গোলাম আযম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
গোলাম আজম
গোলাম আযম তার নিজের অফিসে (২০০৯)
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা
কার্যালয়ে
১৯৬৯ – ২০০০
পূর্বসূরী মাওলানা আবদুর রহমান
উত্তরসূরী মতিউর রহমান নিজামী
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম (১৯২২-১১-০৭)৭ নভেম্বর ১৯২২
ঢাকা, বাঙলা, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যু অক্টোবর ২৩, ২০১৪(২০১৪-১০-২৩) (৯১ বছর)
রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
দাম্পত্য সঙ্গী আফিফা আজম
সম্পর্ক স্ত্রী
সন্তান
অধ্যয়নকৃত শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জীবিকা রাজনীতিবিদ
ধর্ম ইসলাম
ওয়েবসাইট http://ghulamazam.info/

গোলাম আযম (নভেম্বর ৭, ১৯২২ - অক্টোবর ২৩, ২০১৪[১]) বাংলাদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত ইসলামী রাজনীতিবীদ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দন্ডপ্রাপ্ত একজন যুদ্ধাপরাধী।[২][৩] তিনি ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর আমির ছিলেন।[৪] আযম ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিলেন।[৫][৬]

জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে তিনি বিতর্কিত শান্তি বাস্তবায়ন বা শান্তি কমিটির একজন ছিলেন, যে কমিটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতা বিরোধী অন্যান্য পাকিস্তানি বাঙ্গালি নেতাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল।[৭] এছাড়াও তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহয়তার জন্য গঠিত আধাসামরিক বাহিনী আলবদররাজাকার গঠনেরও অভিযোগ রয়েছে।[৮] এই মিলিশিয়ারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা মুক্তি বাহিনীর বিপ্লবীদের বিরোধিতা করেছিল এবং এরাও যুদ্ধাপরাধের অভিযুগে অভিযুক্ত।[৭][৯][১০][১১] যাইহোক, তার আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালে তিনি একজন অসামরিক সাধারন নাগরিক ছিলেন বলে তার পক্ষে সেনাবাহিনী পরিচালনা বা কোন ধরনের সামরিক বহিনীর কমান্ডার হওয়ার সুযোগ ছিল না।[১২] স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে লিপ্ত থাকার জন্য বাংলাদেশ সরকার আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল।[১৩] ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কোন প্রকার অনুমতি ব্যাতীত বা ভিসাবিহীন অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করেন।[১৪][১৫]

তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, মানবাধীকারকর্মী ও লেখিকা সুলতানা কামাল বলেন, “নিষ্ঠুরতার দিক দিয়ে গোলাম আযম ছিলেন জার্মানির সাবেক শাষক হিটলারের সমকক্ষ যিনি গণহত্যা কার্যকর ও জাতিগত নির্মূলে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিলেন।”[১৬] এই কথার জবাবে আযমের আইনজীবীরা বলেন, “এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক ও বানোয়াট। হিটলারের পক্ষে এটা করা সম্ভব ছিল কারণ তার কাছে রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিল কিন্তু গোলাম আযমের কোন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল না। ১৯৭১ সালে জেনারেল টিক্কা খানইয়াহিয়া খানের কাছে রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিল।”[১৭]

জানুয়ারি ১১, ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার করে।[১৮][১৯] মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১২ সালের ১১ই জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গোলাম আযমের পক্ষে করা জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন। আদেশে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামিনের কোনো বিধান নেই। এ ছাড়া মামলার এ পর্যায়ে জামিন দেওয়া সম্ভব নয়।[২০][২১][২২][২৩][২৪] ১৫ই জুলাই, ২০১৩ সালে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে ৫ টি অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তাকে ৯০ বছরের কারাদন্ডাদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। [২৫][২৬][২৭][২৮]

জীবনী

নেপথ্য

গোলাম আযম ৭ নভেম্বর, ১৯২২ (বাংলা ১৩২৯ সালের ৫ই অগ্রহায়ন) সালে ঢাকায় (লক্ষ্মীবাজারস্থ শাহ সাহেব বাড়িতে তাঁর মাতুলালয়ে) জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম গোলাম কবির ও মায়ের নাম সৈয়দা আশরাফুন্নিসা। তিনি তার গ্রাম বিরগাও-এর (কুমিল্লা) একটি মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা ও ঢাকা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের উপর বিএ ও ১৯৫০ সালে এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন।[২৯]

