টর্নেডো

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
যুক্তরাষ্ট্রের ওক‌লাহোমা রাজ্যে সৃষ্ট একটি টর্নেডো

টর্নেডো হল বায়ুস্তম্ভের আকারে সৃষ্ট প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণায়মান ঝড় যা মেঘ (সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস, ক্ষেত্রবিশেষে কিউমুলাস) এবং পৃথিবীপৃষ্ঠের সাথে সংযুক্ত থাকে। টর্নেডোর আকৃতি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি দৃশ্যমান ঘনীভূত ফানেল আকৃতির হয়, যার চিকন অংশটি ভূপৃষ্ঠকে স্পর্শ করে এবং এটি প্রায়শই বর্জ্যের মেঘ দ্বারা ঘিরে থাকে।

অধিকাংশ টর্নেডোতে বাতাসের গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় ১৩০ মাইলের (ঘণ্টায় ১৭৭ কিমি) কাছাকাছি, ব্যাপ্তি প্রায় ২৫০ ফুট (৭৫ মিটার) এবং দ্রুত নিঃশেষ হবার আগে এটি কয়েক মাইল বা কিমি পথ পাড়ি দিতে পারে। কিছু টর্নেডো আরো বেশি শক্তিসম্পন্ন হতে দেখা যায়; ঘণ্টায় এগুলোর বাতাসের গতিবেগ থাকে ৩০০ মাইল বা ৪৮০ কিমি-এর বেশি, ব্যাপ্তিতে প্রায় এক মাইল বা ১.৬ কিমি-এর অধিক এবং ভূমির উপর দিয়ে মাইলের পর মাইল প্রায় ১০০ কিমি-এরও অধিক দূরত্ব এগুলো অতিক্রম করতে পারে। [১][২][৩]

যদিও এন্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া প্রায় সর্বত্রই টর্নেডো দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি টর্নেডো সংঘটিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে[৪] এছাড়া দক্ষিণ কানাডা, দক্ষিণ এশিয়া (বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারত), দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বমধ্যাংশ, আফ্রিকার দক্ষিণাংশ, উত্তরপশ্চিম এবং দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ, ইটালি, পশ্চিম এবং দক্ষিণপূর্ব অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে টর্নেডো হতে দেখা যায়। [৫]

পরিচ্ছেদসমূহ

সংজ্ঞাসমূহ [সম্পাদনা]

টেক্সাস-এর সিমুর এলাকায় একটি টর্নেডোর ছবি
টর্নেডো
আবহাওয়া বিজ্ঞানের শব্দকোষ (Glossary of Meteorology) অনুযায়ী, টর্নেডো হল প্রচণ্ডবেগে ঘূর্ণনরত একটি বায়ুস্তম্ভ, যা ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে একটি কিউমুলিফর্ম মেঘ থেকে ঝুলন্ত বা এর নীচে থাকে, এবং প্রায়শই (কিন্তু সবসময় নয়) একটি ফানেলাকৃতির মেঘ হিসেবে দৃশ্যমান থাকে। [৬]
ঘনীভূত ফানেল (Condensation funnel)
একটি টর্নেডো যে দৃশ্যমান হতে হবে এমন নয়, তবে প্রচণ্ড বাতাসের বেগের ফলে সৃষ্ট তীব্র নিম্নচাপ (দেখুন বার্ণৌলির নীতি) এবং তড়িত ঘূর্ণনের ফলে বাতাস ঘনীভূত হয়ে এটি দৃশ্যমান ঘনীভূত ফানেলে পরিণত হয়। [৪] টর্নেডো হল এই বাতাসের ঘূর্ণি বা ভরটেক্স, ঘনীভূত মেঘটি নয়।
ফানেলাকৃতির মেঘ (funnel cloud) হল একটি দৃশ্যমান ঘনীভূত ফানেল যেটি শক্তিশালী বাতাস দ্বারা পৃষ্ঠের সাথে সম্পৃক্ত নয়। সব ফানেলাকৃতির মেঘই টর্নেডোতে পরিণত হয় না। তবে, অনেক টর্নেডোই শুরুতে ফানেলাকৃতির মেঘ হিসাবে থাকে। অধিকাংশ টর্নেডোই ফানেল হিসেবে দৃশ্যমান থাকা অবস্থায় ভূপৃষ্ঠে শক্তিশালী বাতাস উৎপন্ন করে, ফলে ফানেলাকৃতির মেঘ এবং টর্নেডোর মধ্যে পার্থক্য করা দুরূহ হয়ে পড়ে। [৩]
টর্নেডো পরিবার (Tornado family)
অনেক সময় দেখা যায় একটিমাত্র টর্নেডো থেকে অনেকগুলো টর্নেডো এবং মেসোসাইক্লোনের সৃষ্টি হয়। যখন একটি পৃথক মেসোসাইক্লোন থেকে একটি পৃথক টর্নেডোর সৃষ্টি হয়, এই প্রক্রিয়াকে বলে সাইক্লিক টর্নেডোজেনেসিস। একই টর্নেডো থেকে সৃষ্ট টর্নেডোসমূহকে বলা হয় টর্নেডো পরিবার। কখনো কখনো পৃথক একটি মেসোসাইক্লোন থেকে অনেক টর্নেডো একসাথে সৃষ্টি হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় পুরনো টর্নেডো নতুন সৃষ্ট হওয়া টর্নেডোর সাথে একীভূত হয়ে যায়। [৭]
টর্নেডো মড়ক (Tornado outbreak)
কখনো কখনো দেখা যায়, একটি বৃহৎ-স্কেলের ঝড় থেকে অনেকগুলো টর্নেডো সৃষ্টি হয়। যদি কোন রকম বিরতি ছাড়া এরকম একের পর এক টর্নেডো সৃষ্টি হয়, তবে একে টর্নেডো মড়ক বলে, যদিও এর বিভিন্ন সংজ্ঞা রয়েছে। যদি একই এলাকায় কয়েকদিন ধরে এই টর্নেডো মড়ক চলে, তবে একে ধারাবাহিক টর্নেডো মড়ক বলে, যেটিকে অনেক সময় বর্ধিত টর্নেডো মড়কও বলা হয়। [৬][৮][৯]

শব্দের উৎপত্তি [সম্পাদনা]

