অ্যালান কোয়াটারমেইন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অ্যালান কোয়াটারমেইন, শেষ মিনিট পর্যন্ত অপেহ্মা করছিল তার লোকজনকে গুলি করা জন্য নির্দেশ দিতে। "মাইওয়া'স রিভেঞ্জ (১৮৮৮) থেকে থুরে দে থুলসত্রুপ এই ভঙ্গিতে চিত্রটি অঙ্কন করেছেন।

অ্যালান কোয়াটারমেইন (ইংরেজি: Allan Quatermain) হচ্ছেন হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড রচিত কিং সলোমন'স মাইন এবং এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিভিন্ন খণ্ডের প্রধান চরিত্র। অ্যালান কোয়াটারমেইন এই সিরিজের একটি বইয়েরও নাম ছিল।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

কোয়াটারমেইন চরিত্রটি আফ্রিকার দক্ষিণাংশের একজন ইংরেজ পেশাদার পশু শিকারী এবং ব্যবসায়ী। তিনি সভ্যতার আলো অন্ধকার মহাদেশে ছড়িয়ে দেবার ঔপনিবেশিক প্রচেষ্টার সমর্থক, এবং আফ্রিকান অধিবাসীদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তাদের নিজেদের মত থাকা সমর্থন করেন। কোয়াটারমেইনের কাছে ইংরেজ শহর এবং আবহাওয়া অসহ্য বোধ হয়, কারন তিনি একজন বহির্মুখী মানুষ। যে আফ্রিকাতে তিনি ছোটবেলায় তার বিপত্নীক খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারক বাবার আদরে মানুষ হয়েছেন, সেখানেই তিনি সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রথম দিকের উপন্যাসগুলোতে আফ্রিকান আদিবাসীরা কোয়াটারমেইনকে মাকুমাজন বলে সম্বোধন করে, যার অর্থ "রাতের প্রহরী", যেটা তার নৈশকালীন অভ্যাস এবং তীক্ষ্ণ বিবেচনাবোধের পরিচায়ক। পরবর্তীকালে মাকুমাজনকে মাকুমাজনার সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে দেখান হয়েছে, যার অর্থ "উৎকৃষ্ট মানব"। কোয়াটারমেইনের পার্শ্বচর হিসেবে প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় হটেনটট হানস এর উপস্থিতি, যে কিনা একজন বিচক্ষন এবং দায়িত্বশীল ভৃত্য। তার শ্লেষাত্মক উক্তিগুলোতে ইউরোপিয়ান আদব কায়দার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ পায়। তার শেষ অভিযানে কোয়াটারমেইনের সঙ্গী হন দুজন ব্রিটিশ, স্যার হেনরি কার্টিস ও রয়াল নেভির ক্যাপ্টেন জন গুড এবং আফ্রিকান বন্ধু উমস্লপোগাস।

চরিত্র এবং বেশভূষা[সম্পাদনা]

কোয়াটারমেইন হলেন প্রবীণ, খর্বাকৃতি, শীর্ণ, এবং আকর্ষণহীন চেহারার অধিকারী। তার দাড়ি এবং খাড়া চুল ছিল। তাঁর যে বৈশিষ্ট্যটি সবার চোখে পরে তা হল তার অব্যর্থ নিশানা। লক্ষ্যভেদে তাঁর তুলনা ছিলেন তিনি নিজেই। কোয়াটারমেইন জানতেন, তাঁর প্রিয় আফ্রিকান বনানীকে ধ্বংসের পিছে তাঁর মত শিকারীদের ভূমিকা অনেক বেশি। জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে আসার পর তিনি যখন দেখলেন যে তাঁর কাছে জীবিকা নির্বাহের আর কোন উপায় নেই, তখন তিনি বাধ্য হলেন শিকার চালিয়ে যেতে।
কোয়াটারমেইনের পরিবারের ব্যাপারে খুব সামান্যই জানা যায়। তিমি ডারবানে বাস করেন, যা দক্ষিণ আফ্রিকার নাটালের অন্তর্গত। দুবার বিয়ে করা সত্ত্বেও কোনবারই বেশিদিন স্ত্রীর সাহচর্য ভোগ করতে পারেননি। খুব দ্রুত তা স্ত্রীরা পৃথিবী ত্যাগ করেন। তাঁর আদরের পুত্র ছিল হ্যারি। হ্যারির মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাচ্ছন্ন হন, যার প্রকাশ ফুটে উঠে অ্যালান কোয়াটারমেইন নামের উপন্যাসে। হ্যারি কোয়াটারমেইন চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থী হিসেবে একটি হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। লেখক কোয়াটারমেইনের উপন্যাসগুলো ধারাবাহিকভাবে না লেখার কারনে কিছু জায়গায় ত্রুটি দেখা দিয়েছে।

