তাল (সঙ্গীত)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

তাল হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাল ছন্দের নিয়ামক এবং ছন্দের অংশাদির আপেক্ষিক লঘুত্ব বা গুরুত্বের নির্ধারক। শাস্ত্রীয় বর্ণনায় তালকে এর থেকেও বেশী মাহাত্ম্য দেওয়া হয়ছে:

"ত-কারঃ শঙ্করঃ ল-কারঃ শক্তিরুচ্যতে।

শিব-শক্তিসমযোগ তালনামাভিধেয়তে।"

অর্থাৎ শিবের তাণ্ডবশক্তির লাস্যের সংযাজনে তালের জন্ম।

লয়, মাত্রা ও তাল[সম্পাদনা]

সঙ্গীতের গতিকে লয় বলে। গতির তারতম্যের জন্য লয়কে তিন ভাগে ভাগ করা যায় - ১) ধীরগতির সঙ্গীতের জন্য বিলম্বিত লয়, ২) দ্রুতগতির সঙ্গীতের জন্য দ্রুত লয় এবং ৩) মধ্যগতির সঙ্গীতের জন্য মধ্য লয়। মধ্য লয় বিলম্বিত লয়ের দ্বিগুণ ও দ্রুত লয়ের অর্ধেক গতির হয়ে থাকে। মাত্রা সঙ্গীতের লয় বা গতির দুরত্ব মাপার জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রত্যেকটি মাত্রার মধ্যবর্তী ব্যবধান সমান হয়। কয়েকটি ছন্দোবদ্ধ মাত্রার সমষ্টি দিয়ে তৈরী হয় একটি তাল[১]

সাধারণ বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

তালের নির্দিষ্ট মাত্রা সমষ্টিকে কতকগুলি ছোট বা বড়, সমান বা অসমান বিভাগ এ বিভক্ত করা হয়। এই বিভাগ দুই বা ততোধিক মাত্রার হতে পারে। এর মধ্যে তালের প্রথম বিভাগের প্রথম মাত্রাকে সম্ বলা হয়। সঙ্গীতের সময়ে সম্ কে অন্য মাত্রা থেকে পৃথক করে বোঝানোর জন্য বিশেষ জোর বা ঝোঁক দেওয়া হয়। সম্ কে বোঝানোর জন্য + বা X চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। তালের একটি বিভাগের প্রথম মাত্রার নাম ফাঁক বা খালি। একে ০ চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়। সঙ্গীতের সময় শব্দ না করে হাতের ইঙ্গিতে ফাঁক কে অন্য মাত্রা থেকে পৃথক করে বোঝানো হয়। তালের বিভাগগুলির মধ্যে যে গুলির প্রথম মাত্রায় হাতে তালি দিয়ে শব্দ করে দেখানো হয়, তাদের তালি বা ভরী বলে। ফাঁক ছাড়া আর সব বিভাগের প্রথম মাত্রায় তালি দেওয়া হয়। তালের প্রথম থেকে শেষ মাত্রা পর্যন্ত বাজানোর পর আবার প্রথম থেকে শুরু হলে তাকে আবর্তন বলে। [১]

বিভিন্ন প্রকার তাল[সম্পাদনা]

ত্রিতাল[সম্পাদনা]

ত্রিতাল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি বহুল ব্যবহৃত তাল। ত্রিতাল ষোলো মাত্রার সমপদী তাল। এর ছন্দ চতুর্মাত্রিক (চার মাত্রার একেকটি, অর্থাৎ চার (১৬/৪) পংক্তি)। এর তিনটি তালি ও একটি ফাঁক, তাই এর নাম তিনতাল বা ত্রিতাল। ত্রিতালের বোল:

  • +ধা' ধিন্' ধিন্' ধা' । ধা' ধিন্' ধিন্' ধা' ।
    না' তিন্' তিন্' তা' । তেটে' ধিন্' ধিন্' ধা' ।। [১]

কাহার্‌বা তাল[সম্পাদনা]

কাহার্‌বা, কাহেরবা, কার্ফা, ইত্যাদি নামে পরিচিত। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে ৪-৪ ছন্দের জন্যে ত্রিতাল ব্যবহার বেশী হলেও লঘু সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ৪-৪ ছন্দের জন্যে কাহারবাই সর্বাধিক ব্যবহৃত। কাহার্‌বা আট মাত্রার একটি সমপদী তাল। চতুর্মাত্রিক (৪-৪) ছন্দ। এর দুটি বিভাগ - একটি তালি ও একটি খালি। কাহারবার বোল:

  • +ধাˈ গেˈ নাˈ তিˈ । নাˈ কˈ ধিˈ নাˈ ।। [১]
  • +ধাˈ গেˈ তেˈ টেˈ । নাˈ কˈ ধিˈ নাˈ ।।

দাদ্‌রা তাল[সম্পাদনা]

এটি একটি ছয় মাত্রার সমপদী তাল। এর ছন্দ ত্রিমাত্রিক। এর দুটি বিভাগ - একটি তালি ও একটি খালি। তালি ১ মাত্রায় ও খালি ৪ মাত্রায়। দাদ্‌রার বোল নিম্নরূপ:

  • +ধাˈ ধিনˈ নাˈ । নাˈ থুনˈ নাˈ ।। [১]
  • +ধাˈ ধিˈ নাˈ । নাˈ তিˈ নাˈ ।।

খেমটা[সম্পাদনা]

দাদ্‌রার ন্যয় 'খেমটা তালটিও ৬ মাত্রায় গঠিত। এতে আছে ১টি তালি বা আঘাত ; ১টি অনাঘাত বা ফাঁক। বোল নিম্নরূপ:

  • +ধা গে কৎ তা ধাগে ধিন ধা।ধা

তেওরা[সম্পাদনা]

তেওরা তালের আরেক নাম তেওট। এটি সাত মাত্রার বিষমপদী তাল। প্রথম বিভাগটি তিন মাত্রার এবং পরের দুটি প্রতিটি দুই মাত্রার। এতে তিনটি তালি আছে এবং কোন ফাঁক নেই। বিভিন্ন বোলে এটি বাজানো যায়। তবে সচরাচর যে সকর বোলে তবলায় সঙ্গৎ করা হয় সেগুলোর কয়েকটি হলো:

  • +ধা দেন্ তা । তিট কতা । গদি ঘিন ।। [১]
  • +ধা কৎ তা । ধিন ধা। ত্রেকে ধিন ।।

রূপক[সম্পাদনা]

রূপক তেওরার অনুরূপ একটি তাল। এটিও সাত মাত্রার বিষম্পদী তাল। প্রথম বিভাগটি তিন মাত্রার এবং পরের দুটি প্রতিটি দুই মাত্রার। রূপক তালে ১টি ফাঁক, ২টি আঘাত ; তবে এতে প্রথমেই সম-এর ঘরে ফাঁক। বোল নিম্নরূপ:

  • তী তী না । ধী না । ধী না ।।[১]
  • তিন তিন তাক । ধিন ধাগে । ধিন ধাগে ।।

ঝাঁপতাল[সম্পাদনা]

ঝাঁপতাল এটি ১০ মাত্রায় গঠিত। এর অন্য নাম পাত্‌রা। এতে আছে ৩টি তালি বা আঘাত ; ১টি অনাঘাত বা ফাঁক। বোল নিম্নরূপ:

  • +ধিন ধা ধিন ধিন ধা
0কৎ তা ধিন ধিন ধা । ধা বা ধিন

বিভিন্ন অপ্রচলিত তাল[সম্পাদনা]

কয়েকটি অপ্রচলিত তাল হলো: তাল খামসা, পটতাল, মোহন তাল, দোবাহার এবং ধামার। তাল খামসা ৮ মাত্রার তাল যাতে ৫টি তালি এবং ৩টি ফাঁক আছে। পটতাল ৪ মাত্রার ; এতে ১ টি তালি এবং ১টি ফাঁক। মোহন তাল ১২ মাত্রায় গঠিত। এতে তালি ৭টি, ফাঁক ৫টি। ১৩ মাত্রার দোবাহার তালে তালি ৯টি এবং ফাঁক ৪টি। ধামার ১৪ মাত্রায় গঠিত। এতে ৩টি তালি এবং ১টি ফাঁক থাকে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ ১.৩ ১.৪ ১.৫ ১.৬ তবলার ব্যাকরণ- প্রথম আবৃত্তি - ডঃ প্রশান্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম প্রকাশ, চতুর্থ সংস্করণ, জানুয়ারী ১৯৯৬, প্রকাশক - প্রজন্ম, ১৯৭ আন্দুল রোড, হাওড়া

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তালসমূহের তালিকা - সম্পাদনা

অর্জুন তাল  • অর্ধ ঝাঁপতাল  • আড় খেমটা তাল  • আড়া চৌতাল  • আড়া ঠেকা তাল  • আদি তাল  • আদ্ধা তাল  • উপরাল তাল  • একতাল  • কুণ্ডল তাল  • কন্দর্প তাল  • কুম্ভ তাল  • করালমঞ্চ তাল  • কুলতাল  • কাওয়ালী তাল  • কাশ্মীরী খেমটা তাল  • কাহারবা তাল  • কৈদ ফোরদস্ত তাল  • খয়েরা তাল  • খামশা তাল  • খেমটা তাল  • গজঝম্প তাল  • গণেশ তাল  • চক্র তাল  • চিত্রা তাল  • চৌতাল  • ছপকা তাল  • ছোট লোফা  • জগপাল তাল  • জয়মঙ্গল তাল  • ঝম্পা তাল  • ঝুমরা তাল  • ঝুলুম তাল  • ঝাতি তাল  • ঝাঁপতাল  • টপ্পা তাল  • ঠুংরী তাল  • ত্রিতাল  • ত্রিপুট তাল  • তিলওয়াড়া তাল  • তেওরা তাল  • দাদরা তাল  • দীপচন্দী তাল  • দোবাহার তাল  • ধুমালী তাল  • ধামার তাল  • নন্দন তাল  • নিঃসারক তাল  • পঞ্চম সওয়ারী তাল  • পটতাল  • পাঞ্জাবী ঠেকা তাল  • পোস্ত তাল  • ফোরদস্ত তাল  • ব্রহ্মতাল  • ব্রহ্মযোগ তাল  • বসন্ত তাল  • বিক্রম তাল  • বিষ্ণুতাল  • বীরপঞ্চ তাল  • ভরতঙ্গা তাল  • মত্ততাল  • মণি তাল  • মহেশ তাল  • মোহন তাল  • যৎ তাল  • যতিশেখর তাল  • রুদ্র তাল  • রূপক তাল  • রাশ তাল  • লক্ষ্মী তাল  • লঘুশেখর তাল  • লীলা বিলাস তাল  • শক্তিতাল  • শঙ্কর তাল  • শঙ্খ তাল  • শিখর তাল  • সওয়ারী তাল  • সুরফাঁকতাল  • সরস্বতী তাল  • সাত্তি তাল  • সেতারখানি তাল  • হপ্তা তাল


রাবীন্দ্রিক তাল: উল্টোষষ্ঠী তাল  • একাদশী তাল  • ঝম্পক তাল  • নবতাল  • নবপঞ্চ তাল  • রূপকড়া তাল  • ষষ্ঠী তাল