আলাপ:জসীমউদ্দীন
| এই পাতাটি জসীমউদ্দীন-এর আলোচনার জন্য আলাপ পাতা | |||
|---|---|---|---|
|
|
||
সূচিপত্র |
[সম্পাদনা] ভুক্তি নয় কবিতা লেখায়, সেগুলো পর্যালোচনার জন্য সরিয়ে নেওয়া হলো
নক্সী কাঁথার মাঠ ( এক থেকে ছয় )
এক
[সম্পাদনা] =
বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে নদী, উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি। - রাখালী গান।
এই এক গাঁও, ওই এক গাঁও---- মধ্যে ধু ধু মাঠ, ধান কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ। এ-গাঁও, যেন ফাঁকা ফাঁকা, হেথায় হেথায় গাছ; গেঁয়ো চাষীর ঘরগুলি বেঁধে বনের কাজল কায়া, ঘরগুলিরে জড়িয়ে ধরে বাড়ায় ঘরের মায়া।
এ-গাঁও, যেন ও-গাঁর, দিকে, ও-গাঁও এ-গাঁর পানে, কতদিন যে কাটবে এমন, কেইবা তাহা জানে ! মাঝখানেতে জলীর বিলে জ্বলে কাজল-জল, বক্ষে তাহার জল-কুমুদী মেলেছে শতদল। এ-গাঁও ও-গাঁর দুধার হতে পথ দুখানি এসে, জলীর বিলের জলে তারা পদ্ম ভাসায় হেসে ! কেইবা বলে - আদ্যিকালের এই গাঁর এক চাষী, ওই গাঁর এক মেয়ের প্রেমে গলায় পরে ফাঁসী; এ-পথ দিয়ে একলা মনে চলছিল ওই গাঁয়ে, ও-গাঁর মেয়ে আসছিল সে নূপুর-পরা পয়ে!
এই খানেতে এসে পথ হারায়ে হায়, জলীর বিলে ঘুমিয়ে আছে জল – কুমুদীর গায়। কেনবা জানে হয়ত তাদেও মাল্য হতেই খসি, কাপলা-লতা মেলছে পরাগ জলের উপর বসি।
এাঠের মাঝে জলীর বিলের জোলো রঙের টিপ, জ্বলছে যেন এ-গাঁর ও-গাঁর বরিহেরি দীপ ! বুকে তাহার এ-গাঁ ও-গাঁ হরেক রঙের পাখি, মিলায় সেথা নূতন জগৎ নানান সুরে ডাকি। সন্ধ্যা হলে এ-গাঁর পাখি ও-গাঁও পানে ধায়, ও-গাঁর পাখি এ-গাঁয় আসে বনের কাজল-ছায়। এ-গাঁর লোকে নাইতে আসে, ও-গাঁর লোকও আসে জলীর বিলের জলে তারা জলের খেলায় ভাসে।
এ-গাঁও ও-গাঁও মধ্যে ত দূও - - শুধুই জলের ডাক, তবু যেন এ-গাঁয় ও-গাঁয় নাইক কোন ফাঁক। ও-গাঁর বধূ ঘট ভরিতে যে ঢেউ জলে জাগে, কখন কখন দোলা তাহার এ-গাঁয় এসে লাগে। এ-গাঁ চাষী নিঘুম রাতে বাঁশের বাশীর সুরে, ওননা গাঁয়ের মেয়ের সাথে গহন ব্যথায় ঝুরে ! এসাঁও হতে ভাটীর সুরে কাঁদে যখন গান, ও-গাঁর মেয়ে বেড়ায় ফাঁকে বাড়ায় তখন কান। এ-গাঁও ও-গাঁও মেশামেশি কেবল সুরে সুরে; অনেক কাজে এরা ওরা অনেকখানি দূরে।
এ-গাঁর লোকে দল বাঁধিয়া ও-গাঁর লোকের সনে, কাইজা ফ্যাসাদ করেছে যা জানেই জনে জনে। এ-গাঁর লোকও করতে পরখ ও-গাঁর লোকের বল, অনেক বারই লাল করেছে জলীর বিলের জল। তবুও ভাল, এ-গাঁও ও-গাঁও, আর যে সবুজ মাঠ, মাঝখানে তার ধুলায় দোলে দুখান দীঘল বাট ; দুই পাশে তার ধান-কাউনের অথই রঙের মেলা, এ-গাঁর হাওয়ায় দোলে দেখি ও-গাঁয় যাওয়ার ভেলা।
দুই
[সম্পাদনা] =
এক কালা দাতের কালি দ্যা কলম লেখি, আর এক কালা চক্ষেও মণি, যা দ্যা দৈনা দেখি,
ও কালা, ঘরে রইতে দিলি না আমারে।
মুর্শিদা গান
