কাজী মোতাহার হোসেন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
কাজী মোতাহার হোসেন
৩০ জুলাই ১৮৯৭৯ অক্টোবর - ১৯৮১
Kaji Motahar Hossain.jpg

জন্ম তারিখ: জুলাই ৩০, ১৮৯৭
জন্মস্থান: বাগমারা, ফরিদপুর জেলা (ব্রিটিশ ভারত)
মৃত্যু তারিখ: অক্টোবর ৯, ১৯৮১(১৯৮১-১০-০৯) (৮৪ বছর)
মৃত্যুস্থান: ঢাকা (বাংলাদেশ)
জীবনকাল: ৩০ জুলাই ১৮৯৭৯ অক্টোবর - ১৯৮১
প্রধান সংগঠন: মুসলিম সাহিত্য সমিতি
দাম্পত্য সঙ্গী: সাজেদা খাতুন
পিতামাতা: কাজী গওহরউদ্দীন আহমদ
তাসিরুন্নেসা
সন্তান: চার পুত্র ও সাত কন্যা (সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন, কাজী আনোয়ার হোসেন, কাজী মাহবুব হোসেন)

কাজী মোতাহার হোসেন (জুলাই ৩০, ১৮৯৭ - অক্টোবর ৯, ১৯৮১) একজন বাংলাদেশী পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

কাজী মোতাহার হোসেনের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলার পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে। তবে তার জন্ম কুষ্টিয়া (তখনকার নদীয়া) জেলার কুমারখালি থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামে তাঁর মামাবাড়িতে ১৮৯৭ সালের ৩০শে জুলাই। তাঁর পিতা কাজী গওহরউদ্দীন আহমদ ছিলেন সেটেলমেন্টের আমিন।[১] মায়ের নাম তাসিরুন্নেসা। শৈশব কাটিয়েছেন ফরিদপুরের বাগমারায়।

১৯২১ সালে এম. এ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালীন সময়ে কলকাতার তালতলা নিবাসী মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমানের কন্যা সাজেদা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।[১] তাঁদের সংসারে চার পুত্র ও সাত কন্যা ছিল।[২] তন্মধ্যে - সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন, কাজী আনোয়ার হোসেন, কাজী মাহবুব হোসেন প্রমূখ রয়েছেন।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

কাজী মোতাহার হোসেনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুষ্টিয়াতেই। মেধাবি ছাত্র হিসাবে বৃত্তি নিয়ে ১৯০৭ সালে নিম্ন প্রাইমারি ও ১৯০৯ সালে উচ্চ প্রাইমারি পাশ করেন। ১৯১৫ সালে কুষ্টিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পরীক্ষা পাস করে ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। এখানে তিনি শিক্ষক হিসেবে পান প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে। ১৯১৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় বাংলা ও আসাম জোনে প্রথমস্থান অর্জন করে মাসিক ৩০ টাকা বৃত্তিলাভ করেন। ঢাকা কলেজে তার শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ওয়াল্টার অ্যালেন জেনকিন্স, পদ্মভূষণ ভূপতি মোহন সেন, ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয়শ্রেণীতে প্রথমস্থান নিয়ে এমএ পাশ করেন। উল্লেখ্য, সেবছর কেউ প্রথমশ্রেণী পাননি। ১৯৩৮ সালে ভারতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। যুগপৎভাবে, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে পি.এইচ.ডি করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল 'Design of Experiments'। তাঁর ডক্টরাল থিসিসে তিনি 'Hussain's Chain Rule' নামক একটি নতুন তত্ত্বের অবতারণা করেন। বস্তুত, তৎকালীন পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) তিনিই প্রথম স্বীকৃত পরিসংখ্যানবিদ।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৯২১ সালে ঢাকা কলেজে ছাত্র থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ডেমনেস্ট্রেটর হিসেবে চাকরি শুরু করেন এবং একই বিভাগে ১৯২৩ সালে একজন সহকারী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। কাজী মোতাহার হোসেনের নিজ উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে এম.এ কোর্স চালু হয় এবং তিনি এই নতুন বিভাগে যোগ দেন।[৩] তিনি গণিত বিভাগেও ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন।[৪] ১৯৫১ সালে তিনি পরিসংখ্যানে একজন রিডার ও ১৯৫৪ সালে অধ্যাপক হন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি পরিসংখ্যান বিভাগে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন।[৪] ১৯৬৪ সালে স্থাপিত পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউটের তিনি প্রথম পরিচালক।[৫] ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনারারী (Professor Emeritus) অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

