টিপাইমুখ বাঁধ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখ বাঁধ ভারত-এ অবস্থিত
টিপাইমুখ বাঁধ এর অবস্থান
দেশ ভারত
অবস্থান টিপাইমুখ
স্থানাঙ্ক ২৪°১৪′১১″ উত্তর ৯৩°০০′৫৫″ পূর্ব / ২৪.২৩৬৩৯° উত্তর ৯৩.০১৫২৮° পূর্ব / 24.23639; 93.01528স্থানাঙ্ক: ২৪°১৪′১১″ উত্তর ৯৩°০০′৫৫″ পূর্ব / ২৪.২৩৬৩৯° উত্তর ৯৩.০১৫২৮° পূর্ব / 24.23639; 93.01528
অবস্থা পরিকল্পিত
বাঁধ এবং স্পিলওয়েস
বাঁধের ধরণ বাঁধ, শিলা-ভরাট
উচ্চতা ১৬২.৮ মি (৫৩৪ ফু)
দৈর্ঘ্য ৩৯০ মি (১,২৮০ ফু)
আবদ্ধতা বরাক নদী
পাওয়ার স্টেশন
ঘূর্ণনযন্ত্র ৬ x ২৫০ মেগাওয়াট ফ্রান্সিস-ধরণ
স্থাপিত ক্ষমতা ১,৫০০ মেগাওয়াট

টিপাইমুখ বাঁধ, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কিলোমিটার উজানে ভারতের বরাক নদীর ওপর নির্মিতব্য (২০০৯) একটি বাঁধ।[১] টিপাইমুখ নামের গ্রামে বরাক এবং টুইভাই নদীর মিলনস্থল। এই মিলনস্থলের ১ হাজার ৬০০ ফুট দূরে বরাক নদীতে ৫০০ ফুট উঁচু ও ১ হাজার ৬০০ ফুট দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে ভারত সরকার কাজ শুরু করেছে [২] অভিন্ন নদীর উজানে এই বাঁধ ভাটির বাংলাদেশের পরিবেশ আর অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে এমত আশঙ্কা করেন বিশেষজ্ঞরা৷[৩]

বরাক অববাহিকা[সম্পাদনা]

বরাক নদীটি ভারতের মণিপুর রাজ্যের কাছার পর্বতে উৎপন্ন হয়ে মণিপুর, আসাম, মিজোরামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অমলসিধের কাছে সুরমাকুশিয়ারা নামে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অমলসিধ থেকে সুরমা প্রায় ২৮ কিলোমিটার এবং কুশিয়ারা কিলোমিটার সীমান্ত নদী হিসাবে প্রবাহিত। বরাকের উজানের অংশটি ভারতের আসাম ও মনিপুর রাজ্যে বিস্তৃত। আর এর ভাটির প্লাবন সমভূমি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।

সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা[সম্পাদনা]