"টর্নেডো" শব্দটি বাংল ভাষায় এসেছে ইংরেজি ভাষার tornado শব্দের মাধ্যমে। ইংরেজি tornado শব্দটা এসেছে স্পেনীয় অপভ্রংশ tronada ত্রোনাদা থেকে, যার অর্থ "বজ্রসম্পন্ন ঝড়"। এই সব্দটা মূলতঃ লাতিন শব্দ tonare তোনারে (অর্থাৎ "বজ্রপাত") থেকে এসেছে। ধারণা করা হয়, এই দু'টি শব্দের সমন্বয়েই টর্নেডো শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তবে হয়ত কোন লোককাহিনী থেকেও এর বুৎপত্তি হতে পারে। [১০][১১] টর্নেডো সাধারণভাবে টুইস্টার নামেও পরিচিত। [১২]

প্রকার [সম্পাদনা]

২ এপ্রিল, ১৯৫৭ সালে ডালাস,টেক্সাসে সংঘটিত টর্নেডো মড়কের একটি বহু ঘূর্ণি টর্নেডো

প্রকৃত টর্নেডো [সম্পাদনা]

বহু ঘূর্ণি টর্নেডো (Multiple vortex tornado)
বহু ঘূর্ণি টর্নেডো হল এক প্রকার টর্নেডো যাতে দুই বা ততোধিক ঘূর্ণন বায়ুস্তম্ভ একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরতে থাকে। এরকম বহু ঘূর্ণি যে কোন প্রবাহেই সম্ভব হতে পারে, কিন্তু তীব্রতাসম্পন্ন টর্নেডোগুলোতেই সাধারণত বেশী দেখা যায়।
উপটর্নেডো (Satellite tornado)
উপটর্নেডো বা স্যাটেলাইট টর্নেডো হল দুর্বল টর্নেডো যা একটি বড় ও শক্তিশালী টর্নেডোর নিকটবর্তী এলাকায় একই মেসোসাইক্লোনে সৃষ্টি হয়। বড় টর্নেডোটিকে ঘিরে এটি আবর্তিত হতে পারে (তাই এই নামকরণ) এবং দুটো মিলে একটি বৃহৎ বহু ঘূর্ণি টর্নেডো হিসেবে দেখা যায়, যদিও উপ-টর্নেডো এবং মূল টর্নেডোর ফানেলদ্বয় ভিন্ন ভিন্ন এবং উপটর্নেডোর ফানেলটি মূল টর্নেডোর ফানেলের চেয়ে অনেক ছোট হয়। [৩]
ফ্লোরিডার ফ্লোরিডা কিইস-এর কাছে একটি ওয়াটারস্পাউট
জলস্তম্ভ (Waterspout)
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার (National Weather Service) মতে পানির উপর সৃষ্ট টর্নেডোকেই জলস্তম্ভ বলে। তবে গবেষকরা ভাল আবহাওয়ায় সৃষ্ট জলস্তম্ভ এবং টর্নেডোজনিত কারণে সৃষ্ট জলস্তম্ভের মধ্যে পার্থক্য করেন।
  • ভাল আবহাওয়ায় সৃষ্ট জলস্তম্ভ কম ভয়ংকর এবং সাধারণভাবে বেশি দেখা যায় এবং এর গঠন প্রকৃতির সাথে ডাস্ট ডেভিল বা ধূলিঝড় এবং ভূমিস্তম্ভের মিল রয়েছে।[১৩] এগুলো সাধারণত দুর্বল বাতাসসম্পন্ন, মৃদু প্রবাহ এবং ধীর গতিসম্পন্ন হয়।[১৩] এগুলো সাধারণত ফ্লোরিডা কিইসে বেশী দেখা যায়।[১৪]
  • টর্নেডোজনিত জলস্তম্ভ হল আক্ষরিক অর্থে "পানির উপর টর্নেডো"। এগুলো পানিতে মেসোসাইক্লোন টর্নেডোর মতই সৃষ্টি হয়, অথবা ভূমিতে সৃষ্ট টর্নেডোই পানি অতিক্রম করে। যেহেতু এগুলো ভূমিতে সৃষ্ট টর্নেডোর মত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, তাই ভাল আবহাওয়ায় সৃষ্ট জলস্তম্ভের চাইতে এগুলো অধিক ভয়ংকর।
২২ শে মে, ২০০৪ সালে নর্থ প্ল্যাট, নেব্রাস্কার কাছে একটি ল্যান্ডস্পাউট
ভূমিস্তম্ভ (Landspout)
মেসোসাইক্লোনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন টর্নেডোকে সাধারণত ভূমিস্তম্ভ বা ল্যান্ডস্পাউট বলা হয়। এটাকে ভূমির উপর "ভাল আবহাওয়ায় সৃষ্ট জলস্তম্ভের" সাথে তুলনা করা যায়। জলস্তম্ভ এবং ভূমিস্তম্ভগুলো সাধারণত একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন- দুর্বল, ক্ষণস্থায়ী এবং ছোট ঘনীভূত ফানেল সম্পন্ন যেটা অনেক সময় ভূমি পর্যন্ত পৌঁছে না। যদিও এগুলো সাধারণ টর্নেডোর চাইতে অনেক দুর্বল, তবুও এগুলো শক্তিশালী বাতাস উৎপন্ন এবং প্রভুত ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম। [৩][১৫]

টর্নেডো সদৃশ ঘূর্ণন [সম্পাদনা]

