আর্ডিপিথেকাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আর্ডিপিথেকাস
সময়গত পরিসীমা: প্লায়োসিন
Ardi.jpg
আর্ডিপিথেকাস র‍্যামিডাস-এর নমুনা, ডাকনাম আর্ডি
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: প্রাণী জগৎ
পর্ব: কর্ডাটা
শ্রেণী: স্তন্যপায়ী
বর্গ: প্রাইমেট
পরিবার: হোমিনিডি
উপপরিবার: হোমিনিনি
গোত্র: (বিতর্কিত[১] হোমিনিনি)
গণ: আর্ডিপিথেকাস
হোয়াইট প্রমুখ, ১৯৯৫
প্রজাতিসমূহ

আর্ডিপিথেকাস কাডাব্বা
আর্ডিপিথেকাস র‍্যামিডাস

আর্ডিপিথেকাস (ইংরেজি ভাষায়: Ardipithecus) দীর্ঘ বিলুপ্ত এক প্রাণীগোষ্ঠী। আর্ডিপিথেকাস একটি গণের নাম। এখন পর্যন্ত এই গণের অন্তর্ভুক্ত দুইটি প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। একটির নাম আর্ডিপিথেকাস র‍্যামিডাস (Ardipithecus ramidus) এবং অন্যটির নাম আর্ডিপিথেকাস কাডাব্বা (Ardipithecus kadabba)। র‌্যামিডাস-এর যে জীবাশ্মটি পাওয়া গেছে তার বয়স ৪৪ লক্ষ বছর হতে পারে মর্মে জীবাশ্মবিদরা প্রাক্কলন করেছেন।[২] আর কাডাব্বা-র যে জীবাশ্ম পাওয়া গেছে তার বয়স ৫৬ লক্ষ বছর বলে অনুমান করা হয়েছে। এই হিসাবে র‌্যামিডাস আদি প্লায়োসিন যুগ এবং কাডাব্বা মায়োসিন যুগের শেষ দিকে পৃথিবীতে বসবাস করতো। এর মধ্যে আর্ডিপিথেকাস র‌্যামিডাস এর পূর্ণাঙ্গ জীবাশ্ম এবং এর খাদ্য গ্রহণ, চলন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হয় ২০০৯ সালের ১লা অক্টোবর। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-র জীবাশ্ম-নৃবিজ্ঞানী টিম হোয়াইট এর নেতৃত্বে একটি দল এ প্রজাতির জীবাশ্ম অনুসন্ধান করে। এর চলন বিষয়ক তথ্যাদি নিয়ে গবেষণাপত্র রচনা করেন আরেক বিজ্ঞানী ওয়েন সি. লাভজয়। তারা সবাই মিলে এই বিষয়ে মোট ১১ টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

আর্ডিপিথেকাস র‌্যামিডাস[সম্পাদনা]

আবিষ্কারের কাহিনী[সম্পাদনা]

১৯৭৪ সালে লুসি আবিষ্কারকারী দলের একজন বিজ্ঞানী ছিলেন টিম হোয়াইট যিনি বার্কলে'র ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ায় জীবাশ্ম-নৃবিজ্ঞান গবেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইথিওপিয়া'র আফার নিম্নভূমিতে হোমিনিনি গোত্রের এত জীবাশ্ম পাওয়া গেছে যে টিম হোয়াইট রীতিমত এই জায়গাটিকেই পরবর্তী গবেষণার জন্য বেছে নেন। ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা'র অদূরে “আফার” নামে এক বিরাট নিম্নভূমিতেই লুসি থেকে শুরু করে হোমিনিনি গোত্রের সবগুলো জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। শিম্পাঞ্জি, মানুষ সবাই এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