সুরমা অববাহিকা বাংলাদেশের সিলেট এবং সুনামগঞ্জের পূর্বাংশে বিস্তৃত। ভারতের জৈন্তা ও খাসিয়া পাহাড়ে উৎপন্ন জালুখালি, নোয়াগাঙ, সারি-গোয়াইন, লাবাচ্ছড়া এই অববাহিকার অন্যান্য নদী। উল্লেখযোগ্য হাওড়ের মধ্যে আছে পাথারচলি হাওড়, বারো হাওড়, বালাই হাওড়। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা দুটি কুশিয়ারা অববাহিকার অন্তর্গত। সোনাই, জুরী, মনু, খোয়াই নদীগুলো ত্রিপুরা পর্বতে উৎপন্ন হয়ে এই অববাহিকায় প্রবাহিত। উল্লেখযোগ্য হাওড়ের মধ্যে রয়েছে বৃহত্তম হাওড় হাকালুকি হাওড়, কাউয়াদীঘি হাওড়, দামরীর হাওড়, হাইল হাওড়, মাকার হাওড়। সুরমা বরাকের শাখা নদী হলেও শুষ্ক মৌসুমে সুরমার প্রবাহ খুব কম থাকে বলে এটি বরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বরাকের প্রায় সব প্রবাহ তখন কুশিয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়। অমলসিধে বিভক্ত নদীদুটি হবিগঞ্জের মারকুলির কাছে পুণরায় মিলিত হয়ে কালনী নামে প্রবাহিত হয়েছে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে কালনী ঘুরঘাটা নদীর সাথে মিলিত হয়ে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। বরাক নদীর ভারতে প্রবাহিত অংশের দৈর্ঘ্য ৪৯৯ কি.মি.। অন্যদিকে কুশিয়ারা, কালনী এবং মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ৪০৩ কি.মি.। বরাক বাংলাদেশের প্রধানতম নদী মেঘনার সাথে সরাসরি যুক্ত বলে বরাকের গুরুত্ব অনেক বেশি। সমুদ্র সমতল থেকে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার গড় উচ্চতা মাত্র ৬-১২ মিটার। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে নিম্নাঞ্চল। এখানে বৃষ্টিপাতের ধরন কিছুটা ভিন্ন হলেও অন্যান্য অঞ্চলের মত শীতের সময় বৃষ্টিপাত খুব কম হয়। স্বাভাবিকভাবেই তখন জলাভূমিগুলোতে পানি সমতল নিচে নেমে যায়। অনেক জলাভূমি একেবারে শুকিয়ে যায়। এই সুযোগে তখন নীচুভূমিতে উচ্চফলনশীল বোরো আবাদ হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, বোরো ফসলকে রক্ষা করার জন্য এই অঞ্চলের অধিকাংশ হাওড়গুলো কম উচ্চতার বাঁধ (যা বর্ষাকালে তলিয়ে যায়) দিয়ে সুরক্ষিত করা আছে। যারা হাওড় অঞ্চলের মানুষ তারা জানেন শীতের এই রবি ফসলই হাওড়ের একমাত্র ফসল। কিন্তু এই ফসল ঘরে উঠার আগেই এপ্রিল-মে মাসে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল এই অববাহিকার অরক্ষিত নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত করে। তবে এই সময় নদীতে পানিসমতল কম থাকে বলে ঢলের পানি দ্রুত নেমে যায়। খুব অপ্রত্যাশিত মাত্রায় পাহাড়ি ঢল না নামলে প্রতি বছরই কৃষক একটি ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হন। বছরের বাদ বাকি সময়ে কৃষির বদলে হাওড়ের মৎস্য আহরণই হয়ে উঠে এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা।

প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ[সম্পাদনা]

বরাক নদীর উজানের অববাহিকা অঞ্চলটিতে মূলত আদিবাসীদের বসবাস। অধিকাংশ অধিবাসীর পেশা কৃষি। বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা এই অঞ্চলটি ভারতের অন্যান্য অংশের চেয়ে অনগ্রসর। এই অঞ্চলের উন্নতির জন্য শক্তির সরবরাহ এবং কৃষির বিকাশে সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা তাই উন্নয়নের ধারায় বিবেচিত হয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে টিপাইমুখে বরাক নদীর উপর ড্যাম নির্মাণের প্রস্তাবটি সেই ১৯৫৫ সালের দিককার। নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তাবটি আসে ১৯৯৩ সালের দিকে। কিন্তু ভারতের কিছু অঞ্চলসহ বাংলাদেশের নদী-প্রবাহের উপর বিরূপ প্রভাবের কথা আলোচিত হওয়ায় প্রস্তাবনাটির গতি কিছুটা স্তিমিত হয়। বর্তমানে এই বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরুর পথে। বাদবাকি আলোচনার পূর্বে টিপাইমুখ বাঁধের কাঠামোগত খুঁটিনাটি দিকগুলো বিভিন্ন গবেষণা ও প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে কেমন তা জেনে নেয়া জরুরি।

ড্যাম ফিচার[৪][সম্পাদনা]

অবস্থান : ২৪°১৪’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯৩°১.৩’পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। বরাক ও টুটভাই নদীর মিলনস্থল থেকে ৫০০ মিটার ভাটিতে এবং অমলসিধ থেকে ২০০ কি.মি. উজানে প্রকার : মাটির ড্যাম, অভ্যন্তরভাগ পাথর নির্মিত উচ্চতা : ভূমি থেকে ১৬১ মিটার, সমুদ্র সমতল থেকে ১৮০ মিটার দৈর্ঘ্য : ৩৯০ মিটার পানি ধারণক্ষমতা : ১৬ বিলিয়ন ঘনমিটার সর্বোচ্চ রিজার্ভ লেভেল : ১৭৮ মিটার নির্মাণ ব্যয় : ১,০৭৮ কোটি ভারতীয় রুপি সমগ্র প্রকল্পের মোট ব্যয় : ৫১৬৩.৮৬ কোটি ভারতীয় রুপি বহুমূখী এই প্রকল্পটির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মূলত বরাক উপত্যকায় পানি ধারণের মাধ্যমে ২,০৩৯ বর্গকি.মি. এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ। পরবর্তীকালে এই ড্যামের মাধ্যমে সম্ভাব্য জলবিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫০০ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ৪১২ মেগাওয়াট ফার্ম জেনারেশন। টিপাইমুখ ড্যামের মাধ্যমে বরাকের পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে কাছার সমতলে সেচ প্রদানের ব্যবস্থা করাও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রকল্পের কাজ ২০১২ সালের মধ্যে শেষ হবার কথা।

ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থান[সম্পাদনা]

টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। বরাক উপত্যকার নিচে চ্যুতিটি বরাক ও এর অন্যান্য শাখা-প্রশাখাগুলোর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে। প্রস্তাবিত ড্যামটির অবস্থান তাইথু ফল্টের উপর যা ভূ-তাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় এবং ভবিষ্যতে ভুমিকম্পের কেন্দ্র হতে পারে। এছাড়া, সঞ্চরণশীল ভূ-ত্বকীয় প্লেট (ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেট) এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। রিক্টার স্কেলে ৭ এর উপরের মাত্রার অন্তত দুটি ভূমিকম্প টিপাইমুখের ১০০ কি.মি. ব্যাসার্ধের মধ্যে অনুভূত হয়েছে গত ১৫০ বছরে; যার মধ্যে সর্বশেষটির উপকেন্দ্র ছিল টিপাইমুখ থেকে মাত্র ৭৫ কি.মি. দূরে, ১৯৫৭ সালে। উপরন্তু ইন্দো-বার্মা রেঞ্জে টেকটনিক প্লেটের সঞ্চারণের ফলে এ অঞ্চলে মাটির অল্প গভীরে উৎপন্ন ভূমিকম্পের প্রবণতা বেশি। এই ধরনের কম্পনগুলোর তীব্রতা কম হলেও বেশি বিধ্বংসী। বিভিন্ন গবেষণায় পূর্ববর্তী ভূমিকম্পের রেকর্ড, ভূ-ত্বাত্তিক ডাটা এবং টেকটনিক প্লেট সঞ্চারণের ইতিহাস তাই এ আশঙ্কাই ব্যক্ত করে যে, টিপাইমুখ ড্যামটি ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে বিপদজ্জনক একটি অঞ্চলে অবস্থিত।

টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাব[সম্পাদনা]

আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোন দেশ অভিন্ন নদীর উজানে কোন কাঠামো নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই এর ভাটিতে বসবাসকারী জনপদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবতে বাধ্য। দূর্ভাগ্যজনকভাবে দীর্ঘ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের উপর অবশ্যম্ভাবী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার চিত্রটি কোন গবেষণায় স্পষ্টরূপে উঠে আসেনি। এরই মধ্যে বর্তমানে ভারত এই বাঁধ নির্মাণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এনেছে। নির্মাণ কাজ শুরু হবার পথে। বাংলাদেশে উজান থেকে আসা পানির মোট ৭-৮% আসে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের বরাক নদী থেকে। মৎস্য সম্পদ আহরণ ও চাষাবাদের জন্য বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের লাখ মানুষ বরাক নদীর পানি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এই বাঁধ নির্মাণের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা অববাহিকার ২৭৫.৫ বর্গকি.মি. এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, প্রাণীবৈচিত্র সবকিছুর উপর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী কুফল দেখা দেবে।[৫] টিপাইমুখ ড্যাম পরিচালনার পূর্বে যখন রিজার্ভেয়রটি পূর্ণ করা হবে তখন স্বাভাবিকভাবে এর ভাটিতে পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হবে, যা ঐ অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করবে। মৎস্য প্রজননে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় প্লাবনভূমির পরিমাণ শতকরা ৬০% এবং ভরা মৌসুমে অন্তত ২২% হ্রাস পাবে; যদিও এই পরিমাণ ড্যাম ও ব্যারেজ পরিচালনাবিধির সাথে কম-বেশি হতে পারে। এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করার মত তা হলো বরাক থেকে কী পরিমাণ পানি কাছার সমতলে সেচের কাজে ব্যবহারের জন্য ডাইভার্ট করা হবে তার কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য ভারতের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।[৬] এফএপি-৬ এর গবেষণা মতে টিপাইমুখ ড্যাম আর ফুলেরতাল ব্যারেজ নির্মাণের ফলে অমলসিধের কাছে বরাকের পানিপ্রবাহ ভরা মৌসুমে অন্তত ২৫% হ্রাস পাবে, সেই অনুসারে পানি সমতলও ১.৬ মিটার নেমে যাবে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি মাসে) বরাকের প্রবাহ অন্তত ৪.২ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং পানি সমতল বাড়বে প্রায় ১.৭ মিটার। এই অবস্থা সুরমা ও কুশিয়ারার প্রবাহকেও একইভাবে প্রভাবিত করবে। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়লে সেচ ও নাব্যতার কাজে সুবিধা হবে কিন্তু কোন কোন অঞ্চল থেকে পানি নিষ্কাশনের প্রক্রিয়াটি ধীর হয়ে যাবে। ভরা মৌসুমে পানি প্রবাহ হ্রাস আর শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে আপাত দৃষ্টিতে তাকে সুবিধাজনক বলে মনে হলেও দুটি বিষয় আরো গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।

