আলভিন রবার্ট কর্ণেলিয়াস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আলভিন রবার্ট কর্ণেলিয়াস
الوین رابرٹ كورنيليس
পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি
কার্যালয়ে
১৩ মে, ১৯৬০ – ২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৮
নিয়োগকারী আইয়ুব খান
পূর্বসূরী মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন
উত্তরসূরী শেখ আব্দুর রহমান
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড-এর প্রধান
কার্যালয়ে
১৬ সেপ্টেমবার, ১৯৬০ – ১৪ মে, ১৯৬৩
রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান
পূর্বসূরী আইয়ুব খান
উত্তরসূরী মোজাফর হোসাইন
কার্যালয়ে
৬ মার্চ, ১৯৪৯ – ১৮ মে, ১৯৫৩
রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান
পূর্বসূরী ইফতেখার খান
উত্তরসূরী আব্দুস সাত্তার পীরজাদা
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম ৮ মে, ১৯০৩
আগ্রা, ব্রিটিশ ভারত
(বর্তমান ভারত)
মৃত্যু ২১ ডিসেম্বর, ১৯৯১
লাহোর, পাকিস্তান
অধ্যয়নকৃত শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান
এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়
সেলুইন কলেজ
পুরস্কার হিলাল-ই-পাকিস্তান

আলভিন ববি রবার্ট কর্ণেলিয়াস, এইচপিকে (জন্ম: ৮ মে, ১৯০৩ - মৃত্যু: ২১ ডিসেম্বর ১৯৯১) পাকিস্তানের চতুর্থ প্রধান বিচারপতি ও আইনজ্ঞ ছিলেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্ণেলিয়াস ব্রিটিশ ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রা শহরের এক উর্দ্দুভাষী খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের এলাহবাদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংল্যান্ডের সেলুইন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ভারত সিভিল সার্ভিস এ যোগ দেন এবং পাঞ্জাব প্রদেশে অ্যাসিস্টেন কমিশনার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৩ সালে কর্ণেলিয়াস লাহোর হাইকোর্টে কর্মজীবন শুরু করেন। কিছুদিন পরে পাঞ্জাব সরকারের বিচার বিভাগে যোগ দেন। এসময়ে তিনি লিগ্যাল ইতিহাস এর ওপর গুরুত্বপূর্ণ বই লিখে একজন আইনজ্ঞ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। ভারতীয় উপসহাদেশে মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য লক্ষ করে কর্ণেলিয়াস "পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন। একই সাথে "জাতীয়তাবাদী” চেতনার জাগরণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৬ সালে কর্ণেলিয়াস লাহোর হাইকোর্টের সহযোগী বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং পাকিস্তানের নাগরিকত্বের সুযোগ নেন। তিনি ক্রমে দেশের আইনের জগতে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব পরিণত হন। প্রথমদিকে তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসাবে আইন মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সাথে কাজ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য মামলাগুলো: অমুসলিম জনগোষ্ঠির অধিকার (ধর্মের স্বাধীনতা), বগুড়া কেস- রাষ্ট্রপতির সংরক্ষিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে ( পাকিস্তানের তৎকালীন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর ৫৮(২)বি অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য), কর্মস্থল ও শ্রম আইন সংক্রান্ত, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এর স্পোর্টস ল' সংক্রান্ত। বিচারক হিসাবে শ্রদ্ধাভাজন কর্ণেলিয়াস ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। একটি মামলায় তিনি পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন :"A general feeling of [great] despair, a widespread of [self] confidence... and common readiness in the anticipate the worst".

১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বিচারপতি কর্ণেলিয়াসকে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মনোনীত করেন। পাকিস্তানের প্রথম খ্রিষ্টান প্রধান বিচারপতি হিসাবে তিনি ছিলেন খ্যাতিমান প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। অবসর গ্রহণের পরেও কর্ণেলিয়াস সংখ্যালঘূ সম্প্রদায়ের অধিকার সংরক্ষণের, ধর্মপালনের স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন। তিনি ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তানের কয়েকটি সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসাবেও কাজ করেছেন। পাকিস্তানের আইনজ্ঞগণ তাঁর মতামতগুলো সর্ম্পকে মন্তব্য করেন যে, the greatest defences of "freedom of religion" written by a Christian Chief Justice of a Muslim state.

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

আলভিন রবার্ট কর্ণেলিয়াস ৮ মে ১৯০৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের উত্তর ভারতের আগ্রা শহরে উর্দ্দূ ভাষী অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অধ্যাপক আই.জে, কর্ণেলিয়াস এবং মাতা তারা ডি' রোজারিও ভারতের রোমান ক্যাথেলিক সম্প্রদায়ে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর পিতা ইন্দোর কলেজে গণিতের অধ্যাপক ছিলেন। কর্ণেলিয়াস বেড়ে ওঠেন ধর্মনিরেপক্ষ আবহে উর্দ্দূ ভাষী মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আইনজীবী ইব্রাহিম ইসমাইল চূন্দ্রীগড়। তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে বি.এসসি, দেওয়ানি আইনে এলএল.বি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৪ সালে আইন অধ্যয়নের সময় কর্ণেলিয়াস ধর্মীয় আইনের ইতিহাসের ওপর অভিসন্দর্ভ রচনা করেন।

কর্ণেলিয়াস এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে গবেষণা সহযোগী হিসাবে যোগ দেন। একই সাথে সে বছরেই তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে বৃটেন যান। কেম্ব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুইন কলেজে আইনে ভর্ত্তি হন। ১৯২৬ সালে তিনি আইন ও বিচার বিষয়ে এলএল.এম ডিগ্রি লাভ করেন। এবার তাঁর মৌলিক থিসিস এর বিষয়বস্তু ছিল পশ্চিমী আইন। অনিচ্ছা সত্বেও দেশে ফিরে আসেন এবং ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস ভুক্তি পরীক্ষা দিয়ে পাঞ্জাব সরকারের বিচার বিভাগে যোগ দেন।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