এই গাঁযৈর এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল, কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল ! কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া, তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া। জালি লাউয়ের ডসার মত বাহু দুখার সরু, গা খানি তার শাঙন মাসের যেমন তামাল তরু। ঊাদল-ধোয়া মেঘে কেগো মাখিয়ে দেছে তেল, বিজলী মেয়ে পিছলে পড়ে ছড়িয়ে আলোর খেল। কচি ধানের তুলতে চারা হয়ত কোনো চাষী, মুখে তাহার জড়িয়ে গেছে কতকটা তার হাসি।
কালো চোখের তারা দিয়েই সকল থরা দেখি, কালো দাতের কালি দিয়েই কতোব কোরাণ লেখি। জনম কালো, মরণ কালো, কলো ভুবনময়; চাষীদেও ওই কালো ছেলে সব করছে জয়।
সোনায় যে-জন সোনা বানায়, কিসের গরব তার, রঙ পেলে ভাই গড়তে পারি রামধণুকের হার। কালোয় যে-জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন, তারির পদ-রজের লাগি লুটায় বুন্দাবন। সোনা নহে, পিতল নহে, নহে সোনার মুখ, কালো-বরণ চাষীর ছেলে জুড়ায় যেন বুক। যে কালো তার মাঠেরি ধান, যে কালো তার গাঁও ! সেই কালোতে সিনান করি উজল তাহার গাও।
আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানী, খোলার দলে তার নিয়েই সবার টানাটানি। জারীর গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে, শাল সুনদঅ - বেত য়েন ও, সকল কাজেই লাগে। বুড়োরা কয়, ছেলে নয় ও, পাগল ( ইস্পাত ) লোহা যেন, রূপাই যমেন বাপের বেটা কেউ দেখেছে হেন ? যদিও রূপা নয়কো রূপাই, রূপার চেয়ে দামী, এক কালেতে ওরই নামে সব গাঁ হবে নামী।
তিন
[সম্পাদনা] =
চন্দনের বিন্দু বিন্দু কাজলের ফেঁটা, কালিয়া মেঘের আড়ে বিজলীর ছটা।
মুর্শিদা গান
ওই গাঁখানি কালো কালো, তারি হেলান দিয়ে, ঘরখানি যে দাঁড়িয়ে হাসে ছোনের ছানি নিয়ে; সেইখানি এক চাষীর মেয়ে নামটি তাহার সোনা, সাজু বলেই ডাকে সবে, নাম নিতে যে গোনা। লাল মোরগের পাখার মত ওড়ে তাহার শাড়ী, ভোরের হাওয়া যায় যেন গো প্রভাতী মেঘ নাড়ি। মুখখানি তার ঢলঢল ঢলেই যেত পড়ে, রাঙা ঠোঁটওে লাল বাঁধনে না রাখলে তার ধরে। ফুল ঝর-ঝর জন্তি গাছে জড়িয়ে কেবা শাড়ী, আদও করে রেখেছে আজ চাষীদেও ওই বাড়ী। যে ফুল ফোটে সোনের খেতে, ফোটে কদম গাছে, সকল ফুলের ঝলমল গা-ভরি তার নাচে। কচি কচি হাত পা সাজুর, সোনায় সোনার খেলা, তুলসী-তলায় প্রদীপ যেন জ্বলছে সাঁঝের বেলা। গাঁদাফুলের রঙ দেখেছি, আর যে চাঁপার কলি, চাষী মেয়ের রূপ দেখে আজ তাই কেবল বলি ? ওামধনুকে না দেখিলে কি-ই বা ছিল ক্ষোভ, পাটের বনের বউ-টুবাণী, নাইক দেখার লোভ। দেখেছি এই চাষীর মেয়ের সহজ গেঁয়ো রূপ, তুলসী-ফুলের মঞ্জরী কি দেব-দেউলের ধূপ ! দু-একখানা গয়না গায়না গায়ে, সোনার দেবালয়ে, জ্বলছে সোনার পঞ্চ প্রদীপ কার বা পূজা বয়ে! পড়শীরা কয়---- মেয়ে ত নয়, হলদে পাখির ছা, ডানা পেলেই পালিয়ে যেত ছেড়ে তাদেও গাঁ।
এমন মেয়ে --- বাবা ত নইে , কেবল আছেন মা, গাঁওবাসীরা তাই বলে তায় কম জানিত না। তাহার মতন চেকন ’ নেওই’ কে কাটিতে পাওে, নক্শী করা ’ পাকন পিঠায় ’ সবাই তাওে হারে। হাঁড়ির উপর চিত্র করা শিকেয় তোলা ফুল, এই গাঁয়েতে তাহার মত নাইক সমতুল। ডবযৈর গানে ওরই সুরে সবারই সুর কাঁদে, ” সাজু গাঁয়ের লক্ষী মেয়ে ”--- বলে কি লোকে সাধে ?
