গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
Gabriel Garcia Marquez 1984.jpg
কলম্বিয়ার বাইয়েদুপার শহরে ভ্রমণকালে গার্সিয়া মার্কেস (১৯৮৪ সালে).
জীবিকা ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, এবং সাংবাদিক
জাতীয়তা কলম্বীয়
ধরণ জাদুবাস্তবতা
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার
(১৯৮২)


সাক্ষর

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস (স্পেনীয় ভাষায় তাঁর পূর্ণ নাম Gabriel José de la Concordia García Márquez গাব্রিয়েল্‌ খ়োসে দে লা কোঙ্কোর্দিয়া গার্সিয়া মার্কেস্‌, (জন্মঃ ৬ মার্চ, ১৯২৭ - মৃত্যু: ১৭ এপ্রিল, ২০১৪ ), যিনি গাবো নামেও পরিচিত, একজন কলম্বীয় সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকাশক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নিঃসঙ্গতার এক শতাব্দী বইয়ের লেখক হিসেবে তিনি বিশেষ পরিচিত। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস জীবনের বেশিরভাগ সময় বসবাস করেছেন মেক্সিকো এবং ইউরোপে

এই বিশ্ব বিখ্যাত কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক বিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধের সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিলেন। জীবনের শেষ দুই যুগ তিনি ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচেছিলেন। এ সময় তাঁর লেখালিখি কমে আসে। জনসংযোগ ও ভ্রমণ হয়ে পড়ে সীমিত। এমনকী ২০০৪-এ আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড লিভিং টু টেল আ টেইল প্রকাশের পর পরিকল্পিত ২য় এবং ৩য় খণ্ড আর রচনা করা হয়ে ওঠেনি। তিনি দূরারোগ্য লিম্ফেঠিক ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ২০১২'র জুলই থেকে তিনি স্মৃতি বিনষ্টিতে আক্রান্ত হন।[১]

সাহিত্যবিশারদদের মতে তিনি হোর্হে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) এবং হুলিও কোর্তাসারের (Julio Cortázar) সাথে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দক্ষিণ আমেরিকান কথাসাহিত্যিক। তিনি একই সঙ্গে জনপ্রিয় এবং মহৎ লেখক হিসেবে চার্লস ডিকেন্স, লেভ তলস্তয় ও আর্ণেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে তাঁর নাম এক কাতারে উচ্চারিত হতো। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সময় সুইডিশ একাডেমী এমত মন্তব্য করেছিল যে তাঁর প্রতিটি নতুন গ্রন্থের প্রকাশনা বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মতো। জনমানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তিনি ছিলেন বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে তার দোস্তি ছিল প্রবাদপ্রতীম। [২]

জীবন[সম্পাদনা]

মার্কেস ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আইন পড়া বন্ধ করে এল এস্পেক্তাদোর সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা শুরু করেন। তাঁর প্রথম ছোটগল্প লা তের্সেরা রেসিগ্নাসিওন‌ এল এসপেক্তাদোর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গার্সিয়া মার্কেস তাঁর পেশাজীবন শুরু করেন আঞ্চলিক সংবাদপত্রে সাংবাদিকতার মাধ্যমে। তিনি বারানকিইয়া (Barranquilla) শহরের এল এরাল্‌দো (El Heraldo) পত্রিকায় রিপোর্টার এবং কার্তাহেনা (Cartagena) শহরের এল উনিবের্সাল (El Universal) পত্রিকায় সম্পাদকের কাজ করেন। এই সময়েই তিনি অপ্রচলিত লেখক এবং সাংবাদিকদের দল হিসেবে পরিচিত বারানকিইয়া গ্রুপে যোগ দেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি তাঁর পরবর্তী সাহিত্যজীবনের অনুপ্রেরণা লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় আসেন এবং এল এস্পেক্তাদোর (El Espectador) পত্রিকায় কাজ করেন। পরবর্তীকালে তিনি রোম, প্যারিস, বার্সেলোনা, ক্যানসাস এবং নিউ ইয়র্কে একজন বিদেশী সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন।