কর্মজীবন

জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান

১৯৫৪ সালে আযম সাঈদ আল মওদুদীর ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হন। ১৯৫৪ সালের ২২ এপ্রিল তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন ও তাবলিগ-ই-জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে জামায়াতে ইসলামীতে সহযোগী (মুত্তাফিক) হিসেবে যোগদান করার পর ১৯৫৫ সালে গ্রেফতার হয়ে রংপুর কারাগারে অবস্থানকালেই জামায়াতের রুকন হন। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তিনি রাজশাহী বিভাগীয় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এর এক বছর পর তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং রাজশাহী বিভাগীয় আমীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্রমেই দলে তার পদমর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে ও ১৯৫৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর সাধারন সম্পাদাক পদ গ্রহন করেন। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খান মৌলবাদী ধর্মীয় কাজকর্মের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ও আযম গ্রেফতার হন। তাকে আট মাস আটক করে রাখা হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর (সভাপতি) পদে অধিষ্ঠিত হন এবং এই পদটি তাকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে হয়েছিল। তিনি ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক জোট গঠনের অন্যতম অংশগ্রহনকারী।[২৯] দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।[৩০] গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীর তাত্ত্বিক নেতা বা গুরু হিসেবেও পরিচিত।[৩১]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ

১৯৭০-এর নির্বাচন

পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর (পাকিস্তান গাণতান্ত্রিক দল, জাতীয় আওয়ামী দল, জামায়াত উলমা-ই-ইসলাম ও পাকিস্তান জাতীয় লীগসহ) সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ১৯৭০-এর সাধারন নির্বাচনে গোলাম আযম আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনের জন্য প্রস্ততি নিতে শুরু করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে পাবলিক মিটিং-এ ভাঙ্গচুর, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর শারীরিক আক্রমণ ও পার্টি অফিসের লুটপাট ও ধ্বংসের জন্য অভিযুক্ত করা হয়।[৩২] ১৯৭০ সালে আযম যখন জামায়াতের প্রধান তখন জামায়াতে ইসলামীর র‌্যালিসহ, কিছু রাজনৈতিক র‌্যালি সশস্ত্র গোন্ডাদের হামলার শিকার হয় এবং অভিযোগ করা হয় এই হামলার উসকানী দিয়েছে আওয়ামী লীগ।[৩৩][৩৪]

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভূমিকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম আযম রাজনৈতিক অবস্থান নেন ও পাকিস্তান বিভক্তির বিরোধীতা করেন[৩৫] এবং বারবার আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনীকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করতে থাকেন।[৩৬] পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয় এবং ২৬ মার্চ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। আযমের বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ২৫ মার্চের পর থেকে জামায়াতের মুখপত্র বলে পরিচিত দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হত। ২৫ শে মার্চ রাতে সংঘটিত অপারেশন সার্চলাইট এর ছয় দিন পর গোলাম আযম ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে একটি ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি ভারতের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, "ভারত সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী প্রেরণ করে কার্যত পূর্ব পাকিস্তানীদের দেশপ্রেমকে চ্যালেঞ্জ করেছে।...আমি বিশ্বাস করি যে, এই অনুপ্রবেশকারীরা পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমানদের নিকট হতে কোন প্রকার সাহায্য পাবে না।"[৩৭][৩৮] ২০ জুন, ১৯৭১ সালে করা একটি মন্তব্যে গোলাম আযম পাকিস্তানের প্রতি তার সমর্থন পুনরাব্যাক্ত করেন। মন্তব্যটি ছিল, “পাকিস্তনি বাহিনী পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় সকল সন্ত্রাসীদের হটিয়ে দিয়েছে।”[৩৬]

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১১ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে গঠিত শান্তি কমিটিতে আযম গূরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ও তিনি এই আন্দলনকে ভারতের ষরযন্ত্র বলে উল্লেখ করেন।[৭][৩৯] আরো মনে করা হয়, আযম এই সংস্থার একজন প্রাতিষ্ঠাতা সদস্য।[৭] গোলম আযমের জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও বিহারিদের দ্বারা শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছিল।[৪০] এই শান্তি কমিটির সদস্যরা পাকিস্তনি সেনাবাহিনীকে প্রত্যক্ষভাবে সহয়তা করত। তারা স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম যেমন হিন্দুদের সম্পদ ও জমি দখল করে সেগুলো পূণঃবিতরন করত। বিশেষ করে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা শান্তি কমিটির হয়রানির শিকার হয়েছে বেশি। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।[৮] শান্তি কমিটির সদস্যরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে রাজাকার সদস্য সংগ্রহ করত। রাজাকারের জন্য প্রথমিকভাবে আযমের জামায়াতে ইসলামী থেকে ৯৫ জন সদস্যকে সংগ্রহ করা হয় যাদেরকে খুলনার শাহজাহান আলী সড়কের আনসার ক্যাম্পে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়।[৪১][৪২] এছাড়া যুদ্ধের সময় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রধান আশরাফ হোসাইন জামালপুর জেলায় ২২ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে মিলিশিয়া বাহিনী আলবদর গঠন করেন।[৪৩] ১২ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে আযম ও মতিউর রহমান নিজামী এই স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভারতের ষরযন্ত্র বলে উল্লেখ করে একটি বিক্ষোভের ডাক দেন ও তাতে নেতৃত্ব দেন।[৪৪]

