তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(এল এন জি থেকে ঘুরে এসেছে)
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনকারী ট্যাংকার জাহাজ।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (ইংরেজি: Liquefied natural gas) বা এলএনজি হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস যাকে সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুবিধার্থে অস্থায়ীভাবে তরলে রূপান্তর করা হয়েছে। জ্বালানি হিসেবে এলএনজির জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে।

এলএনজি আলাদা কোন জ্বালানি নয়, আদতে এটি প্রাকৃতিক গ্যাসেরই তরল রূপ। প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। শীতলকরণ (refrigeration) প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের তাপমাত্রা কমিয়ে -১৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে গ্যাস তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকেই এলএনজি বলা হয়। পরিবহনের সুবিধার্থে এক বায়ুমন্ডলীয় চাপে এলএনজি তৈরি করা হয়। এলএনজির প্রধান উপাদান হচ্ছে মিথেন। প্রাকৃতিক গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তরিত করার সময় মিথেন বাদে অন্যান্য অনাকাংক্ষিত উপাদান যেমন ধূলিকণা, এসিড গ্যাস, হিলিয়াম, পানি, অপেক্ষাকৃত ভারী হাইড্রোকার্বন, নাইট্রোজেন ইত্যাদি দূর করা হয়, যার কারণে অন্য অনেক জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে এলএনজি ব্যবহারে দূষণ কম হয়।

এলএনজির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যখন প্রাকৃতিক গ্যাসকে সাধারণ বায়ুমন্ডলীয় চাপে তরল করে ফেলা হয় তখন এর আয়তন কমে যায় প্রায় ৬০০ গুন। অর্থাৎ ৬০০ লিটার গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তরিত করে মাত্র এক লিটারের ছোট্ট একটা বোতলে ভরে ফেলা যায়। এ জন্যই এলএনজি জাহাজে পরিবহন করা সুবিধাজনক। একসাথে অনেক বেশি জ্বালানি পরিবহন করা যায় পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্তপ্রান্তে। যখন পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিবহন অসম্ভব কিংবা অর্থনৈতিকভাবে অসাশ্রয়ী, সেসব ক্ষেত্রে গ্যাসকে তরল বানিয়ে তারপর বিশেষভাবে তৈরি সামুদ্রিক জাহাজ বা এলএনজি ট্যাংকারের মাধ্যমে পরিবহন করা যায়।

এলএনজি কিন্তু এলপিজি (LPG) বা সিএনজি (CNG) নয়। এলপিজি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, পাওয়া যায় রিফাইনারি থেকে। এটি মূলত প্রোপেন ও বিউটেনের মিশ্রণ। অন্যদিকে সিএনজি মানে হচ্ছে কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস বা সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস। এটাও মিথেন কিন্তু এলএনজির মত তরল অবস্থায় থাকে না, গ্যাসকে কেবল প্রচন্ড চাপে সংকুচিত (কম্প্রেস) করা হয় যাতে অনেক বেশি গ্যাস ছোট একটা সিলিন্ডারে জমা করে রাখা যায়। অন্যদিকে, এলএনজিকে কম্প্রেস করা হয় না, বরং প্রাকৃতিক গ্যাসকে এত বেশি ঠান্ডা (রেফ্রিজারেশন) করা হয় যে একসময় সাধারণ চাপেই সে তরল হয়ে যায়। এই কারণে, সিএনজির চেয়ে এলএনজি বেশি নিরাপদ। এলএনজির শক্তি ঘনত্ব ডিজেলের প্রায় ৬০% [১]

প্রাথমিক তথ্যাবলী[সম্পাদনা]