চার
[সম্পাদনা] =
কানা দেযারে, তই না আমার ভাই, আরো ফুটিক ডলক(বৃষ্টি) দে, চিনার ভাত খাই।
মেঘরাজার গান।
চৈত্র গেল ভীষণ খরায়, বোশেখ রোদ ফাটে, এক ফোঁটা জল মেঘ চোঁয়ায়ে নামল না গাঁর বাটে। ডোলের বেছন(বিজ) ডোলে চাষীর, বয় না গরু হালে, লাঙল জোয়াল ধুলায় লুটায় মরজা ধরে ফালে। কাঠ-ফাটা রোদ মাঠ বাটা বাট আগুন লযে খেলে, বাউকুড়াণী(ঘূর্ণিবায়ু) উড়ছে তারি ঘূর্ণী ধূলি মেলে। মাঠখানি আজ শূনো খাঁ খাঁ, পথ যেতে দম আঁটে,
জন্ মানবের নাইক সাড়া কোথাও মাঠের বাটে; শুকনো চেলা কাঠের মত শুকনো জাহান্নামের খোলা। দরগা তলা দুগ্ধে ভাসে, সিন্নী আসে ভারে; নৈলা গানের ঝষ্কারে গাঁ কানছে বাওে বারে তবুও গাঁয়ে নামলা না জল গগলখা ফাঁকা; নিঠুর ণীলের বক্ষে আগুন করছে যেন খাঁ খাঁ।
উচ্চে ডাকে বাজপক্ষি আজরাইলে’র ডাক. খর-দরজাল আসছে বুঝি শিঙায় দিযে হাঁক !
এমন সময় ওই গাঁ হতে বদনা – বিয়ের গানে, গুটি কয়েক আস্ল মেয়ে এই না গাঁয়ের পানে। আগে পিছে পাঁচটি মেয়ে পাঁচটি রঙে ফুল, মাঝের মেয়ে সোনার বরণ, নাই কোথা তার তুল। মাথায় তাহার কুলোর উপর বদনা ভরা জল, তেল হলুদে কানায় কানায় করছে ছলৎ ছল। মেয়ের দলে বেড়িয়ে তাওে চিকন সুরের গানে, গাঁয়ের পথে যায় যে বলে বদনা-বিয়ের মানে। ছেলের দলে পড়ল সাড়া, বউরা মিঠে হাসে, বদনা-বিয়ের গান শুনিতে সবাই ছুটে আসে। পাঁচটি মেয়ের মাঝের মেয়ে লাজে যে যায় মরি, বদনা হতে ছলৎ ছলৎ জল যেতে চায় পড়ি। এ-বাড়ি যায় ও-বাড়ি যায়, গানে মুখর গাঁ, ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে যেন রাম-শালিকের ছা।
কালো মেঘা নামো নামো, ফুল-তোলা মেঘ নামো, ধুলট মেঘা, তুলট মেঘা, তোমরা সবে ঘামো! কানা মেঘা, টলমল বারো মেঘার ভাই, আরও ফুটিক ডলক দিলে চিনার ভাত খাই! কাজল মেঘা নামো নামো চোখের কাজল দিয়া, তোমার ভালে টিপ আঁকিব মোদের হলে বিয়া ! আড়িয়া মেঘা, হাড়িয়া মেঘা, কুড়িয়া মেঘার নাতি, নাকের নোলক বেচিয়া দিব তোমার মাথার ছাতি। কৌটা ভরা সিঁদুর দিব, সিঁদুর মেঘের গায়, আজকে যেন দেয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায়!