মুক্তিযুদ্ধের সময় আযম প্রায়ই পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণ করতে, পাকিস্তানের নেতাদের সাথে যুদ্ধ সম্পর্কীত আলোচনা করতে।[৪৫] ৩০শে জুন লাহোরে সাংবাদিকদের কাছে গোলাম আযম বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের দুস্কৃতিকারী বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন যে তার দল এদের দমনে সর্বাত্ত্বক চেষ্ঠা করছে এবং এ কারণেই দুস্কৃতকারীদের হাতে বহু জামায়াত কর্মী নিহত হয়েছে।[৪৬] আযম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল টিক্কা খানসহ অন্যান্য সেনা অফিসারদের সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায় তার বিশদ আলোচনা করেন।[৪৫]

১২ আগস্ট, ১৯৭১ সালে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি বক্তব্যে বলেন, “তথাকথিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীরা ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু।”[৪৭] তিনি ভারতের বিরুদ্ধে আন্দোলনেরও ডাক দেন।[৪৮] গোলাম আযমকে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবেও অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুগে বলা হয় সেপ্টেম্বরের প্রতম দিকে তিনি রাও ফরমান আলীর সাথে এক গোপন বৈঠক করে এই হত্যাকান্ডের নীলনকশা তৈরি করেন।[৪৯] উল্লেখ্য ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রামে গোলাম আযমের পশ্চিম পাকিস্তান সফরকালের একটি সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ দুই কিস্তিতে ছাপা হয়। এই সাক্ষাৎকারে তিনি মুক্তিবাহিনীর সাথে তার দলের সদস্যদের সংঘর্ষের বিভিন্ন বিবরণ ও পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থতির ওপর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন,

"বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জামায়াতকে মনে করতো পহেলা নম্বরের দুশমন। তারা তালিকা তৈরি করেছে এবং জামায়াতের লোকদের বেছে বেছে হত্যা করছে, তাদের বাড়িঘর লুট করছে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। এতদসত্বেও জামায়াত কর্মীরা রাজাকারে ভর্তি হয়ে দেশের প্রতিরক্ষায় বাধ্য। কেননা তারা জানে 'বাংলাদেশ' ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কোন স্থান হতে পারে না। জামায়াত কর্মীরা শহীদ হতে পারে কিন্তু পরিবর্তিত হতে পারে না।" (দৈনিক সংগ্রাম, ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১)

[৫০][৫১]

অভিযোগ

২০ জুন, ১৯৭১ সালে আযম লাহোরে ঘোষণা করেন শেখ মুজিবুর রাহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা স্বাধীনতার আন্দোলন করছে।[৫২] ১২ আগস্ট, ১৯৭১ সালে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি বার্তায় গোলাম আযম বলেন, তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলনের কর্মীরা ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু।[৫৩] আযম তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং অভিযোগগুলো প্রমান করার জন্য তথ্য-উপাত্ত বা প্রমান হাজির করতে বলেন।[৫৪] পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী থাকার কথা স্বীকার করেন কিন্তু তার বিরুদ্ধে আনীত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেন।[৩৯]

সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান তাদের শাষণকে বৈধ করার জন্য একটি নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। ১২ই অক্টোবর, ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন ২৫ নভেম্বর থেকে ৯ ডিসেম্বর-এর মধ্যে একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। গোলাম আযম এই নির্বাচনে আংশগ্রহনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৫ই আক্টোবর পাকিস্তনি সরকার হঠাৎ করেই ঘোষণা করে নির্বাচনের জন্য কোনপ্রকার প্রতিদ্বন্দিতা ছাড়াই ১৫ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে। ২ নভেম্বর-এর ঘোষণা অনুযায়ী ৫৩ জন প্রার্থী নির্বাচনের জন্য কোন প্রকার প্রতিদ্বন্দিতা ছাড়াই যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।[৫৫] এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে জামায়াত ১৪টি আসনে নির্বাচিত হয়।[৫৬] মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, “আযম ছিলেন জার্মানির সাবেক শাষক হিটলারের সমকক্ষ যিনি নিষ্ঠোরতা ও গনহত্যায় নিয়োজিত ছিলেন।”[১৬] এর জবাবে প্রসিকিউটর যায়েদ-আল-মালুম বলেন, “তিনি এমন একজন ব্যাক্তি ছিলেন যার সকল ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল, তাহলে কেন তার একটি কমিটির প্রয়োজন হবে? হিটলারের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একমাত্র হিটলারই যথেষ্ঠ ছিল।[৫৭] যাইহোক নিউইয়র্ক টাইমস ১৯৯২ সালে এক প্রতিবেদনে দাবি করে, গোলাম আযম বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার বিরোধীতার জন্য ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে।[৫৮]