ধারা[সম্পাদনা]

হ্যাগার্ডের কোয়াটারমেইন উপন্যাসগুলোর মধ্যে কয়েকটি গুচ্ছবিহীন হলেও এই উপন্যাসগুলোর মধ্যে দুটি পৃথক ধারা লক্ষণীয়। যুলু ত্রয়ীর অন্তর্গত মারী (১৯১২), চাইল্ড অভ স্টর্ম (১৯১৩) এবং ফিনিশডে (১৯১৭) দেখা যায়, যিকালির প্রতিশোধের ফাঁদে আটকা পরেন কোয়াটারমেইন। যিকালি ছিল এক বামন ওঝা যে পরিচিত ছিল "যার কখনো জন্ম হওয়া উচিত ছিল না" এবং " "পথোন্মোচনকারী" হিসেবে। যিকালি, যুলু সেনযাঙ্গাকোনা রাজবংশের উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত সফলকামও হয়।

অ্যালান কোয়াটারমেইন (১৮৮৭)[সম্পাদনা]

এই উপন্যাসের শুরুতে কোয়াটারমেইন তাঁর একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হন এবং প্রকৃতির আহ্বানে সাড়া দিতে ব্যকুল হয়ে পড়েন। স্যার হেনরি কার্টিস, ক্যাপ্টেন জন গুড, এবং যুলু সর্দার উমস্লপোগাসকে রাজি করিয়ে তিনি তাদের নিয়ে পূর্ব আফ্রিকার তীর থেকে মাসাই সাম্রাজ্যের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। পথে স্কটিশ মিশনারিদের সাথে অবস্থানকালীন সময়ে মাসাই দল কর্তৃক আক্রান্ত হলেও তাঁরা বীরত্বের সাথে তাদের প্রতিহত করতে সমর্থ হন। ক্যানূ দিয়ে তাঁরা একটি পাতাল নদী অতিক্রম করেন এবং একসময় পর্বতশ্রেণীর অন্য পাশে অবস্থিত যু-ভেন্ডিস রাজ্যে প্রবেশ করেন। যু-ভেন্ডিরা যুদ্ধংদেহী শ্বেতকায় জাতি যারা অন্য আফ্রিকান জাতিদের থেকে বিচ্ছিন্ন। ব্রিটিশ অভিযাত্রীরা যখন সেখানে পৌঁছান, তখন যু-ভেন্ডিস নাইলেপথা এবং সোরাইস এই দুই বোন দ্বারা শাসিত হত। যু-ভেন্ডি ধর্মের পুরোহিতরা বিরুদ্ধাচরণ করা সত্ত্বেও অভিযাত্রীরা রানীদ্বয়ের কারনে রক্ষা পান।
দুই বোনই একসাথে কার্টিসের প্রেমে পরে যায়। এদিকে নাস্টা, নাইলেপথা যার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, এই সুযোগে একটি গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। (এ যুদ্ধে সোরাইস এবং নাস্টার সৈন্যরা নাইলেপথা, কার্টিস এবং কোয়াটামেইনের বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে।) একটি খণ্ডযুদ্ধে সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও নাইলেপথার বাহিনী জয়ী হয়; এরপর কপট পুরোহিতরা তাকে প্রাসাদে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। উমস্লপোগাস এবং একজন বিশ্বস্ত যোদ্ধা তাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়, এবং তা করতে গিয়ে তারা নাস্টা ও প্রধান পুরোহিত অ্যাগনকে হত্যা করে। বিজিত এবং ঈর্ষান্বিত সোরাইস আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কার্টিস এবং নাইলেপথা এরপর রাজা-রানীর পদ গ্রহন করে। যুদ্ধের জখমের কারণে কোয়াটারমেইনের মৃত্যু হয়।