দমকা টর্নেডো (Gustnado)
দমকা টর্নেডো হল দমকা বাতাস সম্বলিত ছোট, উলম্ব ঘূর্ণি। যেহেতু এগুলো মেঘের সাথে যুক্ত থাকে না, তাই এদের আসলে টর্নেডো বলা যায় কি না এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এগুলো সৃষ্টি হয়, বজ্রসম্পন্ন ঝড়ের বর্হিপ্রবাহ থেকে দ্রুত গতির ঠান্ডা ও শুষ্ক বায়ু ঝড়ের বর্হিসীমানার অবস্থিত স্থির, উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে যে "রোলিং" এফেক্ট-এর সৃষ্টি হয় তার কারণে। যদি নিম্নস্তরে বায়ুর গতি ও দিক পরিবর্তন খুব দ্রুত হয়, তবে আনুভূমিক (অথবা কোণাকুণি) ভাবে ঘূর্ণন হতে পারে যা ভূমি স্পর্শ করে। এর ফলে দমকা টর্নেডো সৃষ্টি হয়।[৩][১৬] এগুলো সাধারণত সরল-রৈখিক ঝড়ো বাতাসের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কোন এলাকার ক্ষুদ্র অংশে ঘূর্ণন বায়ু দ্বারা মারাত্মক ক্ষতি করে। যেহেতু এগুলো কোরিওলিস শক্তি তথা মেসোসাইক্লোনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তাই এর ঘূর্ণন সাইক্লোনিক বা এন্টি-সাইক্লোনিক যে কোন কিছুই হতে পারে।
সাউথ ক্যারোলিনার জনসনভিলে সৃষ্ট একটি ডাস্ট ডেভিল
ঘূর্ণন ধূলিঝড় (Dust devil)
ধূলিঝড় যখন টর্নেডোর মত স্তম্ভাকারে ঘুরতে থাকে তখন একে ঘূর্ণন ধূলিঝড় বলে যা ডাস্ট ডেভিল নামে ব্যাপক পরিচিত। এগুলো এমন কি খুব দুর্বল টর্নেডোর চাইতেও অধিক দুর্বল হয় এবং পরিষ্কার আকাশে সৃষ্টি হয়। গরমের দিনে ভূমির নিকটবর্তী বায়ু হালকা হয়ে উপরে ঊঠতে থাকলে এটা সৃষ্টি হয়। যদি নিম্নস্তরের বায়ুর গতি ও দিক দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তবে এই উষ্ণ ও উর্দ্ধমুখী বায়ুস্তম্ভ একটি ক্ষুদ্র ঘূর্ণির সৃষ্টি করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠ থেকে দৃষ্টিগোচর হয়। এগুলো টর্নেডো পর্যায়ভুক্ত নয়, কারণ এগুলো ভাল আবহাওয়ায় সৃষ্টি হয় এবং কোন মেঘের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে না। তবে কখনো কখনো শুষ্ক এলাকায় এগুলো মারাত্মক ক্ষতিসাধন করতে পারে। [১৭][১৮]
তুষার জলস্তম্ভ (Winter Waterspout)
তুষার জলস্তম্ভ বা winter waterspout স্নো-ডেভিল বা স্নোস্পাউট নামেও পরিচিত। এটি আবহাওয়ার একটি দুর্লভ নৈসর্গিক ঘটনা যেখানে তুষার ঝড়ের সময় টর্নেডো সদৃশ ঘূর্ণন বা জলস্তম্ভের আকারে ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়।
অগ্নি ঘূর্ণি (Fire whirl)
তীব্র দাবানলের (wildfire) সময় যদি টর্নেডো সদৃশ ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়, তবে সেটাকে অগ্নি ঘূর্ণি বা Fire whirl বলে। এগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র যেসব ঘূর্ণি মেঘের সাথে সংযুক্ত থাকে, তাদেরকেই টর্নেডো হিসেবে বিবেচনা করা হয়; বাকীগুলো টর্নেডো নয়। অগ্নি ঘূর্ণিগুলো সাধারণ টর্নেডোর মত শক্তিশালী হয় না। তবে এগুলোও প্রভূত ক্ষতিসাধনে সক্ষম।[৮]
শীতল বায়ু ঘূর্ণি (Cold air vortex)
শীতল বায়ু ঘূর্ণি হ্ল ক্ষুদ্র ফানেলাকৃতির মেঘ যা কিউমুলিফর্ম মেঘের নীচ বা পাশ থেকে সৃষ্টি হয়। এগুলো ভূমি সমতলে কদাচিৎ বাতাস উৎপন্ন করে। [১৯] যেহেতু এগুলো দুর্লভ, ক্ষণস্থায়ী এবং সহযে সনাক্ত করা যায় না (এগুলোর ক্ষুদ্রাকৃতি ও অঘূর্ণনশীল প্রকৃতির জন্য), তাই এদের গঠন-প্রক্রিয়া সম্পর্কে বেশী কিছু এখনো জানা যায় নি।

বৈশিষ্ট্য [সম্পাদনা]

একটি কীলকাকার টর্নেডো, প্রায় এক মাইল বিস্তৃত।
একটি রজ্জু টর্নেডো নিঃশেষিত পর্যায়ে

আকৃতি [সম্পাদনা]

অধিকাংশ টর্নেডো দেখতে একটি সরু ফানেলের মত হয়, ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বর্জ্যের ক্ষুদ্র মেঘ দ্বারা কয়েকশ গজ (কয়েকশ মিটার) বিস্তৃত থাকে। তবে, টর্নেডো বিভিন্ন আকার এবং আকৃতির হতে পারে।

ক্ষুদ্র, তুলনামূলকভাবে দুর্বল ভূমিস্তম্ভগুলিকে শুধুমাত্র একটি ছোট ধুলার ঘূর্নি হিসেবে ভূপৃষ্ঠে দেখা যায়। যদিও ঘনীভূত ফানেল অনেক সময় ভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত নাও থাকতে পারে, তবু যদি বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় ৪০ মাইলের (বা ঘন্টায় ৬৪ কিমি) বেশী হয়, তবে এ ঘূর্ণন টর্নেডো হিসেবে বিবেচিত হয়। [১৫] বৃহৎ এক-ঘূর্ণি টর্নেডোগুলি দেখতে অনেকটা ভূপৃষ্ঠে পোঁতা কীলকের (Wedge)মত দেখায়। এজন্য এগুলোকে Wedge বা কীলক টর্নেডো বলে। এই কীলকাকৃতির টর্নেডোগুলো এতই বিস্তৃত হয় যে শুধু ঘন কালো মেঘের স্তুপই দেখা যায়, বিস্তারে ভূপৃষ্ঠ থেকে মেঘের দূরত্বের চাইতেও বেশী বিস্তৃত হয়। এজন্য অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদরাও অনেক সময় দূর থেকে দেখে নীচু আকাশে ঝুলন্ত মেঘ এবং কীলকাকার টর্নেডোর মধ্যে পার্থক্য করতে হিমশিম খেয়ে যান। [২০]

নিঃশেষিত পর্যায়ে টর্নেডো দেখতে সরু নল বা দড়ির মত লাগে, এবং অনেক সময় বেঁকে গিয়ে নানা জটিল আকৃতি নেয়। একে বলা হয় রোপিং আউট যেখানে টর্নেডোগুলো রজ্জু টর্নেডোতে পরিণত হয়। বহু-ঘূর্ণি টর্নেডোগুলো দেখতে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রকে আবর্তিত অসংখ্য ঘূর্ণির মত লাগে, অথবা ঘনীভবন, ধুলাবালি এবং বর্জ্যের কারণে সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে একটি ফানেলের রূপ নেয়।[২১]