১৯৭১-এর পর বাংলাদেশ বিরোধী তদবির

পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতীয় যৌথ বাহিনী ও মুক্তি বাহিনী জয় লাভ করে ও ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে একটি নতুন জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের জন্ম হয়। গোলাম আযম ১৯৭১ সালের পরও তার তিনি বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকেন। তিনি মধ্য-প্রাচ্য ও পাকিস্তানের অনেক নেতাকে এই নতুন জন্ম নেওয়া জাতিকে স্বীকৃতি না দিতে তদবির করেন। তার এই তদবির সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ঢাকা বিশ্বব্যিালয়ের অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের লেখায় পাওয়া যায়।[১৪] অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গোলাম আযমের বিরোদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ ১৯৯২ সালে গঠিত গণআদালতে উপস্থাপন করেন। এই গণআদালত জাহানারা ইমাম ও অন্যান্যদের দ্বারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত হয়েছিল। জাহানারা ইমাম এই অভিনব গণআদালতে গোলাম আযমের বিচারের দাবি তুলেছিলেন এবং হাজার হাজার জনতা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছিল।[৫৯]

দৈনিক প্রথম আলো অনুসারে, তিনজন বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা গোলাম আযমের বিরোদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। বাঙ্গালি সাংস্কৃতির বিরোদ্ধে গোলাম আযমের কর্মকান্ডের অভিযোগ উত্থাপন করেন সাইদ শামসুল হক, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করেন বোরহান্নুদ্দিন খান জাহাঙ্গির ও মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকান্ড সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।[১৪] আনিসুজ্জামানের উপত্থাপিত অভিযোগের কিছু বিশেষ অংশ হল,[১৪]

  • ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলে গোলাম আযম পাকিস্তানে বসে মাহমুদ আলী ও খাজা খয়েরউদ্দীনেরমত দেশদ্রোহীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি নামে একটি সংগঠনের সূচনা করেন এবং বিভিন্ন দেশে পূর্ব পাকিস্তান পূণঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলার আয়োজন করতে থাকেন। তিনি এই উদ্দেশ্যে দীর্ঘকাল পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর বলে পরিচয় দিতেন।
  • ১৯৭২ সালে গোলাম আযম লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করেন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে আবার এই ভূখন্ডকে পাকিস্তানের অংশে পরিনত করার ষড়যন্ত্র করেন। ১৯৭৩-এ ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন অফ স্টুডেন্টস ইসলামিক সোসাইটিজের বার্ষিক সম্মেলনে এবং লেসটারে অনুষ্ঠিত ইউকে ইসলামিক কমিশনের বার্ষিক সভায় তিনি বাংলাদেশ বিরোধী বক্তৃতা দেন। ১৯৭৪-এ মাহমুদ আলীসহ কয়েকজন পাকিস্তানিকে নিয়ে তিনি পূর্ব লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির একটি বৈঠক করেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিনত করার প্রচেষ্ঠা ব্যার্থ হয়েছে দেখে এই সভায় স্থির করা হয় যে, তারা এখন থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিয়ে একটি কনফেডারেশন গঠনের আন্দোলন করবেন। এই সভায় গোলাম আযম ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাংলাদেশে ফিরে অভন্ত্যর থেকে কাজ চালানোর প্রয়োজনীয়তা ব্যাক্ত করেন। ১৯৭৭-এ লন্ডনের হোলি ট্রিনিটি চার্চ কলেজে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তিনি এ কথারই পুনরাবৃত্তি করেন এবং সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও বাংলাদেশি ভিসা নিয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে আগমন করেন।
  • ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে গোলাম আযম রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি যুব সম্মেলনে যোগদান করেন ও পূর্ব পাকিস্তান পূণঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সকল মুসলিম রাষ্ট্রের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি সাতবার সৌদি বাদশার সঙ্গে সাক্ষাত করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে অনুরোধ করেন। ১৯৭৪ সালে রাবেতায়ে আলমে ইসলামির উদ্যোগে মক্কায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এবং ১৯৭৭ সালে কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বাংলাদেশের বিরোদ্ধে বক্তৃতা করেন।
  • অনুরূপভাবে গোলাম আযম ১৯৭৩ সালে বেনগাজিতে অনুষ্ঠিত ইসলামি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য লবিং করেন। একই বছরে ত্রিপলিতে অনুষ্ঠিত ইসলামি যুব সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে হানিকর বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
  • ১৯৭৩ সালে গোলাম আযম মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন অফ আমেরিকা এন্ড কানাডার বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে পরিনত করতে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান।
  • ১৯৭৭ সালে গোলাম আযম ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইসলামিক ফেডারেশন অফ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশবিরোধী বক্তৃতা করেন।[১৪]

বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন

১৯৭৮ সালে গোলাম আযম পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও বাংলাদেশের সল্পমেয়াদী ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। কিন্তু তিনি ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে কোন প্রকার বৈধ ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থান করেন এবং তার জন্মসূত্রে এদেশে থাকার অধিকার রয়েছে এই অধিকারবলে দেশত্যাগে অস্বীকৃতি জানান।[১৪][১৫] ২০০০ সালের পর গোলাম আযম সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তার উত্তরসূরী হলেন মতিউর রহমান নিজামী[৪]

গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ

১১ জানুয়ারি, ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল কর্তৃক গোলাম আযম ১৯৭১ সালে মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের মামলায় গ্রেফতার হন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল তার জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন ও তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। যাইহোক তিন ঘন্টা পর তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে বার্ধক্য জনিত কারনে মেডিকেল চেক-আপে পাঠানো হয়। ডেইলি স্টার অনুসারে, ১৫ জানুয়ারি একটি মেডিকেল টিম দ্বারা আযম বিচারের জন্য উপযোক্ত বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি হাসপাতালের কারাগার কক্ষে থাকার অনুমতি পান।[৬০][৬১] একই পত্রিকায় পরে বলা হয়, তার শারিরীক অসুস্থতার জন্য তাকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়।[৬২]

কারারুদ্ধ করার পর থেকে আযমের স্বাস্থ্য অতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে।[৬৩] তার স্ত্রী সয়ৈদা আফিফা আযম কয়েকটি সংবাদপত্রে তার স্বামীর চিকিৎসার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন, তিনি বলেন, আযম ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পরছে এবং অপুষ্টিজনিত কারনে এক মাসে ৩ কিলোগ্রাম ওজন হারিয়েছে।[৩৬] তিনি আযমের চিকিৎসাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে অভিযোগ করেন যদিও তাকে হাসপাতালের কারাগার কক্ষে রাখা হয়েছে।[৬৪][৬৫] আযমের স্ত্রী আরো অভিযোগ করেন তার সাথে পরিবারের লোকদের সাক্ষাত ও বই সরবরাহ করার অনুমতি দেওয়া হয় না। এটাকে তিনি এক প্রকার মানসিক নির্যাতন বলে উল্লেখ করেন।[৬৬] ডেইলি স্টার প্রতিবেদনে বলে, আযমের স্ত্রী ও আইনজীবীদের তার সাথে ১৮ ফেব্রুয়ারি সাক্ষাত করার অনুমতি দেওয়া হয় কিন্তু তার ভাতিজাকে কারাগার কক্ষে প্রবেশের ঠিক পূর্ব-মহুর্তে বাধা দেওয়া হয়।[৬৭][৬৮]

বিভিন্ন দেশের ইসলামিক কর্মীরা গোলাম আযকে গ্রেফতারের ঘটনা অমানবিক বলে উল্লেখ করেন ও এ ব্যাপারে মন্তব্য করেন। আন্তর্জাতিক মুসলিম স্কলারস ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউসুফ আল-কারাদাউই এই গ্রেফতারকে “মর্যাদাহানিকর” বলে উল্লেখ করেন ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাকে অতিশীঘ্রই মুক্তি দেওয়ার অহ্বান জানান। তিনি তার মন্তব্যে বলেন, “অধ্যাপক গোলাম আযম ও তার সহকারী পন্ডিতবৃন্দদের এবং ইসলামিক কর্মীদের বিরুদ্ধে আনীত ৪০ বছর পূর্বের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অযৌক্তিক ও গ্রহনযোগ্য নয়।”[৬৯]

গোলাম আযমের এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে অন্তজার্তিক কয়েকটি সংস্থা সমালোচনা করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে, জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল[৭০][৭১][৭২] যদিও গোলাম আযমের পূর্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল দুজনকে (দেলোয়ার হোসেন সাঈদীমুহাম্মদ কামারুজ্জামান) একই মামলায় মৃত্যুদন্ড ও অপরজনকে (আব্দুল কাদের মোল্লা) যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেছে।