১৯৯২ সালের ১৭ই ডিসেম্বর টিম হোয়াইটের প্রাক্তন ছাত্র Gen Suwa হঠাৎ করে আফার এর নিকটবর্তী আরামিস গ্রামের পাশে এক টুকরো হাড় দেখতে পান। দেখার সাথে সাথেই বুঝে গিয়েছিলেন এটা হোমিনিনি গোত্রেরই কোন একটি প্রজাতির জীবাশ্ম। সেই এলাকা ঘিরেই হোয়াইট দলের অনুসন্ধান শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে পাওয়া যায় একটি শিশুর নিম্ন চোয়ালের কিছু জীবাশ্ম। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে শ্রোণীচক্র, মাথার খুলি, পা এবং মুখের অনেকগুলো খণ্ডাংশ পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হল সবগুলো হাড়ের অবস্থাই ছিল শোচনীয়। তাই এগুলোর উপর ভিত্তি করে প্রকৃত গবেষণা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এ কারণেই তাৎক্ষণিকভাবে বিজ্ঞানীরা সাংবাদিক বা বিজ্ঞানীমহলকে তেমন কিছুই জানায়নি। এরই মধ্যে সর্বমোট ১১০ টিরও বেশি অস্থি খণ্ডাংশ একত্রিত করে সেগুলোর বিশুদ্ধায়ন চলেছে, তারপর শুরু হয়েছে পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল তৈরির কাজ। উল্লেখ্য, এছাড়া অন্যান্য প্রাণী বা উদ্ভিদের প্রায় ১৫০,০০০ নমুনাও যুগিয়েছে আফার-এর এই প্রত্নভূমি।

ইথিওপিয়ায় কঙ্কাল গঠনের পাশাপাশি টোকিও এবং ওহাইয়ো তেও আর্ডি গবেষণা চলেছে সমান তালে। ওহাইয়ো-তে বিজ্ঞানী সি ওয়েন লাভজয় আর্ডির ভৌত মডেল তৈরির কাজ করেছেন আর টোকিওতে Gen Suwa কম্পিউটার মডেল বানিয়েছেন। এই দুই গবেষণাকেন্দ্রেই মাঝেমাঝে কঙ্কালের বিভিন্ন অংশ পাঠানো হয়েছে সিটি স্ক্যান এবং অন্যান্য পরীক্ষার জন্য। ৯ বছরের কাজ শেষে Suwa গর্বভরে বলতে পেরেছেন, “৪৪ লক্ষ বছর আগে ইথিওপিয়া-তে ঠিক এরকম এক আর্ডিপিথেকাস র‌্যামিডাস-ই ঘুরে বেড়াতো।”

কম্পিউটার মডেলিং হয়ে যাওয়ার পর Suwa ও Asfaw সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন আর্ডির সাথে মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির সকল প্রজাতির মিল-অমিল খুঁজে বের করার জন্য। কারণ মানবেতিহাসের ঠিক কোন জায়গায় আর্ডির জায়গা হবে সেটা ডেটিং এর মাধ্যমে জানা গেলেও এর সাথে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের সব তথ্য মিলিয়ে দেখার দরকার ছিল। দেখেশুনে আপাতত এই সিদ্ধান্তেই এসেছেন যে, আর্ডি অস্ট্রালোপিথেকাস অ্যানামেনসিস এর পূর্বপুরুষ। উল্লেখ্য এর আগপর্যন্ত অ্যানামেনসিস এর জীবাশ্ম ছিল প্রাচীনতম।

মজার ব্যাপার হচ্ছে আফার নিম্নভূমির যে জায়গায় হোমিনিনি সন্ধান করা হয়েছে তার এক ইঞ্চি মাটিও আর অক্ষত নেই। বিজ্ঞানী ও পেশাদার জীবাশ্ম শিকারীরা প্রতিটা ইঞ্চি খুঁটিয়ে দেখেছেন। এক সাংবাদিক তো লিখে দিয়েছেন, “They sucked the bones out of Afar.”

আর্ডি-র বৈশিষ্ট্যসমূহ[সম্পাদনা]

শ্বদন্ত

মানুষের উপরের চোয়ালে দুটি এবং নিচের চোয়ালে দুটি তীক্ষ্ণ দাঁত আছে যেগুলোকে শ্বদন্ত বলে। শিম্পাঞ্জিরও এরকম শ্বদন্ত আছে। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে শিম্পাঞ্জিরটা মানুষের চেয়েও তীক্ষ্ণ ও ধারালো। সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের দিকে বয়ে চলা শাখার প্রজাতিগুলোতে শ্বদন্ত দিন দিন ভোঁতা হয়েছে। আর্ডির শ্বদন্ত হচ্ছে একেবারে মাঝামাঝি।

আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, মানুষের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের শ্বদন্তের আকার প্রায় একই রকম। কিন্তু এমন অনেক প্রাইমেট প্রজাতি আছে যাদের ক্ষেত্রে পুরুষের শ্বদন্ত নারীর তুলনায় অনেক বড়। এর কারণ পুরুষে-পুরুষে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার কারণ যথারীতি নারী, খাদ্য এবং জমি। বিজ্ঞানীদের মতে শিম্পাঞ্জি ও আমাদের সাধারণ পূর্বপুরুষদের ক্ষেত্রে নারীর তুলনায় পুরুষের শ্বদন্ত অনেক বড় ছিল। কিন্তু মানুষের শাখা বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর অর্থাৎ হোমিনিড-দের মাঝে শ্বদন্ত ভোঁতাকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কারণ মানুষের পূর্বপুরুষরা সন্তান বড় করার ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখতে শুরু করে। মা-কে একা ফেলে না দিয়ে বাবা-রাও সন্তান প্রতিপালনে অংশ নেয়। এ কারণে স্বভাবতই তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমে আসে আর প্রাকৃতিক নির্বাচন শ্বদন্তকে নির্বাচন করা বাদ দিয়ে দেয়। আর্ডি যখন পৃথিবীতে ছিল তখন এই বাদ দেয়ার প্রক্রিয়াটাই চলছিল।

শ্রোণীচক্র

লাভজয় ও তার দল আর্ডির শ্রোণীচক্র নিয়ে অনেক গবেষণা করে দেখেছেন এর সাথে লুসি-র বেশ ভাল মিল আছে। যেমন লুসি-র মতই আর্ডির শ্রোণীচক্র তার দেহের উর্ধ্বাংশকে বহন করতে পারে। অর্থাৎ শ্রোণীচক্রে ভর দিয়ে দুই পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম ছিল আর্ডি। কিন্তু সে খুব ভালভাবে হাঁটতে পারতো না, আর দৌঁড়াতে পারতো না বললেই চলে। এদিক থেকে সে লুসির চেয়ে ভালই পিছিয়ে। এসব দেখে মনে হয়, আর্ডির সময় থেকে মানুষের পূর্বপুরুষদের বিবর্তন ঘটেছে খুব দ্রুত, মাত্র ১০ লক্ষ বছরের মধ্যেই অস্ট্রালোপিথেকাস এর মত প্রায়-মানুষ প্রজাতির জন্ম দেয়ার জন্য যা আবশ্যক ছিল।

পায়ের পাতা ও আঙুল

আর্ডির পায়ের পাতাকে বলা যায় opposable কিন্তু rigid. অপোজেবল বলতে বোঝানো হচ্ছে, গাছে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার জন্য ডাল-পালার সাথে পায়ের ঠেক দেয়ার যে পদ্ধতি থাকা দরকার ছিল তার কিছুটা হলেও আর্ডির মাঝে আছে। পায়ের পাঁচটি আঙুলের প্রথমটি অর্থাৎ বৃদ্ধাঙ্গুলি এই ঠেক দেয়ার কাজটি করতো। কিন্তু বাকি চার আঙুলের গঠন খুব শক্ত। দেখে মনে হয় এই আঙুলগুলো মাটিতে সমান্তরালভাবে রেখে তার পক্ষে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব। আর্ডিরা এভাবেই হাটতো। একাধারে মাটিতে হাটতে এবং গাছে চড়তে সক্ষম এমন প্রজাতির সন্ধান আমরা এই প্রথম পেলাম। এরকম আরও কিছু প্রজাতির খণ্ডাংশ আগে পাওয়া গেলেও সেগুলো থেকে এত তথ্য পাওয়া সম্ভব ছিল না।