তাঁর প্রথম বৃহদাকার কাজ ছিল “দ্য স্টোরি অফ এ শিপরেক্‌ড সেইলর” (Relato de un náufrago রেলাতো দে উন্‌ নাউফ্রাগো), যা তিনি ১৯৫৫ সালে পত্রিকা ধারাবাহিক হিসেবে রচনা করেন। একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা এ বইয়ে ফুটে ওঠে কলম্বিয়ার নৌবাহিনীর একটি দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের কাহিনী; জাহাজটি চোরাচালানির পণ্যের অতিরিক্ত ভারে ডুবে গিয়েছিল। বইটি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়, কেননা এর কাহিনীর সাথে প্রকৃত ঘটনাটির সরকার কর্তৃক প্রকাশিত বিবরণের মিল ছিল না। সরকারি বিবরণীতে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ঝড়ের কথা বলা হয়েছিল এবং জীবিত নাবিকদের বীরের মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতেই মার্কেসের বিদেশী সংবাদদাতা জীবন শুরু হয় কেননা দেশে তখন তিনি জেনারেল গুস্তাবো রোহাস পিনিয়ার (Gustavo Rojas Pinilla) চক্ষুশুল হয়ে গিয়েছিলেন। এই সিরিজটি পরবর্তীকালে একটি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় এবং অনেকে এটিকে উপন্যাস হিসেবেই গ্রহণ করেন।

জাদুবাস্তবতার যাদুকর মার্কেস

গার্সিয়া মার্কেসের অনেক কাজ কল্পকাহিনী এবং বাস্তবধর্মী উভয় রূপেই পরিগণিত। “ক্রোনিকা দে উনা মুয়ের্তে আনুন্সিয়াদা” (Crónica de una muerte anunciada, ১৯৮১) পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিশোধপরায়ণ খুনের ঘটনা অবলম্বনে রচিত এবং “এল আমোর এন লোস তিয়েম্পোস দেল কোলেরা" (El amor en los tiempos del cólera, ১৯৮৫) গল্পে তাঁর অভিভাবকের আদালত জীবনের বর্ণনা রয়েছে। এই দুটি কাজ ছাড়াও তার অনেক কাজই “গাব্রিয়েল গার্সিয়ার বিশ্বে” সংঘটিত হয় যেখানে চরিত্র, স্থান এবং ঘটনাসমূহ বারবার বিভিন্ন বইয়ে পুনর্ঘটিত হতে দেখা যায়।

তাঁর সবচাইতে ব্যবসাসফল উপন্যাস "নিঃসঙ্গতার এক শতাব্দী" (Cien años de soledad সিয়েন আনিওস দে সোলেদাদ) সারা বিশ্বে প্রায় ১০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়। এতে বুয়েনদিয়া পরিবারের বেশ কিছু প্রজন্মের কাহিনী চিত্রিত হয় যাদের বাস দক্ষিণ আমেরিকার কল্পিত গ্রাম মাকোন্দোতে। এই বইটির জন্য তিনি ১৯৭২ সালে রোমুলো গ্যালাওস পুরস্কার জিতে নেন। তিনি ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার জয়লাভ করেন যার ভিত্তি হিসেবে তার ছোট গল্প এবং উপন্যাসকে বিবেচনা করা হয়।

১৯৯৯ সালে তার লিম্ফাটিক ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং এই ঘটনা তার মধ্যে স্মৃতিকথা লেখার অনুপ্রাণনা সৃষ্টি কর্ ২০০০ সালে পেরুর দৈনিক লা রিপাবলিকা তার মৃত্যুর ভুল সংবাদ ছাপে।

