উইলিয়াম এএস ঔডারল্যান্ড
উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ঔডারলান্ড (ওলন্দাজ: Wiliam Ouderland) (৬ই ডিসেম্বর, ১৯১৭—১৮ই মে, ২০০১) ছিলেন একজন ওলন্দাজ-অস্ট্রেলীয় সামরিক কমান্ডো অফিসার। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীর প্রতীক প্রদান করে। তিনি-ই একমাত্র বিদেশী যিনি এই রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। । [১][২][৩]
পরিচ্ছেদসমূহ |
প্রারম্ভিক জীবন [সম্পাদনা]
ঔডারল্যাণ্ডের জন্ম হল্যাণ্ড এর আমস্টারডামে ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর। ১৭ বছর বয়সে তাঁকে লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার জন্য জুতা-পালিশের কাজ নিতে হয়[২] এবং পরে তিনি বাটা সু কোম্পানিতে যোগ দেন। ১৯৩৬ সালে জার্মানী কর্তৃক নেদারল্যাণ্ডস দখলের আগে ঔডারল্যাণ্ড ডাচ ন্যাশনাল সার্ভিসে নাম লেখান। পরবর্তীতে তিনি রয়্যাল সিগনাল কর্পসের সার্জেণ্ট নিযুক্ত হন এবং তার দলে ৩৬ জন সদস্য ছিল। জার্মানী কর্তৃক নেদারল্যাণ্ডস, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম দখল করার ফলশ্রুতিতে ঔডারল্যাণ্ডকে গ্রেফতার করা হয়। তবে তিনি বন্দীদশা থেকে পালিয়ে যেতে সমর্থ হন এবং জার্মানী থেকে ফেরত সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেবার কাজে নিযু্ক্ত হন। ঔডারল্যাণ্ড জার্মান ও ডাচ ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি ডাচ আণ্ডারগ্রাউণ্ড রেজিসট্যান্স মুভমেণ্টের হয়ে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেন।[১]
মুক্তিযুদ্ধে অবদান [সম্পাদনা]
১৯৭১ এর প্রথম দিকে ঔডারল্যান্ড ঢাকার অদূরে টঙ্গীস্থ বাটা সু কোম্পানী(পাকিস্তান)লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপে যোগ দেন[২]। ২৫ মার্চ এর অপারেশন সার্চলাইট এবং এর পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকান্ড ও নৃশংস বর্বরতা দেখে মর্মাহত হন এবং যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞের ছবি তুলতে থাকেন এবং সেগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতে থাকেন।[১]
বাটা সু কোম্পানীর মত বহুজাতিক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা (CEO) হওয়াতে তার পূর্ব পাকিস্তানে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ ছিল। এই সুবিধার কারণে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নীতিনির্ধারক মহলে অনুপ্রবেশ করার এবং বাংলাদেশের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করার। তিনি প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে,কর্নেল সুলতান নেওয়াজের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সখ্য গড়ে তোলেন। সেই সুবাদে শুরু হয় তার ঢাকা সেনানিবাসে অবাধ যাতায়াত। এতে তিনি পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হতে থাকলেন আরো বেশি সংখ্যক সিনিয়র সেনা অফিসারদের সাথে। এর এক পর্যায়ে লে,জেনারেল টিক্কা খান, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে,জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী,এডভাইজার সিভিল এফেয়ার্স মে,জেনারেল রাও ফরমান আলি সহ আরো অনেক সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাথে তার হৃদ্যতা গরে ওঠে। নিয়াজীর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার তাকে 'সম্মানিত অতিথি' হিসাবে সম্মানিত করে। এই সুযোগে তিনি সব ধরনের 'নিরাপত্তা ছাড়পত্র' সংগ্রহ করেন। এতে করে সেনানিবাসে যখন তখন যত্রতত্র যাতায়াতে তার আর কোন অসুবিধা থাকল না। এক পর্যায়ে তিনি পাকিস্তানীদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করা শুরু করলেন। এসকল সংগৃহিত সংবাদ তিনি গোপনে প্রেরণ করতেন ২নং সেক্টর এর ক্যপ্টেন এ,টি,এম হায়দার এর কাছে।[১]
যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি টঙ্গীস্থ বাটা সু ফ্যাক্টরীর ভেতরেই তিনি গণযোদ্ধাদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। কমান্ডো হিসাবে ঔডারল্যান্ড ছিলেন অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। এক পর্যায়ে তিনি নিজেই জীবন বিপন্ন করে যুদ্ধে নেমে পড়েন। তিনি বাঙ্গালী যোদ্ধাদের নিয়ে টঙ্গী-ভৈরব রেললাইনের ব্রীজ, কালভার্ট ধ্বংস করে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করতে থাকেন। তার পরিকল্পনায় ও পরিচালনায় ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে বহু অপারেশন সংঘটিত হয়। মেজর হায়দারের দেয়া এক সনদপত্রের সূত্রে জানা যায় যে, ঔডারল্যান্ড মুক্তিযুদ্ধে গণযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন,পরামর্শ, নগদ অর্থ,চিকিৎসা সামগ্রী,গরম কাপড় এবং অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন।[১]
স্বীকৃতি [সম্পাদনা]
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড ও সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর প্রতীক পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় তাঁর নাম ২ নম্বর সেক্টরের গণবাহিনীর তালিকায় ৩১৭। ১৯৯৮ সালের ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে ঔডারল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় আসতে পারেননি। তিনি বীর প্রতীক পদকের সম্মানী ১০,০০০ টাকা মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্টে দান করে দেন।[১]
শেষ জীবন [সম্পাদনা]
ঔডারল্যাণ্ড বাংলাদেশের বাটা স্যু কোম্পানি থেকে ১৯৭৮ সালে অবসর নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ফেরত যান। ২০০১ সালের ১৮ মে তিনি নর্দার্ন অস্ট্রেলিয়ার পার্থের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।[২]
তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]
- ↑ ১.০ ১.১ ১.২ ১.৩ ১.৪ ১.৫ Bhuiyan, Kamrul Hasan (February 1999). জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা (Jonojuddher Gonojoddha). Dhaka: Ramon Publishers. পৃ: 60-63. আইএসবিএন 984-8161-75-7.
- ↑ ২.০ ২.১ ২.২ ২.৩ "Ouderland, William AS (Bir Pratik)" (PHP)। Banglapedia - The National Encyclopedia of Bangladesh। Asiatic Society of Bangladesh। http://banglapedia.search.com.bd/HT/O_0050.htm। সংগৃহীত 2007-11-04।
- ↑ মুনতাসির মামুন (২০০৯). কিশোর মুক্তিযুদ্ধকোষ. সময় প্রকাশনী.