কোয়াটারমেইন সিরিজের সময়ানুক্রমিক ধারা[সম্পাদনা]

অ্যালান কোয়াটারমেইনের জীবনে ঘটনার তারিখসমূহ নিন্মে দেওয়া হলঃ[১]

চিত্রে অ্যালান কোয়াটারমেইন (মঝে), তার লোকজন হাতির দাঁত কাধে করে নিয়ে তাকে মাইওয়া'স রিভেঞ্জ: অর, দ্য ওয়ার অভ দ্য লিটল হ্যান্ড এ অনুসরণ করছে। - চিত্রটি অঙ্কন করেছেন থুরে দে থুলসত্রুপ

১৮১৭: অ্যালান কোয়াটারমেইনের জন্ম

  • ১৮৩৫–১৮৩৮: মারী (১৯১২)
  • ১৮৪২–১৮৪৩: "অ্যালান'স ওয়াইফ", অ্যালান'স ওয়াইফ (১৮৮৭) গল্পগুচ্ছের শিরোনাম গল্প
  • ১৮৫৪–১৮৫৬: চাইল্ড অভ স্টর্ম (১৯১৩)
  • ১৮৫৮: "আ টেইল অভ থ্রি লায়নস", অ্যালান'স ওয়াইফ (১৮৮৭) গল্পগুচ্ছের অন্তর্গত
  • ১৮৫৯: মাইওয়া'স রিভেঞ্জ: অর, দ্য ওয়ার অভ দ্য লিটল হ্যান্ড (১৮৮৮)
  • ১৮৬৮: "হান্টার কোয়াটারমেইন'স স্টোরি", অ্যালান'স ওয়াইফ (১৮৮৭) গল্পগুচ্ছের অন্তর্গত
  • ১৮৬৯: "লং অডস", অ্যালান'স ওয়াইফ (১৮৮৭) গল্পগুচ্ছের অন্তর্গত
  • ১৮৭০: দ্য হোলি ফ্লাওয়ার (১৯১৫)
  • ১৮৭১: হেউ-হেউ: অর, দ্য মনস্টার (১৯২৪)
  • ১৮৭২: শি অ্যান্ড অ্যালান (১৯২০)
  • ১৮৭৩: দ্য ট্রেজার অভ দ্য লেইক (১৯২৬)
  • ১৮৭৪: দ্য আইভরি চাইল্ড (১৯১৬)
  • ১৮৭৯: ফিনিশড (১৯১৭)
  • ১৮৭৯: "মাগেপা দ্য বাক", স্মিথ অ্যান্ড দ্য ফারাওস (১৯২০) গল্পগুচ্ছের অন্তর্গত
  • ১৮৮০: কিং সলোমন'স মাইনস (১৮৮৫)
  • ১৮৮২: দ্য এইনশান্ট অ্যালান (১৯২০)
  • ১৮৮৩: অ্যালান অ্যান্ড দ্য আইস-গডস (১৯২৭)
  • ১৮৮৪–১৮৮৫: অ্যালান কোয়াটারমেইন (১৮৮৭)

১৮ জুন ১৮৮৫: অ্যলান কোয়াটারমেইনের মৃত্যু

অন্যান্য শিল্পমাধ্যমে কোয়াটারমেইনের ব্যবহার[সম্পাদনা]

অ্যালান কোয়াটারমেইন চরিত্রটি আধুনিক যুগের সাহিত্যিকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা সম্ভবত হ্যাগার্ডের রচনা উন্মুক্ত সম্পত্তিতে (শার্লক হোমসের মত) পরিণত হওয়ার ফলে সম্ভব হয়েছে।

প্রভাবকরূপে[সম্পাদনা]

