাম্পারকটের ভাতিজা। কিন্তু তার চাচা ফগের সাথে তার আচরণগত বৈশিষ্টের যথেষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তিন গোয়েন্দার ভালো বন্ধু; বিভিন্ন কেসে সরাসরি সহায়তা করেছে সে, যদিও চাচা সব সময়ই বিরোধিতা করেছেন এসবের। সাধারণত 'তিন বন্ধু' সিরিজে তাকে দেখতে পাওয়া যায়।

টেরিয়ার ডয়েল[সম্পাদনা]

টেরিয়ার ডয়েল, তিন গোয়েন্দার কাছে শুঁটকি টেরি নামে যে একবাক্যে পরিচিত। টেরিয়ার সব সময়ই ঝামেলা পাকাতে ওস্তাদ। তারও নিজস্ব একটা বিচ্চু বাহিনী আছে, যারা প্রায়ই তিন গোয়েন্দার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। মুসা টেরিকে দুচোখে দেখতে পারে না। শুঁটকি টেরির মূল ধারণাটা নেওয়া হয়েছে থ্রি ইনভেস্টিগেটরস-এর "স্কিনি নরিস" চরিত্রটি থেকে।[৬]

তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টার, উপকরণাদি ও কৌশল[সম্পাদনা]

হেডকোয়ার্টার[সম্পাদনা]

তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টার বা প্রধানকেন্দ্র বলতে বোঝায় একটি মোবাইল ভ্যান, যা ফেলনা অবস্থায় রাশেদ পাশা দীর্ঘদিন আগে কিনে এনেছিলেন। পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে লোহা-লক্কড়ের স্তুপের নিচে পড়ে যাওয়ায় বেমালুম ভুলেই গেছেন কিশোরের চাচা। আর সেই সুযোগে বোরিস ও রোভার এর সাহায্যে তিন গোয়েন্দা সেই মোবাইল হোমের ভিতর তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের হেডকোয়ার্টার। হেডকোয়ার্টারের স্থান খুব ছোট হলেও এতে রয়েছে ডার্করুম, যেখানে তিন গোয়েন্দা ছবি ওয়াশ করে থাকে; আছে নিজেদের বসার জন্য আলাদা জায়গা; টেলিফোন ও তাতে সংযোগ দেয়া লাল বাতি, যাতে হেডকোয়ার্টারের বাইরে থাকলে ঐ বাতির জ্বলা-নিভা দেখে তারা বুঝে নিতে পারে হেডকোয়ার্টারে টেলিফোন বাজছে; আছে প্যারিস্কোপ, তিন গোয়েন্দা যার নাম দিয়েছে "সর্বদর্শন"; তবে "গোরস্তানে আতংক" বই-এ প্যারিস্কোপের জায়গায় সিসি ক্যামেরা দেখা গেছে এছাড়া আছে নিজেদের তদন্ত করা কেস-রিপোর্টগুলো সংরক্ষণের জায়গা। এই গোপন হেডকোয়ার্টারে ঢোকার জন্য তারা তৈরি করে নিয়েছে আলাদা আলাদা গোপন পথ: "সবুজ ফটক এক", "দুই সড়ঙ্গ", "সহজ তিন", "লাল কুকুর চার" হলো সেসব গোপন পথেরই গুপ্ত নাম।

কার্ড[সম্পাদনা]

পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডেই তিন গোয়েন্দা একটি পুরোন ছাপার-যন্ত্রকে সারিয়ে নিয়ে নিজেদের কার্ড ছাপিয়ে নেয়। কার্ডের উপরে শিরোনাম আকারে বড় করে লেখা থাকে "তিন গোয়েন্দা" কথাটি; তার ঠিক নিচেই থাকে তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?); তার নিচে প্রথম সারিতে "গোয়েন্দা প্রধান:কিশোর পাশা", দ্বিতীয় সারিতে "গোয়েন্দা সহকারী:মুসা আমান", তৃতীয় সারিতে "নথি গবেষক: রবিন মিলফোর্ড" লেখা। কার্ডের গায়ে তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেয়ার বুদ্ধিটা কিশোরের। এই তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন একই সাথে তিনজন গোয়েন্দাকে প্রতীকায়িত করবে, আর রহস্যময়তা ও জিজ্ঞাসা ফুটিয়ে তুলবে। এছাড়া এই চিহ্ন (?) তাদের নিজেদের ট্রেডমার্ক (Card and Trade mark of 'The Three Investigators') হিসেবেও কাজ করে, কেননা যখনই তারা কোথাও বিপদে পড়ে যায়, তখনই এই চিহ্ন এঁকে নিজেদের উপস্থিতি বা অবস্থান জানান দিয়ে থাকে অন্যদের। এভাবে অনেকবারই তারা বিভিন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে।

অবশ্য পরবর্তিতে তিন গোয়েন্দা তাদের কার্ডে প্রশ্নবোধক চিহ্নের স্থলে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) বসিয়ে নেয়। কিশোরের অভিমত, এই চিহ্ন দ্বারা নাকি আরো বেশি রহস্যময়তা ফুটিয়ে তোলা যায়। কার্ডের গায়ে এরকম চিহ্ন দেয়ার ক্ষেত্রে কিশোরের অভিমত হলো, এভাবে নাকি কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় এবং অপরিচিত ব্যক্তি কাছে চিহ্নগুলোর অর্থ বোঝানোর ছলে কিছুক্ষণ অতিরিক্ত সময় বের করে কথা বলা যায়, এতে তদন্তে অনেক সুবিধা হয়। তবে এই সব চিহ্ন অনেকের সন্দেহ জাগানোয় কিশোর কিছু দিনের জন্য চিহ্নগুলো উঠিয়ে দেয়।