এসব আকৃতি ছাড়াও বৃষ্টি এবং ধূলার কারণে অনেক সময় টর্নেডোর আকৃতি বোঝা যায় না। এই টর্নেডোগুলো খুবই বিপদজনক, কারণ অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদরাও অনেক সময় এদের সনাক্ত করতে পারেন না।[১৭]

বিস্তার [সম্পাদনা]

যুক্তরাষ্ট্রে একটি সাধারণ টর্নেডো প্রায় ৫০০ ফুট (১৫০ মিটার) বিস্তৃত হয় এবং ভূমিতে প্রায় ৫ মাইলের (৮ কিমি)মত দূরত্ব অতিক্রম করে [১৭], যদিও বিভিন্ন ধরনের টর্নেডো বিভিন্ন আকৃতির হয়, এমনকি কিছু টর্নেডোর বিস্তার কয়েক ফুট মাত্র হতে পারে। একটি টর্নেডোর কথা একবার জানা গিয়েছিল, যার ধ্বংস-পথ (damage path) ছিল মাত্র ৭ ফুট (২ মি)।[১৭] অন্যদিকে কীলকাকার ধরনের টর্নেডোগুলোর ধ্বংস-পথ এক মাইল (১.৬ কিমি) বা তারও বেশী হতে পারে। নেব্রাস্কার হলাম (Hallam) নামক ছোট্ট গ্রামে ২২শে মে, ২০০৪ সালে যে টর্নেডো হয় তা এক পর্যায়ে ভূমিতে ২.৫ মাইল (৪ কিমি) বিস্তৃত ছিল। [২]

পথের দৈর্ঘ্যের ক্ষেত্রে, মার্চ ১৮, ১৯২৫ সালে সংঘটিত ট্রাই স্টেট টর্নেডো যেটি মিসৌরি, ইলিনয় এবং ইন্ডিয়ানা এই তিনটি রাজ্যকে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছিল, সেটি ভূমির উপর একটানা ২১৯ মাইল (৩৫২ কিমি) পথ পারি দিয়েছিল। বেশীরভাগ টর্নেডো যেগুলোর পথের দৈর্ঘ্য ১০০ মাইলের বেশী তারা মূলত একটি টর্নেডো পরিবার, যেগুলো পরপর সংঘটিত হয়, যদিও ট্রাই স্টেট টর্নেডোর ক্ষেত্রে যে এমনটি ঘটেছিল তার কোন উল্লেখযোগ্য প্রমাণ নেই[৮] সর্বোপরি, এর পথটির বর্তমান পুনর্বিশ্লেষণে দেখা গেছে টর্নেডোটি যেখান থেকে শুরু হয়েছে ভাবা হয়েছিল সেখান থেকে আরো ১৫ মাইল (২৪ কিমি) দক্ষিণে এটি সৃষ্টি হয়েছিল। [২২]

বাহ্যিক রূপ [সম্পাদনা]

টর্নেডো পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ভিত্তিতে বিভিন্ন বর্ণের দেখায়। শুষ্ক পরিবশে এগুলো প্রায় অদৃশ্য থাকে, কেবলমাত্র ফানেল যেখানে গঠিত হয় সেখানে ঘূর্ণনরত বর্জ্য দেখে চিহ্নিত করা যায়। যে ঘনীভূত ফানেলে কোন বর্জ্য থাকে না বা কিঞ্চিৎ থাকে, সেগুলো ধূসর থেকে সাদা বর্ণের হয়। জলস্তম্ভ হিসেবে যখন এগুলো পানির উপর দিয়ে যায়, তখন সাদা এমনকি নীল বর্ণ ধারণ করে। যেসব ফানেল শ্লথ গতির হয়, সেগুলো অনেক বর্জ্য, ধূলাবালি টেনে নেয়; এগুলো সাধারণত গাঢ় বর্ণের, বর্জ্যের রং ধারণ করে। গ্রেট প্লেইনসের টর্নেডোগুলি ভূমির লাল বর্ণের জন্য লাল রঙ্গের হয় এবং পাহাড়ী এলাকার টর্নেডোগুলো অনেক সময় তুষার-আবৃত এলাকা পার হয়ে উজ্জ্বল সাদা বর্ণ ধারণ করে। [১৭]

মে ৩০, ১৯৭৬-এ একই সময়ে দু'জন ফটোগ্রাফারের তোলা ওকলাহোমা এলাকার টর্নেডোর ছবি। উপরের ছবিতে, টর্নেডোটি সম্মুখ দিক থেকে আলো পাচ্ছে (front-lit), সূর্যের অবস্থান পূর্বদিকে মুখ করে রাখা ক্যামেরার পেছনে, ফলে ফানেলটি প্রায় সাদা রঙ্গের দেখাচ্ছে। নীচের ছবিতে, ক্যামেরার অবস্থান আগের অবস্থানের বিপরীতে, টর্নেডোটি পিছন দিক থেকে আলো পাচ্ছে (back-lit), সূর্য এখানে মেঘের পেছনে রয়েছে।[২৩]

টর্নেডোর বাহ্যিক রূপের জন্য আলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। টর্নেডো দেখার সময় যদি সূর্য এর পেছনে থাকে (back-lit) , তবে টর্নেডো কালো দেখায়। অপরদিকে, সূর্য যদি দর্শকের পেছনে থাকে, একই টর্নেডো ধূসর বা উজ্জ্বল সাদা দেখায়। সূর্যাস্তের সময় যেসব টর্নেডো হয়, সেগুলি আলোর কারণে হলুদ, কমলা, গোলাপী ইত্যাদি বিভিন্ন বর্ণের হতে পারে। [২৪][১২]

মূল ঝড়ের বাতাস থেকে উৎসারিত ধূলা-বালি, ভারী বৃষ্টি ও শিলা, এবং রাতের অন্ধকার সব উপাদানই টর্নেডোর দৃষ্টিগ্রাহ্যতা সীমিত করতে পারে। এসব পরিবেশে সৃষ্ট টর্নেডোগুলো খুবই বিপদজনক, কারণ এসব ক্ষেত্রে তখন শুধুমাত্র রেডার অবজারভেশন, অথবা অগ্রগামী টর্নেডোর শব্দ থেকেই আসন্ন বিপদ সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়। সৌভাগ্যক্রমে অধিকাংশ বড় টর্নেডোই ঝড়ের বৃষ্টি-মুক্ত অংশে বা ঝড়ের যে অংশে বায়ু ঊর্ধ্বগামী (updraft), যেখানে বৃষ্টি হয় না বা খুব কম হয় সে অংশে সৃষ্টি হয়। এছাড়া, অধিকাংশ টর্নেডো বিকালের দিকে সৃষ্টি হয়, যখন সূর্যের উজ্জ্বল আলো গভীর মেঘমালাকেও ভেদ করতে পারে।[৮] অন্যদিকে, রাতের টর্নেডোগুলো বজ্রপাত দ্বারা প্রায়শই আলোকিত হয়।