আমেরিকান সিনেমার চরিত্র ইন্ডিয়ানা জোনসের অনুপ্রেরণা ছিল হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের কিং সলোমন'স মাইনস এবং অ্যালান কোয়াটারমেইনের রোমাঞ্চ নায়ক কোয়াটারমেইন। রেইডারস অভ দ্য লস্ট আর্ক, টেম্পল অভ ডূম, ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য ল্যাস্ট ক্রুসেইড এবং কিংডম অভ দ্য ক্রিস্টাল স্কাল

কিং সলোমন'স মাইনস উপন্যাসে বর্ণিত সলোমনের গুপ্তধনে যাবার রাস্তাটাই চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়েছে; বিশেষভাবে শেবার চূড়া এবং থ্রি উইচেস মাউন্টেনে যাবার রাস্তা।

হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড রচিত[সম্পাদনা]

  1. কিং সলোমন'স মাইনস (১৮৮৫)
  2. অ্যালান কোয়াটারমেইন (১৮৮৭)
  3. অ্যালান'স ওয়াইফ (১৮৮৭)
  1. "অ্যালান'স ওয়াইফ"
  2. "হান্টার কোয়াটারমেইন'স স্টোরি"
  3. "আ টেইল অভ থ্রি লায়নস"
  4. "লং অডস"
  1. মাইওয়া'স রিভেঞ্জ: অর, দ্য ওয়ার অভ দ্য লিটল হ্যান্ড (১৮৮৮)
  2. মারী (১৯১২)
  3. চাইল্ড অভ স্টর্ম (১৯১৩)
  4. দ্য হোলি ফ্লাওয়ার (১৯১৫) (প্রথম ধারাবাহিকভাবে উইন্ডসর মাগাজিনে ডিসেম্বর ১৯১৩-নভেম্বর ১৯১৪ প্রকাশিত)
  5. দ্য আইভরি চাইল্ড (১৯১৬)
  6. ফিনিশড (১৯১৭)
  7. দ্য এইনশান্ট অ্যালান (১৯২০)
  8. শি অ্যান্ড অ্যালান (১৯২০)
  9. হেউ-হেউ: অর, দ্য মনস্টার (১৯২৪)
  10. দ্য ট্রেজার অভ দ্য লেইক (১৯২৬)
  11. অ্যালান অ্যান্ড দ্য আইস-গডস (১৯২৭)
  12. হান্টার কোয়াটারমেইন'স স্টোরি: দ্য আনকালেক্টেড অ্যাডভেঞ্চারস অভ অ্যালান কোয়াটারমেইন (কালেকশন, ২০০৩)
  1. "হান্টার কোয়াটারমেইন'স স্টোরি" (ইন অ্যা গুড কজেে প্রথম প্রকাশিত , ১৮৮৫)
  2. "লং অডস" (ম্যাকমিলান'স মাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত, ফেব্রুয়ারি ১৮৮৬)
  3. "আ টেইল অভ থ্রি লায়নস" (আটল্যান্টা মাগাজিনে প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত, অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৮৮৭)
  4. "মাগেপা দ্য বাক" (পীয়ার'স অ্যানুয়ালে প্রথম প্রকাশিত, ১৯১২)

অ্যালান মূর রচিত[সম্পাদনা]

  1. "দ্য লীগ অভ এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টলমেন, ভলিউম ১"
  2. "দ্য লীগ অভ এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টলমেন, ভলিউম ২"

কেন্ট মিলার রচিত[সম্পাদনা]

  1. "দ্য গ্রেইট ডিটেকটিভ অ্যাট দ্য ক্রুসিবল অভ লাইফ; অর, দ্য অ্যাডভেঞ্চার অভ দ্য রোজ অভ ফায়ার" ২০০৫
  2. "অ্যালান কোয়াটারমেইন অ্যাট দ্য ক্রুসিবল অভ লাইফ" ২০১১

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. From J. E. Scott, "A Note Concerning the Late Mr Allan Quatermain", in A Bibliography of the Works of Sir Henry Haggard 1856–1925, London: Elkin Mathews Ltd, 1947.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]