  1. শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির কারণ
  2. বর্ধিত প্রবাহের প্রভাব

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু হলে নিয়ন্ত্রিত প্রবাহের ফলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পানি ছাড়া হবে। এতে করে শুষ্ক মৌসুমে কিছু পানির সরবরাহ থাকবে। এছাড়া ধীরে ধীরে পানি ছাড়ার ফলে মাটির অভ্যন্তর দিয়ে পানির প্রবাহ প্রক্রিয়াও একই ভাবে পরিবর্তিত হবে। এই প্রবাহ প্রক্রিয়া নদীতে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা, কুশিয়ারার পানি সরবরাহ বাড়বে। আগেই বলা হয়েছে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা নিচু জলাভূমিপূর্ণ। এই অঞ্চল শুষ্ক মৌসুম ব্যতীত অন্যান্য সময় জলমগ্ন থাকে। কিন্তু টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে যদি শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ ৬০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, তবে এ সময় নীচুভূমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে; সেই সাথে পাহাড়ী ঢলের পানি সহজে নামতে না পারার কারণে নীচু বাঁধ উপচে বিস্তীর্ণ বোরো ফসল বিনষ্ট হবার আশঙ্কা থাকবে। টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাবে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পলিভরাট প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। ফলে নাব্যতা রক্ষায় অতিরিক্ত ড্রেজিংয়ের মত ব্যয়বহুল পদ্ধতির প্রয়োজন হবে। এছাড়া সুরমা কুশিয়ারাতে বন্যার পরিমাণ কমে যাবে ফলে পলল সমভূমিগুলো পলিমাটি বঞ্চিত হবে এবং নদী অববাহিকার মধ্যবর্তী সমভূমিগুলো নদীর সাথে সংযোগহীন হয়ে পড়বে। এছাড়া অন্তত ৪টি প্রকল্প টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে- আপার সুরমা-কুশিয়ারা রিভার প্রজেক্ট, সুরমা রাইট ব্যাংক প্রজেক্ট, সুরমা-কুশিয়ারা-বাউলাই বেসিন প্রজেক্ট এবং কুশিয়ারা বিঝনা ইন্টারবেসিন প্রজেক্ট। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী মেঘনা বরাক তথা সুরমা-কুশিয়ারার সাথে সরাসরি যুক্ত বলে মেঘনার প্রবাহ হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেঘনার প্রবাহ হ্রাস পেলে এই অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসহ মানুষের নদীকেন্দ্রিক জীবনধারায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসবে; এমনকি উজানের পানিপ্রবাহ হ্রাসের কারণে সাগর থেকে লবণাক্ততা উঠে আসার মত পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কাও অমূলক নয়। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশে পরিবেশগত কি বিপর্যয় ঘটতে পারে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট গবেষণা সীমিত হলেও একথা অনস্বীকার্য যে, বাঁধের উজান ও ভাটিতে স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, ভাটি অঞ্চলে প্লাবন সমভূমি নষ্ট, মৎস্যসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর চলাচল, পলি ও পুষ্টি উপাদানের প্রবাহ বিঘ্নিত হবে; যা বাঁধের নিকটবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। শুধু ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশই নয় বরং এই প্রকল্পের ফলে খোদ ভারতে ২৭,২৪২ হেক্টর বনভূমি বিনষ্ট হবে। আসাম, মণিপুর ও মিজোরামের ৩১১ বর্গ কি.মি. ভূমি প্লাবিত হবে যার অধিকাংশই আদিবাসী অধ্যুষিত। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ১৪৬১ হামর পরিবার এবং জিলিয়ানগ্রং নাগা উপজাতিদের এক-তৃতীয়াংশ তাদের আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য হবে। হামর আর নাগা উপজাতিদের ৬৭টি গ্রাম আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।[৭] বরাক-প্রপাতের মত অনেক ধর্মীয় তীর্থস্থান তলিয়ে যাবে। আর এই সব কিছুই জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী অধিকার ও স্বার্থ পরিপন্থী। সম্প্রতি ভারতের মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানিয়েছেন, এ বাঁধ নির্মিত হলে রিখটার স্কেলের ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে এর পার্শ্ববর্তী ২০০ বর্গকি.মি. এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]