এলএনজি মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসকে তার উৎস থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয় এবং এর আবির্ভাব কেবলমাত্র সমুদ্রপথে গ্যাস পরিবহনের সুবিধার জন্য। আদতে যদি ভূমিতে দুই হাজার মাইলের কমে প্রাকৃতিক গ্যাসকে পরিবহন করতে হয় তাহলে পাইপলাইনই হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। সমুদ্রপথে এই দূরত্ব কমে গিয়ে সাতশো মাইল। অর্থাৎ, এলএনজি তখনই অর্থনৈতিকভাবে সাচ্ছন্দদায়ক যখন আমদানি এবং রপ্তানিকারক দুটি দেশের অবস্থান একে অপর থেকে নিদেনপক্ষে ভূমিপথে দুই হাজার মাইলের বেশি কিংবা সমুদ্রপথে সাতশো মাইলের বেশি হয়।

পাইপলাইনে বিপণনের পূর্বে এলএনজিকে পুনরায় গ্যাসে পরিণত করা হয়। গ্যাস চালিত যান চালাতে এলএনজি ব্যবহার করা যেতে পারে, যদিও সাধারণত সিএনজি দিয়ে চালানোর জন্যই এদের নকশা করা হয়। এলএনজির শক্তি ঘনত্ব গ্যাসোলিন ও ডিজেলের কাছাকাছি এবং এর দূষণের মাত্রা অনেক কম হলেও বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার সীমিত। প্রথম কারণ, এর উৎপাদন ও পরিবহন খরচ অনেক বেশি। উৎপাদন ও পরিবহন খরচ এলএনজির মোট দামের ৮৫% পর্যন্ত হতে পারে। উপরন্তু, এলএনজি সংরক্ষণের জন্য ব্যয়বহুল ক্রায়োজেনিক (শূন্যের অনেক নিচের তাপমাত্রা) ট্যাংকের প্রয়োজন।

উপাদান, তাপমাত্রা ও চাপভেদে এলএনজির ঘনত্ব প্রায় ০.৪১ ~ ০.৫ কিলোগ্রাম/লিটার (জলের ঘনত্ব ১ কিলোগ্রাম/লিটার)। এর জ্বালানি মান (heating value) নির্ভর করে গ্যাসের উৎস এবং তরলীকরণ প্রক্রিয়ার উপর। -১৬৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এলএনজির উচ্চ জ্বালানি মান বা HHV (higher heating value) প্রায় ২৪ মেগাজুল/লিটার, এবং নিম্ন জ্বালানি মান বা LHV(lower heating value) ২১ মেগাজুল/লিটার।

এলএনজি তৈরির জন্য এলএনজি প্লান্ট বা কারখানায় সরবরাহকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে প্রথমে স্বল্প পরিমাণে থাকা জল, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড এনং যেসব উপাদান অতিরিক্ত কম তাপমাত্রায় জমে যায় (যেমন, বেনজিন) তাদেরকে আলাদা করে ফেলা হয়। এলএনজিতে ৯০% বা তারও বেশি মিথেন থাকে। এছাড়া স্বল্প পরিমাণে থাকে নাইট্রোজেন, ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন এবং কিছু ভারী এলকিন। এলএনজি সচরাচর ঝুঁকিহীন হলেও হঠাৎ গরম কোনো কিছু, যেমন সাধারণ তাপমাত্রার জলের সংস্পর্শে এর দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন (ইংরেজি: rapid phase transition বা RPT) ঘটতে পারে।[২]

এলএনজি যোগান শৃঙ্খল[সম্পাদনা]

এলএনজি মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের স্তানান্তর প্রক্রিয়ার রয়েছে বেশ কয়েকটি ধাপ। প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলন থেকে আরম্ভ করে এলএনজিতে রূপান্তর, সামুদ্রিক পরিবহন, পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর এবং বন্টন – এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় এলএনজি যোগান শৃঙ্খল (ইংরেজি: LNG Supply Chain)। এই শৃঙ্খলের ধাপগুলি হচ্ছে-

  • প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান, আহরণ ও যোগান
  • এলএনজি উৎপাদন ও সংরক্ষণ
  • এলএনজি পরিবহন
  • সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসিকরণ
  • গ্যাস বন্টন / বিপণন