দেয়াওে তুমি অধরে অধরে নামো। দেয়ারে তুমি নিষালে নিষালে নামো। ঘরের লাঙল ঘওে রইল, হাইল চাষা রইদি মইল; দেয়াওে তুমি অরিশাল বদনে ঢালি পড়। ঘরের গরু ঘওে রইল, ডোলের বেছন ডোলে রইল; দেয়ারে তুমি অধরে অধরে নামো। বারো মেঘের নামে নামে এমনি ডাকি ডাকি, বাড়ি বাড়ি চল্ল তারা মাঙন হাঁকি হাঁকি। কেফবা দিল এক পোয়া চাল, কেফবা ছটক খানি, কেউ দিল নুন, কেউ দিল ডাল, কেফবা দিল আনি। এমনি ভাবে সবার ঘওে মাঙন করি সারা, রূপাই মিঞার রুশাই-ঘরের সামনে এল তারা। রূপাই ছিল ঘর বাঁধিতে, পিছন ফিওে চায়, পাঁচটি মেয়ের রূপ বুঝি ওই একটি মেয়ের গাঁ! পাঁচটি মেয়ে, গান যে গায়, গানের মতই লাগে, একটি মেয়ের সুর ত নয় ও বাঁশী বাজায় আগে। ওই মেয়েটির গঠন-গাঠন চলন-চালন ভালো, পাঁচটি মেয়ের রূপ হয়েছে ওরির রূপে আলো।
রূপাইর মা দিলেন এনে সেরেক খানেক ধান, রূপাই বলে, ’ এই দিলে মা থাকবে না আর মান’। ঘর হতে সে এনে দিল সেরেক পাঁচেক চাল, সেরেক খানেক দিল মেপে সোনা মুগের ডাল। মাঙন সেরে মেয়ের দল চলল এখন বাড়ি, মাঝের মেয়ের মাথার বোঝ লাগছে যেন ভারি। বোঝার ভাওে চলতে নারে, পিছন ফিরে চায়; রূপার দুচোখ বিঁধিল গিয়ে সোনার চোখে হায়।
পাঁচ
[সম্পাদনা] =
লাজ রক্ত হইল কন্যার পরথম যৈবন - ময়মনসিংহ গীতিকা
আশ্বিনেতে ঝড় হাঁকিল, বাও ডাকিল জোওে, গ্রামভরা-ভর ছুটল ঝাপট লটপটা সব করে। রূপার বাড়ির রুশাই-ঘওে ছুটল চালের ছানি, গোয়াল ঘরের খাম থুয়ে তার চাল যে নিল টানি।
ওগাঁর বাঁশ দশটা টাকায়, সে গাঁয় টাকায় তেরো, মধ্যে আছে জলীর বিল কিইবা তাহে গেরো। বাঁশ কাটিতে চলল রূপাই কোঁচায় বেঁধে চিড়া, দুপুর বেলায় খায় যেন সে --- মায় দিয়াছে কিরা। মাজায় গোঁজা রাম-কাটারী চকচকাচক ধার, কাঁধে রঙিন গামছাখানি দুলছে যনে হার।
মোল্লা-বাড়ির বাঁশ ভাল, তার ফাঁপুগুলি নয় বড়; খাঁ-বাড়ির বাঁশ ঢোলা ঢোলা, করছে কড়মড়। সর্ব্বশেষে পছন্দ হয় শেখের বাড়ির বাঁশ; ফাঁপাগুলি তার কাঠের মত, চেকন চেকন আঁশ। বাঁশ কাটিতে যেয়ে রূপাই মারল বাঁশে দা, তল দিয়ে যায় কাদেও মেয়ে – হলদে পাখির ছা! বাঁশ কাটিতে বাঁশের আগায় লাগল বাঁশের বাড়ি, চাষী মেয়ের রূপ দেখে তার প্রাণ বুঝি যায় ছাড়ি। লম্বা বাঁশের লম্বা যে ফাঁপ, আগায় বসে টিয়া, চাষীদেও ওই সোনার মেয়ে কে করিবে বিয়া! বাঁশ কাটিতে এসে রূপাই কাটল বুকের চাম, বাঁশের গায়ে বসে রূপাই ভুলল নিজের কাম। ওই মেয়ে ত তাদের গাঁয়ে বদনা-বিয়ের গানে, নিয়েছিল প্রাণ কেড়ে তার চিকন সুরের দানে।
খড়ি কুড়াও সোনার মেয়ে! শুকনো গাছের ডাল, শুকনো আমার প্রাণ নিয়ে যাও, দিও আখার জ্বাল। শুকনো খড়ি কুড়াও মেয়ে! কোমল হাতে লাগে, তোমার যারা পাঠায় বনে বোঝেনি কেন আগে? এমনিতর কত কথাই উঠে রূপার মনে, লজ্জাতে সে হয় যে রঙিন পাছে বা কেউ শোনে। মেয়েটিও ডাগর চোখে চেয়ে তাহার পানে, কি কথা সে ভাবল মনে সইে জানে তার মানে!