ডপলার মোবাইল রেডার থেকে প্রাপ্ত ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যে অধিকাংশ টর্নেডোর ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ন্যায় তীব্র নিম্নচাপযুক্ত একটি শান্ত ও স্বচ্চ্ব কেন্দ্র থাকে। এ এলাকাটি স্বছ্ব (সম্ভবত ধূলা-বালিতে পূর্ণ), তুলনামূলকভাবে দুর্বল বাতাস থাকে এবং খুব অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, কারণ টর্নেডোর বাইরের অংশে ঘিরে থাকা ধূলাবালি ভেতরে আলো ঢুকতে বাধা দেয়। যারা টর্নেডোর অভ্যন্তরভাগ দেখেছে, তারা আলোর উৎস হিসেবে বজ্রপাতের কথা উল্লেখ করেছে।[২৫][২৬][২৭]

ঘূর্ণন [সম্পাদনা]

টর্নেডো সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় একই দিকে ঘুরে; অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (counterclockwise) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে (clockwise)। যদিও বৃহৎ আকৃতির ঝড়গুলো সবসময় কোরিওলিস শক্তির প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় ঘুরে, কিন্তু বজ্রঝড় এবং টর্নেডোগুলো এতই ক্ষুদ্র হয় যে কোরিওলিস শক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাব এগুলোতে খুব অল্প অনুভূত হয়, যা রসবি নাম্বার (Rossby number) দেখে বোঝা যায়। এমনকি সুপারসেল এবং টর্নেডোগুলো সিমুলেশনের সময়ও ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় ঘুরে যেখানে কোরিওলিস শক্তি উপেক্ষা করা হয়।[২৮][২৯] ছোট আকৃতির মেসোসাইক্লোন এবং টর্নেডোগুলোর ঘূর্ণনের জন্য মূলত সুপারসেলের মধ্যস্থ জটিল প্রক্রিয়া এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দায়ী।[৩০]

আনুমানিক ১% টর্নেডো প্রতিঘূর্ণিঝড় (anticyclonic) দিকে ঘূর্ণন করে। সাধারণত, শুধু জলস্তম্ভ (landspout) এবং দমকা টর্নেডো (gustnado) প্রতিঘূর্ণিঝড় দিকে ঘূর্ণন করে, এবং এছাড়া সাধারণত সেই সব টর্নেডো, যেগুলোর সৃষ্টি হয় সাইক্লোনিক সুপারসেলের মধ্যস্থ নিম্নগামী RFD-এর প্রতিঘূর্ণিঝড় অংশে।[৩১] তবে দুর্লভ কিছু ক্ষেত্রে প্রতিঘূর্ণিঝড় টর্নেডোগুলো সৃষ্টি হয় প্রতিঘূর্ণিঝড় দিকে ঘূর্ণনরত সুপারসেলের মেসোএন্টিসাইক্লোন থেকে, যেমন একইভাবে ঘূর্ণিঝড়ের দিকে ঘূর্ণনরত টর্নেডোগুলোর সৃষ্টি হয়, অথবা সহ-টর্নেডো হিসেবে হয় উপটর্নেডো (satellite tornado) বা সুপারসেলের মধ্যস্থ প্রতিঘূর্ণিঝড় ঘূর্ণির সাথে যুক্ত হয়ে।[৩২]

জীবন-চক্র [সম্পাদনা]

উপরের ছবিগুলোতে টর্নেডো সৃষ্টি হবার ক্রম দেখানো হচ্ছে। প্রথমে, ঘূর্ণনশীল মেঘদল নিম্নগামী হয়। এই নিম্নগামী মেঘমালা ক্রমশ একটি ফানেলে পরিণত হয়, যা আরো নীচে নামতে থাকে সেইসাথে এর মধ্যস্থ বাতাস নিকটবর্তী ভূপৃষ্ঠ থেকে ধূলাবালি, বর্জ্য ইত্যাদি উড়িয়ে নেয়। সবশেষে, দৃশ্যমান ফানেল ভূমি স্পর্শ করে, এবং টর্নেডো প্রচুর ক্ষতিসাধন করতে আরম্ভ করে। এই টর্নেডোর ছবিগুলো টেক্সাসের ডিমিট নামক এলাকা থেকে তোলা এবং ইতিহাসের ভয়ংকর টর্নেডোগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি চাক্ষুস উদাহরণ।

সুপারসেল (Supercell) সম্পৃক্ততা [সম্পাদনা]

টর্নেডো প্রায়শই সুপারসেল নামক এক শ্রেণীর বজ্রঝড় থেকে সৃষ্টি হয়। সুপারসেলে কয়েক মাইল ব্যপ্তির সংঘবদ্ধ একটি ঘূর্ণনশীল এলাকা থাকে যা মেসোসাইক্লোন নামে পরিচিত এবং সাধারণত এটা ১-৬ মাইল (২-১০ কিমি) ব্যাপ্তির হয়। তীব্র শক্তিশালী টর্নেডোগুলো (বর্ধিত ফুজিতা স্কেলে EF3 থেকে EF5 ক্যাটাগরির) সুপারসেল থেকে সৃষ্টি হয়। টর্নেডো ছাড়াও প্রচুর বৃষ্টি, ঘন ঘন বজ্রপাত, শক্তিশালী দমকা হাওয়া এবং শিলাঝড় এই সুপারসেল বজ্রঝড়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

সুপারসেল থেকে সৃষ্ট অধিকাংশ টর্নেডো একটি নির্দিষ্ট জীবন চক্র অনুসরণ করে।[১৫] এটা শুরু হয় যখন বর্ধিত বৃষ্টিপাত দ্রুত নিম্নগামী বায়ুর একটি এলাকা টেনে নিয়ে আসে যা রিয়ার ফ্ল্যাংক ডাউনড্রাফট (RFD) নামে পরিচিত। ভূমির নিকটবর্তী এলাকায় বায়ুর এই নিম্নগামীতা (downdraft) বৃদ্ধি পায় এবং সেই সাথে এটা সুপারসেলের মধ্যে থাকা ঘূর্ণনরত মেসোসাইক্লোনকেও ভূমির দিকে টেনে নিয়ে আসে।