প্রথম তিনটি সংঘটিত হয় এলএনজি বিক্রেতার তরফে/দেশে। পরিবাহিত এলএনজি ক্রেতার রিসিভিং টার্মিনালে পৌছালে পুনঃগ্যাসিকরণ ও বন্টনের দায়িত্ব ক্রেতার নিজের। এলএনজি শৃঙ্খলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল দুটি ধাপ হচ্ছে এলএনজি উৎপাদন ও পরিবহন। একটি এলএনজি উৎপাদন প্লান্টে এক বা একাধিক স্বয়ংসম্পূর্ণ তরলীকরণ ইউনিট থাকে, যাদেরকে এলএনজি ট্রেন বলা হয়। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এলএনজি ট্রেন কাতারে অবস্থিত। একটি ট্রেন কিংবা প্লান্টের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতাকে এমএমটিএ (মিলিয়ন টন পার এনাম) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। কাতারগ্যাস অপারেটিং কোম্পানির (Qatargas) সাম্প্রতিককালে নির্মিত দ্বিতীয় সাইট কাতারগ্যাস (II) প্লান্টে দুটি এলএনজি ট্রেন আছে যাদের প্রত্যেকটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৭.৮ মিলিয়ন টন। পৃথিবীর অন্যান্য বৃহৎ এলএনজি ট্রেনের মধ্যে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে আটলান্টিক এলএনজি নির্মিত ট্রেন-৪য়ের উৎপাদন ক্ষমতা ৫.২ এমএমটিএ[৩], এবং মিশরে অবস্থিত সিগ্যাস এলএনজি প্লান্টের উৎপাদন ক্ষমতা ৫ এমএমটিএ।

ট্রেন থেকে উৎপাদনের পর এলএনজিকে ট্যাংকে জমা করা হয়। ট্যাংক থেকে পাঠানো হয় জেটিতে, জাহাজে তোলার জন্য। এলএনজি জাহাজগুলোও মূলত একাধিক ট্যাংকের সমাহার, যাতে ভরে এলএনজিকে সমুদ্রপথে এক দেশ থেকে অন্য দেশ, এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পরিবহন করা হয়। আমদানিকারক জেটিতে পৌছলে এলএনজিকে জাহাজ থেকে নামিয়ে আবার ট্যাংকে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়। ট্যাংকের তাপমাত্রা সবসময় এলএনজির তাপমাত্রায় (-১৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াস) স্থির রাখতে হয়। যে কারণে এলএনজি ট্যাংক ও জাহাজগুলিও খুব ব্যয়বহুল। আমদানিকারক জেটির পাশেই থাকে রিগ্যাসিফিকেশন বা পুণঃগ্যাসিকরণ টার্মিনাল, যেখানে এলএনজিকে তাপের মাধ্যমে গ্যাসীয় অবস্থায় ফেরত নিয়ে আসা হয়। পুনরুৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাস অবশেষে এর ক্রেতাদের মধ্যে বন্টনের জন্য পাইপলাইন নেটওয়ার্ক বা জাতীয়/স্থানীয় গ্যাস গ্রিডে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

সংরক্ষণ[সম্পাদনা]

এলএনজি সংরক্ষণ ট্যাংক

এলএনজিকে তরল রাখার জন্য প্রয়োজন খুব নিম্ন তাপমাত্রার সংরক্ষণ। এলএনজি সংরক্ষণ ট্যাংক মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় এলএনজি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। ট্যাংকগুলি সাধারণত দুই স্তর বিশিষ্ট আধার হিসেবে নির্মাণ করা হয়। বাইরের স্তরটি বিশেষ প্রকারের কংক্রিট এবং ভেতরের স্তরটি উচ্চ-নিকেল স্টিল দ্বারা তৈরি করা হয়। দুই স্তরের মাঝখানে ব্যবহার করা হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তাপ প্রতিরোধক । বৃহদাকার ট্যাংকগুলি সাধারণত বেলনাকৃতির হয় এবং এদের আসপেক্ট রেশিও (উচ্চতা ও বিস্তারের অনুপাত) কম থাকে। গম্বুজাকৃতি ছাদ বানানো হয় স্টিল বা কংক্রিট দিয়ে। এলএনজি সংরক্ষণের জন্য অনেক সময় ভূগর্ভস্থ ট্যাংকও ব্যবহৃত হয়, তবে সেগুলোর নির্মাণ খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে।