কৌশল[সম্পাদনা]

তিন গোয়েন্দার তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি হলো "ভূত-থেকে-ভূতে"। এই পদ্ধতিতে কোনো সন্দেহজনক চরিত্র কিংবা কোনো কিছুর খোঁজ পেতে শহরের ছেলে-মেয়েদের সহায়তা নিয়ে থাকে তিন গোয়েন্দা। এজন্য প্রথমে তিন গোয়েন্দার প্রত্যেক সদস্য তাদের ৫ জন বন্ধুকে ফোন করে কিসের খোঁজ করছে তা জানিয়ে দেয়। যাদেরকে ফোন করেছে তাদের প্রত্যেকে আবার ৫ জন বন্ধুকে ফোন করে এটা জানায়। এই বন্ধুরা ফোন করে তাদের ৫ জন বন্ধুকে। এভাবে শহরের তাবৎ ছেলে-মেয়েরা জেনে যায় খবরটি। ভূত-থেকে-ভূতের সঙ্গে মিল আছে জুপিটার জোনসদের "ঘোস্ট টু ঘোস্ট হুক আপ"[৬]

সমালোচনা[সম্পাদনা]

তিন গোয়েন্দা বিভিন্ন সময় সমালোচিত হয়েছে নানা কারণে। প্রথমত তিন গোয়েন্দা মৌলিক কাহিনী না হওয়ার কারণে সমালোচিত হয়। কিন্তু বিপুল চাহিদার ভিড়ে সেই সমালোচনা তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। এছাড়া মাসুদ রানা সিরিজের প্রাথমিক বদনামের প্রেক্ষিতে 'প্রজাপতি' মার্কাওয়ালা বই অনেক পরিবারে নিষিদ্ধ হয়ে যায় বলে তিন গোয়েন্দাও অনেক অভিভাবকের নজরে নেতিবাচক হয়ে ওঠে। এছাড়া তিন গোয়েন্দা পড়ে এডভেঞ্চারের নেশায় কিছু অত্যুৎসাহী কিশোর বাবা-মা-কে না জানিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ায়ও তিন গোয়েন্দার প্রভাবকে সুনজরে দেখা হয়নি।

তিন গোয়েন্দা সিরিজের বই[সম্পাদনা]

তিন গোয়েন্দা সিরিজের ৩০০'রও বেশি বই বেরিয়েছে। তন্মধ্যে মাত্র তিনটি উপন্যাস আর বাকি সবগুলোই বড় গল্প। উপন্যাসগুলো আলাদা আলাদা বইতে দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত প্রতিটা বইই পেপারব্যাক, এবং দাম কম। তবে প্রজাপতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইগুলো শোভন এবং হার্ডকভারে, আর এগুলোর দামও তুলনামূলক বেশি।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  • imdb: The Secret of Terror Castle, তিন গোয়েন্দার প্রথম বই তিন গোয়েন্দা বইটির কাহিনীনির্ভর নির্মিত চলচ্চিত্র।
  • imdb: The Three Investigators and the Secret of Skeleton Island, তিন গোয়েন্দার বই কঙ্কাল দ্বীপ বইটির কাহিনীনির্ভর নির্মিত চলচ্চিত্র।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Asjadul Kibria (১৭-২৩ জুন, ২০০৮)। "The spy who turns 73" (ওয়েব)। Daily New Age, Xtra (ইংরেজি ভাষায়) (ঢাকা)। সংগৃহীত জুন ২, ২০১০  |Quote= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (|quote= পরামর্শকৃত) (সাহায্য)
  2. তানজিনা হোসেন ও সিমু নাসের (ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০০২ খ্রিস্টাব্দ)। "নতুন প্রজন্ম: বই ও অন্যান্য"। ছুটির দিনে, দৈনিক প্রথম আলো (প্রিন্ট) (বাংলা ভাষায়) (ঢাকা)। পৃ: ৫, ৬।  |note= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য);
  3. "মূল্য তালিকা" (প্রিন্ট) (বাংলা ভাষায়)। সেগুনবাগিচা, ঢাকা: সেবা প্রকাশনী। ফেব্রুয়ারি ১, ২০০৯। 
  4. ৪.০ ৪.১ ৪.২ ৪.৩ সাইফ দবিস (১৭)। "তিন গোয়েন্দা সিরিজের রহস্যভেদ হলো!" (ওয়েব)। ওয়েব (বাংলা ভাষায়)। সংগৃহীত জুন ২, ২০১০  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  5. ৫.০ ৫.১ ৫.২ ৫.৩ রকিব হাসান। "গোপন ফর্মুলা"। ভলিউম ৩০ (গোপন ফর্মুলা) (প্রিন্ট)। তিন গোয়েন্দা (বাংলা ভাষায়)। সেগুনবাগিচা, ঢাকা: সেবা প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-16-1377-8  |accessyear= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য); |accessmonth= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য);
  6. ৬.০ ৬.১ ৬.২ ৬.৩ ৬.৪ ৬.৫ ইশতিয়াক হাসান (২২ অক্টোবর ২০১০)। "তিন গোয়েন্দার পঁচিশ বছর" (ওয়েব)। দৈনিক কালের কণ্ঠ (বাংলা ভাষায়) (ঢাকা)। সংগৃহীত ২২ অক্টোবর ২০১০