এমন সময় পিছন হতে তাহার মায়ে ডাকে, ’ওলো সাজু ! আয় দেখি তোর নথ বেঁধে দেই নাকে! ওমা! ও কে বেগান মানুষ বসে বাঁশের ঝাড়ে! মাথায় দিয়ে ঘোমটা টানি দেখছে বারে বারে। খানকি পওে ঘোমটা খুলে হাসিয়া এক গাল, বলল, ও কে, রূপাই নাকি? বাঁচবি বহু কাল ! আমি যে তোর হইরে খালা, জানিসনে তুই বুঝি? মোল্লা-বাড়ির বড়রে তোর মার কাছে নসি খুঁজি। তোর মা আমার খেলার দোসর- যাকগে ওসব কথা, এই দুপুরে বাঁশ কাটিয়া খাবি এখন কোথা?
রূপাই বলে, মা দিয়েছেন কোঁচায় বেঁধে চিঁড়া ওমা! ও তুই বলিস কিওে ? মুখখানা তোর ফিরা! আমি হেথা থাকতে খালা, তুই থাকবি ভুখে শুনলে পরে তোর মা মোরে দুষবে কত রুখে! ও সাজু , তুই বড় মোরগ ধরগে যেয়ে বাড়ি, ওই গাঁ হতে আমি এদিক দুধ আনি এক হাঁড়ি।
চলল সাজু বাড়ির দিকে, মা গেল ওই পাড়া। বাঁশ কাটিতে রূপাই এদিক মারল বাঁশে নাড়া। বাঁশ কাটিতে রূপার বুকে ফেটে বেরোয় গান, নলী বাঁশের বাঁশীতে কে মারছে যেন টান, বেছে বেছে কাটল রূপাই ওড়া-বাঁশের গোড়া, তল্লা-বাঁশের কাটল আগা, কালধোয়ানির জোড়া; বালকে কাটে আলকে কাটে কঞ্চি কাটে শত, ওদিক বসে রূপার খালা রান্ধে মনের মত। সাজু ডাকে তলা থেকে, ” রূপাই-ভাইগো এসো” -এই কথাটি বলতে তাহার লজ্জারো নাই শেষও ! লাজের ভাওে হয়তো মেয়ে যেতেই পাওে পড়ে, রূপাই ভাবে হাত দুখানি হঠাৎ যেয়ে ধরে। যাহোক রূপাই বাঁশ কাটিয়া এল খালার বাড়ি, বসতে তারে দিলেন খালা শীতল পাটি পাড়ি। বদনা ভরা জল দিয়ে আর খড়ম দিল মেলে, পাও দুখানি ধুয়ে রূপাই বসল রামে হেলে। খেতে খেতে রূপাই কেবল খালার তারিফ কওে, অনেক দিনই এমন ছালুন” খাইনি কারো ঘরে। খালায় বলে আমি ত নয় রেঁধেছে তোর বোনে, লাজে সাজুর ইচ্ছা করে লুকায় লুকায় আঁচল-কোণে। এমনি নানা কথায় রূপার আহার হল সারা, সন্ধ্যা বেলায় চলল্ ঘওে মাথায় বাঁশের ভারা।
খালার বাড়ি এত খাওয়া, তবুও তার মুখ, দেখলে মনে হয় যে সেথা অনেক লেখা দৃখ। ঘরে যখন ফিরল রূপা লাগল তাহার মনে, কি যেন তার হায়েছে আজ বাঁশ কাটিতে বনে, মা বলিল, বাছারে, কেন মলিন মুখে চাও? রূপাই কহে, বাঁশ কাটিতে হারিয়ে এলেম দাও।
ছয়
[সম্পাদনা] =
ও তুই ঘরে রইতে দিলি না আমারে। -- রাখালী গান।
ঘরেতে রূপার মন টেকে না যে. তরলা বাঁশীর পারা, কোন বাতাসেতে ভেসে যেতে চায় হইয়া আপন হারা। কে যেন তাহার মনের তরীরে ভাটির করুণ তাণে, ভাটিয়াল সোঁতে ভাসাইয়া নেয় কোন সে ভাটার পানে। সেই চিরকালে গান আজও গাহে, সুরখানি তার ধরি, বিগানা গাঁয়ের বিরহিয়া মেয়ে বেয়ে আসে যেন তরী! আপনার গানে আপনার প্রাণ ছিঁড়িয়া যাইতে চায়, তবু সেই ব্যতা ভাল লাগে যেন, একই গান পুনঃ গায়। খেত -খামারে মন বসেনাকো ; কাজে কামে নাই ছিরি, মনের তাহার কি যে হল আজ ভাবে