হাতের তালু ও আঙুল

আর্ডির পায়ের সাথে মানুষের পায়ের মিল বেশি হলেও হাতের সাথে বেশি মিল শিম্পাঞ্জির। শিম্পাঞ্জির মতই তার হাত খুব নমনীয় তথা ফ্লেক্সিবল যা গাছে ঝুলে থাকার জন্য আবশ্যক। আঙুল গুলো বেশ লম্বা লম্বা এবং সহজেই বাঁকানো যায়। হাত, পা এবং শ্রোণীচক্রের গড়ন থেকেই বোঝা গেছে যে আর্ডি একাধারে মাটিতে হাঁটতে পারতো এবং গাছে ঝুলতে পারতো, কিন্তু কোনটাতেই সে বিশেষ দক্ষ ছিল না। মনে হতে পারে তার জীবন ধারণ করতে এতে খুব কষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেটা তো প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিরোধী। সে সময় ইথিওপিয়ার আরামিস অঞ্চলটা কেমন ছিল তা বুঝলেই আর বিরোধ থাকে না।

আর্ডির প্রাচীন বাসস্থান[সম্পাদনা]

এ অঞ্চলে তখন বন জঙ্গল ছিল, তবে গাছগুলো খুব বড় বড় ছিল না, আর বনের মাঝে মাঝে ঘাসে ভরা ছোটখাট সমভূমিও ছিল। তাই দুটোতেই চলার চেষ্টা করাটা তার জন্য ছিল স্বাভাবিক।

এখন অবশ্য আফার অঞ্চলের সেই বন নেই। একসময় এটা হয়ত বিস্তীর্ণ সাভানায় পরিণত হয়েছিল। এখনও অনেকটা সাভানা-র মত, তবে ঘাসের পরিমাণও বেশ কমে গেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের যা অবস্থা তার সাথে কেনিয়ার Kibwezi বনভূমির তুলনা দেয়া যেতে পারে। অর্ধেক হালকা হালকা গাছ এবং মাঝে মাঝে তৃণভূমি ছিল সেখানে।

১৯৭৪ সালে লুসি আবিষ্কারের পর অনেকদিন জীবাশ্ম মহলের খুব বড় কোনো অর্জন ছিল না। এবারের অর্জন লুসি-কেও ছাড়িয়ে গেছে। মানুষের বিবর্তন কিভাবে হয়েছে তার তাত্ত্বিক ভিত্তি ইতিমধ্যে বিজ্ঞানীরা অনেকটা তৈরি করে ফেলেছেন। তবে সেটার প্রামাণ্য ভিত্তি দাঁড় করাতেও এখন কোন বাঁধা নেই। কিন্তু বিজ্ঞান চলে সংশয়ের ভিত্তিতে। যেমন, এই ১১টি গবেষণাপত্র প্রকাশের পরই জীবাশ্ম-নৃবিজ্ঞানী মহল অনেক ভাগে ভাগ হয়ে গেছেন। বিভিন্ন জন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এটা দেখছেন। মোটকথা আগামী ১৫ বছর আর্ডিকে নিয়ে মুখর থাকবে বিজ্ঞানী মহল। বাকবিতণ্ডা চলতেই থাকবে। এখনই অনেকে বলছেন, আর্ডিকে সরাসরি অস্ট্রালোপিথেকাস অ্যানামেনসিস এর পূর্বপুরুষ বলে দেয়ার সময় এখনও আসে নি। জীবাশ্মগুলো আরও পরীক্ষা করার পরই কেবল এ বিষয়ে শতকরা ৯৯ ভাগ নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব, আর বিজ্ঞানে ৯৯% নিশ্চয়তাই সর্বোচ্চ।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Stanford, Craig B. (2012)। "Chimpanzees and the Behavior ofArdipithecus ramidus*"। Annual Review of Anthropology 41: 139। ডিওআই:10.1146/annurev-anthro-092611-145724। "Is Ardipithecus a hominin?—that question will likely dominate the paleoanthropological debate over this fossil taxon for years to come." 
  2. Perlman, David (July 12, 2001)। "Fossils From Ethiopia May Be Earliest Human Ancestor"। National Geographic News। সংগৃহীত July 2009। "Another co-author is Tim D. White, a paleoanthropologist at UC-Berkeley who in 1994 discovered a pre-human fossil, named Ardipithecus ramidus, that was then the oldest known, at 4.4 million years." 
  • Ardipithecus ramidus - অ্যান গিবন্স, সায়েন্স ম্যাগাজিন
  • Ardipithecus: We Meet At Last - কার্ল জিমার

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]