তিনি ১৯২৬ সালে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে পাঞ্জাব প্রদেশে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত সহকারী কমিশনার এবং জেলা ও দায়রা জজ হিসাবে কাজ করেন। ১৯৪৩ পাঞ্জাব সরকারের আইন বিভাগের লিগ্যাল রিমেম্বারেন্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে কর্ণেলিয়াস বিচারপতি হিসেবে লাহোর হাইকোর্টে যোগ দেন।

পাকিস্তান আন্দোলনে অবদান[সম্পাদনা]

পাকিস্তান আন্দোলনে কর্ণেলিয়াস ছিলেন অন্যতম খ্রিষ্টান ব্যক্তিত্ব। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি উচ্চকন্ঠে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলতেন। ঠিক যেমনি প্রখ্যাত মুসলিম নেতা মৌলানা আজাদ ভারত বিভাগের বিরোধীতা করতেন। কর্ণেলিয়াস মনে করতেন ভারতে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমিই ব্রিটিশ সরকারের মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের উত্তম সমাধান। একই সাথে তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনাকেও পুনঃজাগরণে সোচ্চার ছিলেন। কর্ণেলিয়াস পাকিস্তান প্রস্তাব প্রনয়ণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে সাহায্য করেছিলেন। এতে তিনি ১৯৪১ সালে কংগ্রেস পার্টি কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়, অমুসলিম ও নীচু শ্রেণীর জনগণের প্রতি অসদাচরণের ব্যাখ্যা করে তাদের অধিকার সম্বলিত অনুচ্ছেদ যুক্ত করেন। তার তৎপরতায় পাঞ্জাব সরকারে একটি শক্তিশালী ও গভীর আইনগত অবস্থানে নিয়ে যায়। নবসৃষ্ট দেশে তিনি একটি আদালত ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। কর্ণেলিয়াস ছিলেন নতুন পাকিস্তানের প্রথমদিকের নাগরিক। লিয়াকত আলী খানের কেন্দ্রীয় সরকারে অধীনে তিনি চাকুরি গ্রহণ করেন।

পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট[সম্পাদনা]

কর্ণেলিয়াস ১৯৫০- ১৯৫১ মেয়াদে আইন ও শ্রম মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় আইন মন্ত্রী ছিলেন যোগেন্দ্ররাথ মন্ডল। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হলে কর্ণেলিয়াস সরকারী চাকুরি ছেড়ে দেন এবং ১৯৫১ সালের নভেম্বর পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টের সহযোগী বিচারক হিসেবে যোগ দেন। নিয়মিত বিরতি দিয়ে তিনি ১৯৫৩ সালে স্থায়ী বিচারক হিসাবে মনোনীত হন।

পাকিস্তানের প্রধানবিচারপতি[সম্পাদনা]

১৯৬০ সালে বিচারপতি এ আর কর্ণেলিয়াস পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। তিনি বিচারপতি মুহাম্মদ সাহাবউদ্দিনের স্থলবর্তী হন। ১৯৬৮ সালে তিনি অবসরে যান এবং বিচারপতি শেখ আবদুর রহমান পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন।

আইন দর্শন[সম্পাদনা]

পিসিসিবি সভাপতি[সম্পাদনা]

কর্ণেলিয়াস লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ভারত বিভাজনের পর তিনি পাকিস্তানের ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১ মে, ১৯৪৮ সালে ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড অব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় ও অল্পকিছুদিনের ব্যবধানে পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড বা বিসিসিপি নামধারণ করে। তৎকালীন পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (যা বর্তমানে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বা পিসিবি নামে পরিচিত) প্রথম সভাটি বাগ-ই-জিন্নাহ মাঠে অবস্থিত লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবের কমিটি কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। মহামান্য মামদোতের নবাব প্রেসিডেন্ট ও সভাপতিরূপে মনোনীত হন এবং তিনজন সহ-সভাপতির একজন হন রবার্ট কর্ণেলিয়াস। এরপরের বছর তিনি কার্যকরী কমিটির সভাপতি হন। ১৯৫৩ সালের শুরুর দিকে বোর্ডের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের পূর্ব পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। সেপ্টেম্বর, ১৯৬০ সালে এড-হক কমিটির প্রথম সভাপতি হিসেবে মে, ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলা পরিচালনা করেন। তাঁর প্রধান সাফল্য ছিল পাকিস্তান এগলেটস নামীয় অনানুষ্ঠানিক ক্লাব গঠন; যাতে উদীয়মান ক্রিকেটারদেরকে চিহ্নিত করা যায়। ১৯৫৪ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ টেস্ট খেলার উপযোগী দল গঠনের লক্ষ্যে এ দলটিকে ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ড সফরে পাঠান।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

বিচারপতি কর্ণেলিয়াস ২১ ডিসেম্বর ১৯৯১, পাকিস্তানের লাহোর শহরে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৮ বছর। তাঁকে শহরের খ্রিস্টান গোরস্তানে সমাহিত করা হয়।

রচনাবলী[সম্পাদনা]

  • Law and judiciary in Pakistan; Lahore Law Times Publications;

(1981)

  • The ethical basis for democracy in Pakistan; Hamdard National

Foundation, Pakistan; (1971)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Chief Justice Cornelius of Pakistan: An Analysis With Letters and Speeches, by Ralph Braibanti [ISBN 0-19-579018-9]
  • Judging the State: Courts and Constitutional Politics in Pakistan, by Paula R. Newberg [ISBN 0-521-89440-9]