তাই ফিরি ফিরি। গানের আসরে যায় না রূপাই সাথীরা আবাক মানে, সারাদিন বসি কি যে ভাবে তার অর্থ সে নিজে জানে! সময়ের খাওয়া অসময়ে খায়, উপোসীও কভু থাকে, "দিন দিন তোর কি হল রূপাই " বার বার মায় ডাকে। গেলে কোনখানে হয়ত সেথাই কেটে যায় সারাদিন, বসিলে উঠেনা উঠিলে বসেনা, ভেবে ভেবে তনু ক্ষীণ। সবে হাটে যায় পথ বারাবর রূপা যায় ঘুরে বাঁকা, খালার বাড়ির কাছ দিয়া পথ, বাঁশ-পাতা দিয়ে ঢাকা। পায়ে-পায় ছাই বাঁশ-পাতাগুলে মচ্ মচ্ করে বাজে; কেউ সাথে নেই, তবু যে রূপাই মরে যায় লাজে। চোরের মতন পথে যেতে যেতে এদিক ওদিক চায়, যদিবা হঠৎ সেই মেয়েটির দুটি চোখে চোখ যায়। ফিরিবার পথে খালার বাড়ির নিকটে আসিয়া তার, কত কাজ পড়ে, কি করে রূপাই দেরি না করিয়া আর।
কোন দিন কহে; " খালামা, তোমার জ্বর নাকি হইয়াছে, ও-বাড়ির ওই কানাই আজিকে বলেছে আমার কাছে। বাজার হইতে আনিয়াছি তাই আধসেরখানি গজা; " " বালাই! বালাই ! জ্বর হবে বেন? রূপাই করিলি মজা; জ্বর হলে কিরে গজা খায় কেহ? " হেসে কয় তার খালা, "" গজা খায়নাক, যা হোক এখন কিনে ত হইল জ্বালা; আচ্ছা না হয় সাজুই খাইবে।"" ঠেকে ঠেকে রূপাই কহে, সাজু যে তখন লাজে মরে যায়, মাথা নীচু করে রহে।
কোন দিন কহে, "" সাজু কই ওরে, শোনো কিবা মজা, খালা! আজকের হাটে কুগায়ে পেয়েছি দুগাছি পুঁতির মালা; নিলে কিবা ক্ষাতি , এই ভেবে আমি হাত পেতে লইলাম। এখন ভাবছি, এসব লইয়া কিবা হবে মোর কাজ, ঘরেতে থাকিলে ছোট বোনটি সে ইহাতে করিত সাজ। সাজু ত আমার বোনেরই মতন, তারেই না দিয়ে যাই, ঘরে ফিরে যেতে একটু ঘুরিয়া এ-পথে আইনু তাই""।
এমনি কারিয়া দিনে দিন যেতে দুইটি অরুন হিয়া, এ উহারে নিল বরণ করিয়া বিনে-সূতী মালা দিয়া। এর প্রাণ হতে ওর প্রাণে যেয়ে লাগিল কিসের ঢেউ, বিভোল কুমার, বিভোল কুমারী, তারা বুঝিল না কেউ। -তারা বুঝল না, পাড়ার লোকেরা বুঝিল আনেকখানি, এখঅনে ওখানে ছেলে বুড়ো মিলে শুরু হল কানাকানি।
সেদিন রূপাই হাট-ফেরা পথে আসিল খালার বাড়ি, খালা তার আজ কথা কয়নাক, মুখখানি যেন হাঁড়ি। " রূপা ভাই এলে ? " এই বলে সাজু কাছে আসিল তাই, মায়া কয়, " ওরে ধাড়ী মেয়ে, তোর লজ্জা শরম নাই ?" চুল ধরে তারে গুড়ুম গুড়ুম মারিল দু'তিন কিল, বুঝিল রূপাই এই পথে কোন হইয়াছে গরমিল।
মাথার বোঝাটি না-নামায়ে রূপা যেতেছিল পথ ধরি, সাজুর মায়ে যে ডাকিল তাহারে হাতের ইশারা করি: " শোন বাছা কই, লোকের মুখেতে এমন তেমন শুনি, ঘরে আছে মোর বাড়ন্ত মেয়ে জ্বনন্ত এ আগুনি। তুমি বাপু আর এ-বাড়ি এসোনা। খালা বলে রোষে বোষে " কে কি বলে ? তার ঘাড় ভেঙ্গে-দেব! রূপা কহে মদ কসে। "ও-সবে আমার কাজ নাই বাপু, সোজা কথা ভালবাসি, সারা গাঁয়ে আজ ঢি ঢি পড়ে গেছে, মেয়ে হল কুল-নাশী।