সৃষ্টি [সম্পাদনা]

মেসোসাইক্লোন ভূমির নিকটবর্তী হতে থাকলে ঝড়ের মূল অংশ থেকে নীচের দিকে নেমে আসতে থাকা একটি ঘনীভূত ফানেল দৃশ্যমান হয় এবং প্রায়ই ঘূর্ণন মেঘের দেয়াল (Wall cloud) সৃষ্টি করে। ফানেল যখন নেমে আসে, নিম্নগামী বায়ুও (RFD) তখন ভূমি স্পর্শ করে এবং তা থেকে দমকা ঝড়ের সৃষ্টি হয় যা টর্নেডো থেকে বেশ কিছু দূরত্বে ক্ষতিসাধণ করতে পারে। সাধারণত, নিম্নগামী বায়ু বা RFD ভূমি স্পর্শ করার মিনিটখানেকের মধ্যে ফানেল মেঘটি টর্নেডোতে পরিণত হয়।

পূর্ণতা [সম্পাদনা]

প্রাথমিকভাবে, টর্নেডোতে শক্তি সঞ্চালনের জন্য যথেষ্ট উষ্ণ ও আর্দ্র প্রবাহের উৎস থাকে, পরিণত পর্যায়ে আসা পর্যন্ত তাই এটা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কয়েক মিনিট থেকে এর আয়ু ক্ষেত্রবিশেষে এক ঘণ্টার বেশী হতে পারে এবং এ সময়েই সাধারণত টর্নেডোগুলো সবচেয়ে বেশী ক্ষতিসাধন করে, এবং এর ব্যাপ্তি এক মাইল বা ১.৬ কিমির বেশী দুর্লভ ক্ষেত্রে দেখা যায়। ইতোমধ্যে, RFD যেটি এখন ঠান্ডা পৃষ্ঠ বাতাসের এলাকায় পরিণত হয়েছে, তা টর্নেডোর চারপাশে ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলে এটিকে উষ্ণ প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় যা টর্নেডোতে শক্তি সরবরাহ করে আসছিল।

নিঃশেষ [সম্পাদনা]

মেসোসাইক্লোনকে পেছন দিক থেকে ঘিরে ধরা নিম্নগামী শুষ্ক বায়ু যা রিয়ার ফ্ল্যাংক ডাউনড্রাফট বা RFD নামে পরিচিত টর্নেডোকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এর বাতাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে ঘূর্ণিটি দুর্বল হতে আরম্ভ করে এবং সরু ও রজ্জু-সদৃশ দেখায়। এটাই হল নিঃশেষিত পর্যায়; যার স্থায়ীত্ব থাকে মাত্র কয়েক মিনিট এবং এর পরপরই টর্নেডো বিলীন হয়ে যায়। এই পর্যায়ে টর্নেডোর আকার মূল ঝড়ের বাতাস দ্বারা প্রচন্ড প্রভাবিত হয় এবং নানা চমৎকার আকৃতি নেয়।[২৩][২৪][৮]

টর্নেডো যখন নিঃশেষিত পর্যায়ে প্রবেশ করে, এর সাথে সংশ্লিষ্ট মেসোসাইক্লোনও দুর্বল হয়ে যায়, যেহেতু RFD এর শক্তিসরবরাহকারী প্রবাহকে বিচ্ছিন্ন করে। তীব্র শক্তিশালী সুপারসেলগুলো থেকে টর্নেডো তৈরি হতে পারে। মেসোসাইক্লোন এবং এর সাথে যুক্ত টর্নেডো যখন নিঃশেষ হয়ে আসে, ঝড়ের প্রবাহ তখন কেন্দ্রের কাছে নতুন আরেকটি এলাকা জুড়ে শুরু হয়। যদি নতুন কোন মেসোসাইক্লোন এ থেকে তৈরি হয়, তবে চক্রটি পুনরায় আরম্ভ হয় এবং একটি কিংবা আরো বেশী নতুন টর্নেডো সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো পুরনো মেসোসাইক্লোন এবং নতুন মেসোসাইক্লোন একই সাথে টর্নেডো সৃষ্টি করে।

অধিকাংশ টর্নেডোর জীবন-চক্রের ক্ষেত্রে যদিও এটা বহুল-স্বীকৃত তত্ত্ব, কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট টর্নেডো যেমন ভূমিস্তম্ভ বা ল্যান্ডস্পাউটের সৃষ্টি, দীর্ঘ-স্থায়ী টর্নেডো বা বহু-ঘূর্ণি সম্বলিত টর্নেডোগুলো সৃষ্টির কারণ এই তত্ত্ব ব্যাখা করতে পারে না। এগুলোর প্রত্যেকটিরই নিজস্ব এবং আলাদা সৃষ্টিকৌশল বা মেকানিজম রয়েছে। তবে, অধিকাংশ টর্নেডোই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বলা যায়।[৩৩]

তীব্রতা ও ধ্বংস-ক্ষমতা [সম্পাদনা]

EF1 মাত্রার ধ্বংসের একটি উদাহরণ। এখানে, বাড়ীর ছাদ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, এবং গ্যারেজের দরজা বাইরের দিকে বেঁকে গেছে, কিন্তু বাড়ীর দেয়াল এবং অন্যান্য কাঠামো অক্ষত রয়েছে।

ফুজিতা স্কেল এবং বর্ধিত ফুজিতা স্কেলের সাহায্যে টর্নেডোর ধ্বংস ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়। ১৯৭১ সালে জাপানী-আমেরিকান বিজ্ঞানী টেড ফুজিতা টর্নেডোর ধ্বংস-ক্ষমতা পরিমাপের জন্য ফুজিতা স্কেল উদ্ভাবন করেন। টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ সেন্টার এর উন্নততর সংস্করণ বর্ধিত ফুজিতা স্কেলের প্রস্তাব করে যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (National Weather Service) কর্তৃক ২ রা ফেব্রুয়ারী, ২০০৬ সালে গৃহীত হয় এবং ১লা ফেব্রুয়ারী, ২০০৭ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে।