রায়

১৫ জুলাই, ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদন্ড দেন।[২৮] গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ৫ ধরনের ৬১টি অভিযোগ আনা হয়। যার সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। ৬১টি অভিযোগের মধ্যে- মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মোট ৬টি, মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনার অভিযোগ ৩টি, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ ২৮টি, মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ২৩টি এবং হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে একটি।[২৭] প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগে ১০ বছর করে ২০ বছর, তৃতীয় অভিযোগে ২০ বছর, চতুর্থ অভিযোগে ২০ বছর, পঞ্চম অভিযোগে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, “তিনি (গোলাম আযম) যে অপরাধ করেছেন, তা মৃত্যুদণ্ডতুল্য। কিন্তু তাঁর বয়স বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।”[২৫][২৮]

মৃত্যু

গোলাম আযম ২৩ অক্টোবর, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যবরণ করেন। পরিবারের বর্ণনানুযায়ী তিনি রাত দশটার দিকে মৃত্যবরণ করেন। [৭৩] ২৫ অক্টোবর, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমে যোহরের নামাজের পর তাঁর জানাযার নামাজ আদায় করা হয়। তাঁর জানাযায় বহু লোকের সমাগম ঘটে। জানাযার ইমামতি করেন গোলাম আযমের সন্তান আবদুল্লাহিল আমান আযমী। এ সময় বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদে তাঁর জানাযার বিরোধিতা করে বেশকিছু সংগঠনের কর্মীরা পুলিশের বাধার মুখে বিক্ষোভ করার চেষ্টা করে। জানাযার পর পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁর মরদেহ মগবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় বিদ্রোহকারী সংগঠনের কিছু কর্মী লাশবাহী যানে জুতা নিক্ষেপের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে মগবাজারে গোলাম আযমের পারিবারিক কবরস্তানে তাকে সমাহিত করা হয়।[৭৪]