সাজু মায়ের কথাগুলি যেন বঁগশীর মত বাঁকা, ঘুরিয়া ঘুরিয়া মনে দিয়ে যায় তীব্র বিষের ধাকা। কে যেন বাঁশের জোড়-কঞ্ঝিতে তাহার কোমল পিঠে, মহারোষ-ভরে সপাং সপাং বাগি দিলে গিঠে গিঠে। টলিতে টলিতে চলিল রূপাই একা গাঁর পথ ধরি, সম্মুখ হতে জোনাকীর আলো দুই পাশে যায় সারি। রাতের আঁধার গলি ভরা বিষে জমাট নেঁধেছে বুঝি, দুই হাতে তাহা ঠেলিয়া ঠেলিয়া চলে রূপা পথ খুঁজি। মাথার ধামায় এখনও রয়েছে দুজোড়া রেশমী চুড়ি, দুপায়ে তাহারে দলিয়া রূপাই ভাঙ্গিয়া করিল গুঁড়ি। হাটের সদাই জলীর বিলেতে দুহাতে ছুঁড়িয়া ফেলি, পথ থয়ে রূপা বেপথে চলিল, ইটা খেতে পাও মেলি। চলিয়া চলিয়া মধ্য মাঠেরতে বসিয়া কাঁদিল কত, আষ্টমী চাঁদ হেলিয়া হেলিয়া ওপারে হইল গত।
প্রভাতে রূপাই উঠিল যখন মায়ের বিছানা হতে, চেহারা তাহার আধা হয়ে গেছে চেনা যায় কোন মতে। মা বলে, " রূপাই কি হলরে তোর ? " রূপাই কহে না কথা দুখিনী মায়ের পরাণে আজিকে উঠিল দ্বিগুন ব্যথা। সাত নয় মার পাঁচ নয় এক রূপাই নয়ন তারা, এমনি তাহার দশা দেখে মায় ভাবিয়া হইল সারা। শানাল* পীরের সিন্নি মানিল খেতে দিল পড়া পানি. দেহের দৈন্য দেখিল জজনী, দেখিল না প্রাণখানি। সারা গায়ে মাতা হাত বুলাইল চোখে-মুখে দিল জল, বুঝিল না মাতা বুকের ব্যথঅর বাড়ে যে ইহাতে বল।
আজকে রূপার সকলি আঁকার, বাড়া-ভাতে ওড়ে ছাই, বলন্ক কথা সবে জানিয়াছে, কেহ বুঝি বাকি নাই। জেনেছে আকাশ: জেনেছে বাতাস, জেনেছে বনের তরু: উদাস-দৃষ্টা যত দিকে চাহে যেন শূন্যো মরু। চারিদিক হতে উঠিতেছে সুর, ধিক্কার! ধিক্কার!! শাঁখের করাত কাটিতেছে তারে লয়ে কলন্ক ধার। ব্যথায় ব্যথায় দিন কেটে গেল, আসিল ব্যথার সাঁজ, পূবে কলন্কী কালো রাত এল, চরণে ঝিঁঝির ঝাঁজ! অনেক সুখের দুখের সাক্ষী বাঁশের বাঁশীটি নিয়ে, বসিল রূপাই বাগির সামনে মাঠেতে গিয়ে।
মাঠের রাখাল, বেদনা তাহার আমার কি অত বুঝি? মিছেই মোদের সুখ-দুখ দিয়ে তার সুখ-দুখ খঁজি। আমাদের ব্যথা কেতাবেতে লেখা, পড়িলেই বোঝা যায়: যে লেখে বেদনা বে-বুঝ বাঁশীতে কেমন দেখাব তায়? অন্তকাল যাদের বেদনা রহিয়াছে শুধূ বুকে, এ দেশের কবি রাখে নাই যাহা মুখের ভাষায় টুকে; সে ব্যথাকে আমি কেমনে জানাব? তবুও মাটিতে কান; পেতে রহি যদি কভু শোনা যায় কি কহে মাটির প্রাণ! মোরা জানি খোঁজ বৃন্দাবনতে ভগবান করে খেলা, রাজা-বাদশার সুখ-দুখ দিয়ে গড়েছি কথায় মেলা। পল্লীর কোলে নির্ব্বাসিত এ ভাইবোনগুলো হায়, যাহাদের কথা আধ বোঝা যায়, আধ নাহি বোঝা যায়; তাহাদেই এক বিরহিয়া বুকে কি ব্যথা দিয়েছে দোল, কি করিয়া আমি দেখাইব তাহা, কোথা পাব সেই বোল? - সে বন-বিহগ কাঁদিতে জানে না, বেদনার খাষা নাই, ব্যাধের শায়ক বুকে বিঁধিয়াছে জানে তার বেদনাই।