২০০২ সালে তার তিন খণ্ডের আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড হিসাবে স্মৃতিগ্রন্থ বিবির পারা কোন্ত্রালা প্রকাশিত হয় যা স্পেনীয় ভাষাভাষীদের মধ্যেব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বেস্টসেলারে পরিণত হয়। ২০০৩ এর নভেম্বরে এডিথ গ্রসম্যানের ইংরেজি অনুবাদ “লিভিং টু টেল দ্য টেল” প্রকাশিত হয় যা ছিল আরেকটি বেস্টসেলার। ২০০৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বোগোতা দৈনিক এল তিয়েমপো মার্কেসের একটি নতুন উপন্যাসের কথা ঘোষণা করে, যার নাম মেমোইরা দি মিস পুতাস ত্রিসতেস। প্রেমের এই উপন্যাসটি অক্টোবরে প্রকাশিত হয় এবং এর প্রথম সংস্করণের দশ লক্ষ কপি নিঃশেষিত হয়ে যায়। উল্লেখযোগ্য গার্সিয়া মার্কেস আর লিখছেন না ; তাঁর আত্মজীবনীর বাকী দুই অংশ প্রকাশের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও ফিদেল কাস্ত্রোর মধ্যকার বন্ধুত্ব বহুল বিদিত। মার্কেসকে দক্ষিণ আমেরিকান কিছু বৈপ্লবিক দলের প্রতি সহানুভূতিশীল মনে করা হয়। তিনি কলম্বিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও একজন কঠোর সমালোচক। কলম্বীয় সরকার-দলীয় সমর্থকেরা তাঁর বিরুদ্ধে গেরিলা গ্রুপ, বিশেষ করে এফএআরসিইএলএন-কে সাহায্য করার অভিযোগ করলেও এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র পরিচালক রোদ্রিগো গার্সিয়ার বাবা।[৩]

এক নজরে[সম্পাদনা]

  • ১৯২৭: কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূলের কাছে আরাকাটাকা শহরে ৬ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন মার্কেস।
  • ১৯৪০: উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তে বন্দরনগর বারানকুইল্লা যান। ১৯৪৭ সালে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এ সময় তাঁর দুটি ছোট গল্প পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
  • ১৯৫৯: বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর আমন্ত্রণ পেয়ে কিউবায় যান। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
  • ১৯৬৭: উপন্যাসওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড প্রকাশিত। ১৯৭৫-৭৬ সালে প্রকাশিত হয় অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক।
  • ১৯৮২: সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ।
  • ২০১৪: কয়েক দিন হাসপাতালে থাকার পর মেক্সিকো সিটিতে মৃত্যু।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

তিনি ১৭ এপ্রিল ২০১৪ সালে মেক্সিকোতে ৮৭ বছর বয়সে তার মৃত্যুবরণ করেন।[৪]

প্রকাশিত গ্রন্থাবলি[সম্পাদনা]

উপন্যাস[সম্পাদনা]

  • La mala hora লা মালা ওরা (১৯৬৭)
  • Cien años de soledad সিয়েন আনিওস দে সোলেদাদ (১৯৬৭)
  • Crónica de una muerte anunciada ক্রোনিকা দে উনা মুয়ের্তে আনুন্সিয়াদা (১৯৭৫)
  • El amor en los tiempos del cólera এল আমোর এন লোস তিয়েম্পোস দেল কোলেরা (১৯৮৫)
  • Del amor y otros demonios দেল আমোর ই ওত্রোস দেমোনিওস (১৯৯৪)

প্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের (১৯৮২) অর্থ দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দুটি প্রতিষ্ঠান:

  • সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণবিষয়ক ‘ফুন্দাসিয়োন নুয়েবো পেরিয়োদিসমো ইবেরোআমেরিকানো’ (নিউ আইবেরোআমেরিকান জার্নালিজম ফাউন্ডেশন, মেহিকো)
  • সিনেমার কৃৎকেৌশল শেখানোর ‘এস্কুয়েলা ইন্তেরনাসিয়োনাল দে সিনে ই তেলিবিসিয়োন’ (ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অব সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন, কুবা)।

পুরস্কার[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Gabriel García Márquez, Conjurer of Literary Magic, Dies at 87
  2. Gabriel García Márquez, Nobel Prize-winning explorer of myth and reality, dies at 87
  3. Gabriel García Márquez Biography
  4. অনন্ত নির্জনতায় মার্কেজ
  5. [http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/literature/laureates/1982/The Nobel Prize in Literature 1982

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]