একটি EF0 টর্নেডো ধারণা করা হয় যে শুধু গাছপালা ধ্বংস করবে, কোন বড় দালানকোঠা নয়।, অন্যদিকে একটি EF5 টর্নেডো ভিত্তি থেকে দালানকোঠা উপড়ে ফেলতে পারে, এমনকি বড় বড় বিল্ডিং বা স্কাইস্ক্রাপারেও আঘাত করে বিকৃত করে ফেলে। একইভাবে, টরো (TORRO) স্কেলে T0 নির্ধারণ করা হয়েছে অতি দুর্বল টর্নেডোর জন্য, এবং T11 বুঝায় সবচেয়ে শক্তিশালী টর্নেডো। রেডার ডেটা, ফটোগ্রামেট্রি, এবং ভূমিতে ঘূর্ণনের বিভিন্ন নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এগুলোর তীব্রতা নির্ধারণ করে এসব রেটিং প্রদান করা হয়।

টর্নেডোর তীব্রতা এর আকার, আকৃতি ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে না, যদিও শক্তিশালী টর্নেডোগুলো দুর্বল টর্নেডোগুলোর চেয়ে আকারে বড় হয়। এগুলোর পথের দৈর্ঘ্য এবং স্থায়িত্বও নানা রকম হয়, যদিও যেসব টর্নেডো বেশী দূরত্ব অতিক্রম করে, সেগুলো অপেক্ষাকৃত বেশী শক্তিশালী হয়।[৩৪] তীব্র শক্তিশালী টর্নেডোর ক্ষেত্রে, পথের একটি ক্ষুদ্র অংশেই এই তীব্রতা থাকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অতি তীব্রতা আসে বহু ঘূর্ণি টর্নেডো থেকে।[৮]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮০% টর্নেডো EF0 এবং EF1 (T0 থেকে T3) ক্যাটাগরির। স্কেলের যত উপরের দিকে যাওয়া যায় অর্থাৎ টর্নেডোর শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে উৎপন্ন হবার হারও কমে আসে; শক্তিশালী টর্নেডো অর্থাৎ EF4, T8 এর সংখ্যা ১%-এর চেয়েও কম। [৩৫]

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতে শক্তিশালী টর্নেডো সংঘটিত হতে দেখা যায়। এছাড়া ইউরোপ, এশিয়া,দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকাতেও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক টর্নেডো হয়। [৩৬]


এ পর্যন্ত সংঘটিত সবচাইতে প্রানহানিকর ১৫ টি টর্নেডো


০১. মানিকগঞ্জ – বাংলাদেশ – ১৯৮৯/০৪/২৬ – মৃত্য ১৩০০ – আহত ১২০০০।

০২. ঢাকা – বাংলাদেশ – ১৯৬৯ /০৪/১৪- মৃত্যু ৯২৩ – আহত সঠিক তথ্য নেই

০৩. মিসৌরি, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা – মার্কিন যুক্তরাস্ট্র – ১৯২৫/০৩/১৮ – মৃত্য ৬৯৫ – আহত ২০২৭

০৪. মানিকগঞ্জ এবং নবাবগঞ্জ – বাংলাদেশ – ১৯৭৩/০৪/১৭ – মৃত্যু ৬৮১

০৫. ভেলেটা – মাল্টা – ১৫৫১-০৯/২৩ – মৃত্য ৬০০ – আহত সঠিক তথ্য নেই

০৬. মাগুরা এবং নড়াইল – বাংলাদেশ – ১৯৬৪/০৪/১১- মৃত্য ৫০০থেকে ১৪০০ – আহত সঠিক তথ্য নেই

০৭. সিসিলি – ইটালি – ১৮৫১ /– / ১২ – মৃত্য ৫০০ – আহত সঠিক তথ্য নেই

০৮. মাদারীপুর – বাংলাদেশ -১৯৭৭/০৪/০১ – মৃত্য ৫০০ – আহত সঠিক তথ্য নেই

০৯. ইভানভো এবং ইয়োরোস্লাভ – রাশিয়া – ১৯৮৪/০৬/০৯ – মৃত্য ৪০০- আহত ২১৩

১০. মিসিসিপি – যুক্তরাষ্ট্র – ১৮৪০/০৫/০৬ – মৃত্য ৩১৭-আহত ১০৯

১১. পশ্চিম বঙ্গ – ভারত – ১৯৬৩/০৪/০৯ – মৃত্য ৩০০ – আহত সঠিক তথ্য নেই

১২. বরিশাল – বাংলাদেশ – ১৯৭২/০৪/২৯ – মৃত্য ৩০০ – আহত সঠিক তথ্য নেই

১৩. কুমিল্লা – বাংলাদেশ – ১৯৬৯/০৪/১৪ – মৃত্যু ২৬৩ – আহত সঠিক তথ্য নেই

১৪. মিসৌরী – যুক্তরাষ্ট্র – ১৮৯৬/০৫/০৭ – মৃত্য ২৫৫ – আহত ১০০০

১৫.উড়িষ্যা এবং পশ্চিম বঙ্গ – ভারত – ১৯৯৮/০৩/২৪ – মৃত্য ২৫০ – আহত সঠিক তথ্য নেই

তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]