তথ্যসূত্র

  1. http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/352165
  2. "Azam found guilty of Bangladesh war crimes"। আলজাজিরা। সংগৃহীত ১৫ জুলাই ২০১৩ 
  3. "Bangladesh: Islamist leader found guilty of war crimes"। ইউরোনিউজ। সংগৃহীত ১৫ জুলাই ২০১৩ 
  4. ৪.০ ৪.১ Prof. Ghulam Azam Retires, Islamic Voice, December 2006.
  5. Uddin, Sufia M. (2006)। Constructing Bangladesh: Religion, Ethnicity, And Language in an Islamic Nation। University of North Carolina। পৃ: 169। আইএসবিএন 978-0807830215 
  6. H. Evans in 'The Post-colonial States of South Asia:Democracy, Development and Identity', edited by A. Shastri and A. Wilson, Palgrave, 2001, p. 71.
  7. ৭.০ ৭.১ ৭.২ ৭.৩ ঢাকায় নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত (Citizen's Peace Committee formed in Dhaka), Daily Pakistan, April 11, 1971.
  8. ৮.০ ৮.১ The Wall Street Journal, July 27, 1971; quoted in the book Muldhara 71 by Moidul Hasan
  9. "ভারতীয় চক্রান্ত বরদাস্ত করব না (We will never tolerate Indian conspiracy)"। The Daily Sangram। April 13, 1971। 
  10. Rubin, Barry A. (2010)। Guide to Islamist Movements। M.E. Sharpe। পৃ: 59। আইএসবিএন 978-0-7656-4138-0। সংগৃহীত 6 March 2013 
  11. Fair, C. Christine (16 June 2010)। Pakistan: Can the United States Secure an Insecure State?। Rand Corporation। পৃ: 21–22। আইএসবিএন 978-0-8330-4807-3। সংগৃহীত 6 March 2013 
  12. "Superior responsibility not applicable to Ghulam Azam: Defence counsel"। সংগৃহীত 21 April 2013 
  13. Ahsan, Syed Aziz-al (October 1990)। ",. ISLAMIZATION OF THE STATE IN A DUALISTIC CULTURE: THE CASE OF BANGLADESH"। PhD Thesis, McGill University, Dept of Political Science  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  14. ১৪.০ ১৪.১ ১৪.২ ১৪.৩ ১৪.৪ ১৪.৫ গোলাম আযমের বিরূদ্ধে ডঃ আনিসুজ্জামান উত্থাপিত অভিযোগপত্র (Allegations against Ghulam Azam submitted by Prof. Anisuzzaman); The Daily Prothom Alo - March 14, 2008
  15. ১৫.০ ১৫.১ Women and Islam in Bangladesh: Beyond Subjection and Tyranny by Taj I. Hashmi; Preview at Google books
  16. ১৬.০ ১৬.১ *"In brutality, Ghulam Azam is synonymous with German ruler Hitler who had influential role in implementation and execution of genocide and ethnic cleansing, said Sultana Kamal.""Ghulam Azam synonymous with Hitler: Sultana Kamal"UNB Connect। September 13, 2012। সংগৃহীত 14 March 2013 
  17. "13 Sep 2012: Azam 3rd witness cross exam day 3"। David Bergman। সংগৃহীত 2013-05-09 
  18. Ghulam Azam lands in jail, The Daily Star, January 12, 2012
  19. Ghulam faces 52 charges, The Daily Star, 13 December 2011
  20. "গোলাম আযমের জামিনের আবেদন খারিজ"প্রথম-আলো (ঢাকা)। ১৮-০৭-২০১২। সংগৃহীত 12 জুলাই 2013 
  21. Prof Azam transferred to ‘Prison Cell’ of BSMMU, BDINN, 26 November 2012.
  22. Ghulam faces 52 charges, The Daily Star, 13 December 2011
  23. Ghulam Azam is hospitalised after he loses bail appeal over war crimes, Corbis, 11 January 2012
  24. Ghulam Azam taken to hospital, Bdnews24.com, 19 July 2012
  25. ২৫.০ ২৫.১ "গোলাম আযম দোষী প্রমাণিত, ৯০ বছরের কারাদণ্ড"বিবিসি বাংলা। ১৫ জুলাই, ২০১৩। সংগৃহীত 15 জুলাই 2013 
  26. http://bdnews24.com/bangladesh/2013/07/15/90-years-for-jamaat-guru-ghulam-azam
  27. ২৭.০ ২৭.১ "গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদণ্ড"সময় টিভি (ঢাকা)। ১৫ জুলাই, ২০১৩। সংগৃহীত ১৫ জুলাই, ২০১৩ 
  28. ২৮.০ ২৮.১ ২৮.২ "গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড"দৈনিক প্রথম আলো (ঢাকা)। ১৫ জুলাই, ২০১৩। সংগৃহীত 15 জুলাই 2013 
  29. ২৯.০ ২৯.১ I. Hossain, N. Siddiquee, 'Islam in Bangladesh Politics: the role of Ghulam Azam of Jamaat-i-Islaami', Inter-Asia Cultural Studies, Vol 5, 2004, p. 385
  30. "Prof. Ghulam Azam Retires"Islamic Voice। December 2000। 
  31. "গোলাম আযমের রায় যেকোনো দিন"বিবিসি। বুধবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৩। সংগৃহীত 12 জুলাই 2013 
  32. 'White Paper on The Crisis in East Pakistan', Government of Pakistan, Islamadab, August 5, 1971
  33. Idem, pg. 6-8
  34. 'Police accused over rioting',The Guardian, January 26, 1970, pg. 4
  35. Salik, Siddiq (1977)। "Politico-Military"। Witness to Surrender (First সংস্করণ)। Dhaka, Bangladesh: The University Press Limited। পৃ: 93। আইএসবিএন 984 05 1373 7 
  36. ৩৬.০ ৩৬.১ ৩৬.২ Ghulam Azams speeches in 1971, The daily Prothom Alo, 11 January 2012
  37. দৈনিক সংগ্রাম, ৭ এপ্রিল ১৯৭১।
  38. http://archive.prothom-alo.com/detail/news/215745
  39. ৩৯.০ ৩৯.১ "Ghulam Azam was on Peace Committee"The Daily Star (Bangladesh)। March 12, 2013। সংগৃহীত March 13, 2013 
  40. Kann, Peter R. (July 27, 1971)। "East Pakistan Is Seen Gaining Independence, But It Will Take Years"। Wall Street Journal 
  41. Daily Pakistan। May 25, 1971। 