ভাষা আন্দোলন[সম্পাদনা]

অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী এবং সেই আলোকে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুদৃঢ় ভিত গড়ে তোলার জন্য তিনি লেখনী পরিচালনা করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবীতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তিনি ছিলেন তার একজন দৃঢ় পৃষ্ঠপোষক। বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রবন্ধাদি প্রকাশ করে এ-সব আন্দোলনে গতিদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ৬-দফাকে কেন্দ্র করে ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে আন্দোলন সংঘটিত হয় তারও একজন বলিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন কাজী মোতাহার।[১]

১৯৬১ সালে প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের বিরোধিতার মুখে ঢাকায় রবীন্দ্র-জন্মশত বার্ষিকী পালনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালি-সংস্কৃতি খর্ব করার জন্য রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদজ্ঞাপন করেন।

তিনি বাংলা বানান ও লিপি সংস্কার কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানী আয়োজিত কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সভাপতি হন। ব্যক্তিগত জীবনে কাজী নজরুল ইসলামের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। নজরুল তাঁর মোতাহার নামকে আদর করে 'মোতিহার' ডাকতেন।

রচনাসমগ্র[সম্পাদনা]

১৯২৬ সালে কাজী আব্দুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেনআবুল ফজলের সাথে তিনি "মুসলিম সাহিত্য সমাজ" গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি কিছুকাল 'শিখা' নামক পত্রিকা সম্পাদনা করেন।[৬] তিনি বাংলা একাডেমির একজন প্রতিষ্ঠাতা। কাজী মোতাহার হোসেন বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতির উপর অনেক বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে সঞ্চয়ন (১৯৩৭)(প্রবন্ধ সংকলন), নজরুল কাব্য পরিচিতি(১৯৫৫), সেই পথ লক্ষ্য করে(১৯৫৮), সিম্পোজিয়াম(১৯৬৫), গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস(১৯৭০), আলোক বিজ্ঞান(১৯৭৪), নির্বাচিত প্রবন্ধ (১৯৭৬), প্লেটোর সিম্পোজিয়াম (অনুবাদ-১৯৬৫)অন্যতম।

সম্মাননা[সম্পাদনা]

১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনকে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৬৬ সালে প্রবন্ধসাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ১৯৭৯ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে বিজ্ঞান ও কলা বিষয়ে অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডি.এস.সি ডিগ্রি দ্বারা সম্মানিত করে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত করে।

কাজী মোতাহার হোসেন ভবন নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনের নতুন নামকরণ করা হয়।[৭]

দাবা[সম্পাদনা]

১৯২৫ সালে নিখিল ভারত দাবা প্রতিযোগিতা আয়োজনের ব্যাপারে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।[৮] উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু হিসেবে ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানে একক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি।[৯]

তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবে আছেন কাজী মোতাহার হোসেন। দাবা খেলায় তাঁর অনন্য সাধারণ অবদানের কথা স্মরণ করেই বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের উদ্যোগে কাজী মোতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

৯ অক্টোবর, ১৯৮১ সালে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, সম্পাদকঃ সেলিনা হোসেন ও নূরুল ইসলাম, ২য় সংস্করণ, ২০০৩, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃ. ১১৫-১১৬
  2. http://www.sonalisakal.com/details.php?news_id=419
  3. Asjadul Kibria (১৭-২৩ জুন, ২০০৮)। "The spy who turns 73" (ওয়েব)। Daily New Age, Xtra (ইংরেজি ভাষায়) (ঢাকা)। সংগৃহীত জুন ২, ২০১০ 
  4. ৪.০ ৪.১ http://www.bas.org.bd/fellowship/list-of-fellows-/userprofile/mhossain.html
  5. ডেইলি স্টারে প্রকাশিত নিবন্ধ
  6. Huq, Mahbubul; Abdul Mannan Syed, Shofiul Alam, Kobir Uddin Ahmed Mazumder (July 1998)। Uchcho Maddhomik Bangla Shonkolon। Dhaka: National Curriculum and Textbook Board।  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  7. গুণীজন ডট কমঃ কাজী মোতাহার হোসেন, সংগ্রহঃ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ইং
  8. জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী, সংগ্রহকালঃ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ইং
  9. ১১৩তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, সংগ্রহঃ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ইং

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]