যত কার্যকরী তাপপ্রতিরোধকই ব্যবহার করা হোক না কেন, এত কম তাপমাত্রায় ট্যাংকে সর্বদাই কিছু না কিছু তাপ ঢুকে পড়ে। এর ফলে এলএনজির বাষ্পীভবন ঘটে এবং এই বাষ্পীভূত গ্যাসকে বয়েল-অফ গ্যাস (ইংরেজি: boil-off gas) বলা হয়। অনেক সময় এই বয়েল-অফ গ্যাসকে পুনঃতরলীকরণের মাধ্যমে ট্যাংকে ফেরত পাঠানো হয়। অন্যথায়, সরাসরি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার কিংবা পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এলএনজি গুণমান[সম্পাদনা]

এলএনজি বাণিজ্য ও ব্যবহারের প্রশ্নে এলএনজির গুণমান একটি অতিগুরুত্ব বিষয়। যদি কোন সরবরাহকৃত গ্যাস বা এলএনজি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (ইংরেজি: sale and purchase agreement) অনুযায়ী নির্ধারিত গুণগত মান পূরণ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তাকে "মান বহির্ভূত" (off-spec বা off-quality) গ্যাস বা এলএনজি বলে ধরে নেয়া হয়। গুণগত মানের প্রবিধান বা নিয়ন্ত্রণ মূলত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করেঃ[৪]

১ - বন্টনকৃত গ্যাস ক্ষয়কারী কিংবা বিষাক্ত নয়, এবং এর সামগ্রিক H2S, সালফার, CO2 এবং Hg মাত্রার পরিমাণ নির্ধারিত উচ্চমাত্রার নিচে;
২ - এলএনজি থেকে গ্যাসিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আর্দ্রতা শিশিরাংক এবং হাইড্রোকার্বন শিশিরাঙ্ক এমন যাতে পাইপলাইনে পরিবহনের সময় কখনোই কোনো তরল বা হাইড্রেট তৈরি হবে না;
৩ - বন্টনকৃত গ্যাসের আন্তপরিবর্তন সক্ষমতা (ইংরেজি: interchangeability) নিশ্চিত করে এমন সূচকগুলির মান অনুমোদনযোগ্য সীমার মধ্যে থাকবে। গ্যাসের দহনকে প্রভাবিত করা বিভিন্ন সূচকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্যাসের নিষ্ক্রিয় উপাদানের পরিমাণ, এর ক্যালোরিফিক মান, ওবে সূচক (ইংরেজি: Wobbe index), ঝুল সূচক বা সুট ইনডেক্স, অসম্পূর্ণ দহন মাত্রা, ইত্যাদি।

মান বহির্ভূত গ্যাস কিংবা এলএনজির ক্ষেত্রে ক্রেতা সেই গ্যাস কিংবা এলএনজি গ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে এবং বিক্রেতা এই কারণে পূর্বে নির্ধারিত খেসারত দিতে বাধ্য থাকতে পারেন। এই খেসারত নির্ভর করে মান বহির্ভূত গ্যাসের পরিমাণের উপর। গ্যাস কিংবা এলএনজির গুণমান মাপা হয় অর্পিত হবার স্থানে (যেমন, রিসিভিং টার্মিনাল)। গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফ নামক যন্ত্রের সাহায্যে গ্যাসের উপাদান ও এর গুণমান পরিমাপ করা যায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

অন্যান্য সূত্র[সম্পাদনা]