  42. Daily Azad। May 26, 1971। 
  43. Daily Purbodesh। April 23, 1971। 
  44. "পাকিস্তানের প্রতি চীনের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে (China fully supports Pakistan)"। The Daily Sangram। April 13, 1971। 
  45. ৪৫.০ ৪৫.১ "History speaks up - Julfikar Ali Manik and Emran Hossain"। The Daily Star। October 27, 2007। 
  46. "লাহোরে সাংবাদিক সম্মেলনে অধ্যাপক গোলাম আযম (Prof. Ghulam Azam in a conference at Lahore)"। Daily Sangram। June 21, 1971। 
  47. "মাওলানা মাদানীর শাহাদত মুসলমানদের সচেতন করার জন্য যথেষ্ট - গোলাম আযম"। Daily Sangram। August 12, 1971। 
  48. "Ghulam Azam calls for an all out war"। The Pakistan Observer। November 26, 1971। 
  49. "I Made No Mistake in 1971: Gholam Azam and the Jamaat Polilics"। Bichitra। 17।  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  50. "মাওলানা মাদানীর শাহাদত মুসলমানদের সচেতন করার জন্য যথেষ্ট - গোলাম আযম". The Daily Sangram. August 12, 1971.
  51. "Ghulam Azam calls for an all out war". The Pakistan Observer. November 26, 1971.
  52. লাহোরে সাংবাদিক সম্মেলনে অধ্যাপক গোলাম আযম (Prof. Ghulam Azam in a conference at Lahore), Daily Sangram, 21 June 1971.
  53. মাওলানা মাদানীর শাহাদত মুসলমানদের সচেতন করার জন্য যথেষ্ট - গোলাম আযম, Daily Sangram, August 12, 1971.
  54. Azam ATN Bangla Interview, 14th Dec 2011, with Eng Subs Part 2, See video at 2:15 and 3:42.
  55. Muldhara '71 (মূলধারা '৭১ Mainstream '71) by Moidul Hasan, page. 128, footnote. 177. published by University Press Limited
  56. International Herald Tribune; November 4, 1971
    • "Jamaat-e-Islami guru Ghulam Azam's role during the Liberation War ‘was quite like Adolf Hitler in Second World War Germany’.""Azam was like Hitler in Germany"Bdnews24.com। March 3, 2013। * "Next on the list is Ghulam Azam, the head of Jamaat in 1971, accused of overseeing the setting up of pro-Pakistani death squads manned by the party’s student wing. The prosecution is seeking the death penalty for Mr Azam, whom it likened, in its closing arguments this week, to Adolf Hitler.""Unrest in Bangladesh: A nation divided"The Economist। 9 March 2013। সংগৃহীত 14 March 2013 
    • "War crimes prosecutors on Sunday said that in 1971 Ghulam Azam did in Bangladesh what Adolf Hitler did in Germany during the Second World War. 'Ghulam Azam was the Hitler in Bangladesh under Pakistan army occupation in 1971', said prosecutor Zead-Al-Malum. "Staff Correspondent। "Ghulam Azam was Hitler of 1971: prosecution"New Age (Bangladesh)। সংগৃহীত 14 March 2013 
  57. "3 Die in Bangladesh Fundamentalists' Strike", New York Times, June 21, 1992.
  58. "Focus back on, 8yrs after"। The Daily Star। May 12, 2009। 
  59. Hospital stay not needed, The Daily Star, 15 January 2012.
  60. Ghulam Azam lands in jail, bdnews24.com, 11 January 2012.
  61. Counsels and Family Meet with Ghulam Azam, 18 February 2012.
  62. Ghulam Azam's counsels prefer ICT-2, Bdnews24.com, 31 May 2012
  63. স্বামীর জীবন নিয়ে আমি শঙ্কিত : সৈয়দা আফিফা আযম (I am in fear of my husband's life: Syeda Afifa Azam), Daily Naya Diganta, 27 January 2012.
  64. অধ্যাপক গোলাম আযমের (Professor Ghulam Azam has lost 3 kg in weight), The Daily Sangram, 5 February 2012.
  65. গোলাম আযমকে ‘প্রিজন সেল'এ মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে -মিসেস আফিফা আযম (Ghulam Azam is being mentally tortured in his prison cell - Mrs Afifa Azam), The Daily Sangram, 12 February 2012. Azam is held in solitary confinement and is allowed a visit of 30 minutes per week by 3 close relatives only. Applications for visits are required to be made in advance and require approval.
  66. Counsels, family meet Ghulam Azam
  67. Wife, son meet Ghulam Azam
  68. الإتحاد يندد بإعتقال الحكومة البنغالية المفكرين الإسلاميين ويطالب بإطلاق سراحهم(The Union condemns the arrest of Professor Ghulam Azam and other thinkers by the Bangladeshi government), International Union of Muslim Scholars, 18 January 2012.
  69. ICT convicts A. Q. Molla of 5 charges and sentences him to life imprisonment The International Criminal Law Bureau (5 February 2013)
  70. Detention of accused unlawful The Daily Star (16 February 2012)
  71. Bangladesh: Government Backtracks on Rights Adams, Brad (1 February 2013) Bangladesh: Government Backtracks on Rights. Human Rights Watch.
  72. "গোলাম আযমের জানাজা শনিবার"। bbc.com.uk। সংগৃহীত 25 October 2014 
  73. আহরার হোসেন (25 October 2014)। "কড়া নিরাপত্তায় ঢাকায় গোলাম আযমের জানাজা"। bbc.com.uk। সংগৃহীত 25 October 2014 

আরো দেখুন

বহিঃসংযোগ

রাজনৈতিক দফতর
পূর্বসূরী
মওলানা আবদুর রহিম
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর
১৯৬৯–২০০০


উত্তরসূরী
মতিউর রহমান নিজামী