  1. "Doppler On Wheels"Center for Severe Weather Research। 2006। সংগৃহীত 2006-12-29 
  2. ২.০ ২.১ "Hallam Nebraska Tornado"। Omaha/Valley, NE Weather Forecast Office। 2005-10-02। সংগৃহীত 2006-09-08 
  3. ৩.০ ৩.১ ৩.২ ৩.৩ ৩.৪ Edwards, Roger (2006-04-04)। "The Online Tornado FAQ"Storm Prediction Center। সংগৃহীত 2006-09-08 
  4. ৪.০ ৪.১ Perkins, Sid (2002-05-11)। "Tornado Alley, USA"Science News। পৃ: 296–298। সংগৃহীত 2006-09-20 
  5. Encyclopædia Britannica"Tornado: Global occurrence"। সংগৃহীত 2007-03-21 
  6. ৬.০ ৬.১ "Glossary of Meteorology, Second Edition"American Meteorological Society। 2000। সংগৃহীত 2006-11-17 
  7. Branick, Michael (2006)। "A Comprehensive Glossary of Weather Terms for Storm Spotters"। NOAA। সংগৃহীত 2007-02-27 
  8. ৮.০ ৮.১ ৮.২ ৮.৩ ৮.৪ ৮.৫ Grazulis, Thomas P (1993 July). Significant Tornadoes 1680–1991. St. Johnsbury, VT: The Tornado Project of Environmental Films. আইএসবিএন 1-879362-03-1.
  9. Russell S. Schneider; Harold E. Brooks, and Joseph T. Schaefer (2004)। "Tornado Outbreak Day Sequences: Historic Events and Climatology (1875–2003)" (PDF)। সংগৃহীত 2007-03-20 
  10. Harper, Douglas (November 2001)। "Online Etymology Dictionary"। সংগৃহীত 2006-09-20 
  11. Merriam Webster's Collegiate Dictionary (10th Edition ed.). Springfield, MA: Merriam-Webster, Incorporated. 1993. আইএসবিএন 0-87779-709-9. http://www.m-w.com.
  12. ১২.০ ১২.১ "The Tornado Project's Terrific, Timeless and Sometimes Trivial Truths about Those Terrifying Twirling Twisters!"। The Tornado Project। 1999। সংগৃহীত 2007-03-21 
  13. ১৩.০ ১৩.১ Zittel, Dave (May 4 2000)। "Tornado Chase 2000"USA Today। সংগৃহীত 2007-05-19 
  14. Golden, Joseph। "Waterspouts are tornadoes over water"USA Today। সংগৃহীত 2007-05-19 
  15. ১৫.০ ১৫.১ ১৫.২ Doswell, Moller, Anderson et al. (2005)। "Advanced Spotters' Field Guide" (PDF)। US Department of Commerce। সংগৃহীত 2006-09-20 
  16. "Gustnado"Glossary of MeteorologyAmerican Meteorological Society। সংগৃহীত 2006-09-20 
  17. ১৭.০ ১৭.১ ১৭.২ ১৭.৩ ১৭.৪ Lyons, Walter A (1997). "Tornadoes". The Handy Weather Answer Book (2nd Edition ed.). Detroit, Michigan: Visible Ink press. পৃ: pgs. 175–200. আইএসবিএন 0-7876-1034-8.
  18. Charles H. Jones; Charlie A. Liles (1999)। "Severe Weather Climatology for New Mexico"। সংগৃহীত 2006-09-29 
  19. Schumacher, Phil (2005)। "FAQ's of Summer Weather"। National Weather Service, Sioux Falls, South Dakota। সংগৃহীত 2007-02-28 
  20. Edwards, Roger। "Wedge Tornado"। National Weather Service Storm Prediction Center। সংগৃহীত 2007-02-28 
  21. Edwards, Roger। "Rope Tornado"। National Weather Service Storm Prediction Center। সংগৃহীত 2007-02-28 
  22. Doswell, Dr. Charles A, III। "The Tri-State Tornado of 18 March 1925 Reanalysis Project" (Powerpoint Presentation)। সংগৃহীত 2007-04-07 
  23. ২৩.০ ২৩.১ Edwards, Roger। "Public Domain Tornado Images"National Severe Storms Laboratory। সংগৃহীত 2006-10-20 
  24. ২৪.০ ২৪.১ Lloyd, Linda Mercer. Target: Tornado. [Videotape]. Atlanta, Georgia: The Weather Channel Enterprises, Inc..
  25. R. Monastersky (1999-05-15)। "Oklahoma Tornado Sets Wind Record"Science News। পৃ: 308–309। সংগৃহীত 2006-10-20 
  26. Justice, Alonzo A (May 1930)। "Seeing the Inside of a Tornado" (PDF)। Monthly Weather ReviewAmerican Meteorological Society। পৃ: 205–206। সংগৃহীত 2006-10-20 
  27. Hall, Roy S. (2003). "Inside a Texas Tornado". Tornadoes. Farmington Hills, MI: Greenhaven Press. পৃ: 59–65. আইএসবিএন 0-7377-1473-5.
  28. Davies-Jones, Robert (October 1984)। "Streamwise Vorticity: The Origin of Updraft Rotation in Supercell Storms"Journal of the Atmospheric Sciences (American Meteorological Society) 41 (20): 2991–3006http://ams.allenpress.com/perlserv/?request=get-abstract&doi=10.1175%2F1520-0469(1984)041%3C2991%3ASVTOOU%3E2.0.CO%3B2। সংগৃহীত 2007-04-13
  29. Rotunno, Richard; Joseph Klemp (February 1985)। "On the Rotation and Propagation of Simulated Supercell Thunderstorms"Journal of the Atmospheric Sciences (American Meteorological Society) 42 (3): 271–292http://ams.allenpress.com/perlserv/?request=get-abstract&doi=10.1175%2F1520-0469(1985)042%3C0271%3AOTRAPO%3E2.0.CO%3B2। সংগৃহীত 2007-04-13
  30. Wicker, Louis J.; Robert B. Wilhelmson (August 1995)। "Simulation and Analysis of Tornado Development and Decay within a Three-Dimensional Supercell Thunderstorm"Journal of the Atmospheric Sciences (American Meteorological Society) 52 (15): 2675–2703http://ams.allenpress.com/perlserv/?request=get-abstract&doi=10.1175%2F1520-0469(1995)052%3C2675%3ASAAOTD%3E2.0.CO%3B2। সংগৃহীত 2007-04-13
  31. Forbes, Greg। "weather.com - Blog: The Weather Channel on weather news, hurricanes, tornadoes & meteorology"। সংগৃহীত 2006-12-30 
  32. Monteverdi, John (2003-01-25)। "Sunnyvale and Los Altos, CA Tornadoes May 4, 1998"। সংগৃহীত 2006-10-20 
  33. Markowski, Straka, and Rasmussen (2002-10-14)। "Tornadogenesis Resulting from the Transport of Circulation by a Downdraft: Idealized Numerical Simulations"Journal of the Atmospheric Sciences: Vol. 60, No. 6। পৃ: 28। সংগৃহীত 2006-09-13 
  34. Brooks, Harold E. (2004-04-01)। "On the Relationship of Tornado Path Length and Width to Intensity"Weather and Forecasting: Vol. 19, No. 2। পৃ: 310–319। সংগৃহীত 2007-04-06 
  35. Edwards, Moller, Purpura et al (2005)। "Basic Spotters’ Field Guide" (PDF)। US Department of Commerce, National Weather Service। সংগৃহীত 2006-11-01 
  36. Dotzek, Nikolai, Jürgen Grieser, Harold E. Brooks (2003-03-01)। "Statistical modeling of tornado intensity distributions" (PDF)। Atmospheric Research: Vol. 67–68। পৃ: 163–187। সংগৃহীত 2007-04-06 

আরও পড়ুন [সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ [সম্পাদনা]

সাধারণ পাঠ্য
গবেষণামূলক
টর্নেডো-বিষয়ক সতর্কতামূলক