বাজায় রূপাই বাঁশীটি বাজায় মনের মতন করে, যে ব্যথা বুকে ধরিতে পারেনি সে বাঁশীতে ঝরে। 'আমি কেনে বা পিরীতিরে করলাম। ( আমার ভাবতে জনম গেলরে, আমার কানতে জনম গেলরে ) সে ত সীন্তার সিন্দুর নয় তারে আমি কপালে পরিব, সে ত ধান নয় চাইল নয় তারে আমি ডোলেতে ভরিবরে, আমি কেনে বা পিরীতিরে করলাম। আগে যাদি জানতাম আমি প্রেমের এত জ্বলা, ঘর করতাম কদম্বতলা, রহিতাম একেলারে; আমি কেন বা পিরীতিরে করলাম। '
মুর্শিদা গান।
বাজে বাঁশী বাজে, তারি সাথে সাথে দুলিছে সাঁজের আলো; নাচের তালে তালে জোনাকীর হারে কালো মেঘের রাত-কালো। বাজাইল বাঁশী ভাটিয়ালী সুরে বাজাল উদাস সুরে, সুর হতে সুর ব্যথা তার যেন চলে যায় কোন দূরে! আপনার ভাবে বিভোল পরাণ, অনন্ত মেঘে-লোকে, বাঁশীর হতে সুর ভেসে যায় যেন, দেখে রূপা দুই চোখে। সেই সুর বেয়ে জলছে তরুণী, আইলা মাথার চুল, শিথিল দুখান বাহু বাড়াইয়া ছিঁড়িছে মালার ফূল। কখনও সে মেয়ে আগে আগে চলে, কখনও বা পাছে চলে। খালিক চলিয়া থামিল তরূণী আঁচলে ঢাকিয়া চোখ, মুছিতে মুছিতে পারে না, কি যেন অসহ শোক! করুণ তাহার করুণ কান্না আকাশ ছাইয়া যায়, আইপি 94.96.235.139 থেকে এই সম্পাদনাটি হয়েছিলো। এগুলো সরাসরি কবিতা। ভুক্তির পর্যায়ে পড়ে না।
কি যেন মোহের রঙ ভাসে মেঘে তহার বেদন- ঘায়।
পুনরায় যেন খিলখিল করে একগাল হাসি হাসে, তারি ঢেউ লাগি গগনে গগনে তাড়িতের রেখা ভাসে। কখনও আকাশ ভীষণ আঁধার, সব গ্রাসিয়াছে রাহু, মহা শূন্যের মাঝে ভেসে উছে যেন দুই খানি বাহু! দোলে-দোলে বাহু তারি সাথে যেন দোলে - দোলে কত কথা, " ঘরে ফিরে যাও মোর তরে তুমি সহিও না আর ব্যথা ।" মুহূর্ত্ত পরে সেই বাহু যেন শূন্যে মিলায় হায়--- রামধনু বেয়ে কে আসে ও মেয়ে, দেখে যেন চেনা যায়ং হাসি হাসি মুখ গলিয়া গলিয়া হাসি যায় যেন পড়ে, সারা গায়ে তার রূপ ধরেনাক, পড়িছে আঁচল ঝরে। কন্ঠে তাহার মালার গন্ধে বাতাস পাগল পারা, পায়ে রিরি ঝিনি সোনার নূপুর বাজিয়া হইছে সারা;
হঠাৎ কে এলো ভীষণ দস্যু - ধরি তার চুল মুঠি, কোন আন্ধার গ্রহপথ বেয়ে শূন্যে সে গেল উঠ। বাঁশী ফেলে দিয়ে ডাক ছেড়ে রূপা আকাশের পানে চায়, আধা চাঁদখানি পড়িছে হেলিয়া সাজুদের ওই গাঁয়। শুনো মাঠে রূপা গড়াগড়ি যায়, সরা গায়ে ধূলো মাখে, দেহেলে ফাহিছে ধূলৈা মাটি দিয়ে, ব্যথঅরে কি দিয়ে ঢাকে।
শানাল= পূর্ব বঙ্গের বিখ্যাত পীর শাহলাল
[সম্পাদনা] দৃষ্টিগোচর
জসীম উদ্দীন নামকরণেই পল্লীকবি পরিচিত হয়ে আছেন। সুতরাং, রিডাইরেক্ট করা প্রয়োজন। বর্তমান নামকরণ জসীমউদ্দীন ভুল হিসেবে রয়েছে। ধন্যবাদ সহযোগে - সুব্রত রায় (আলাপ) ১৭:০৫, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২ (ইউটিসি)