অপারেশন জ্যাকপট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

অপারেশন জ্যাকপট বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নৌ-সেক্টর পরিচালিত সফলতম গেরিলা অপারেশন। এটি ছিল একটি আত্মঘাতী অপারেশন। এ অপারেশন ১৯৭১ এর ১৫ আগস্ট রাত ১২টার পর অর্থাৎ ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে চট্টগ্রামমংলা সমুদ্র বন্দর এবং দেশের অভ্যন্তরে আরো কয়েকটি নদী বন্দরে একই সময়ে পরিচালিত হয়[১]। ১০নং সেক্টরের অধীনে ট্রেনিং প্রাপ্ত নৌ কমান্ডো যোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার নিদর্শন এই অপারেশন জ্যাকপট। এই গেরিলা অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেকগুলো অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বড় রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্যকারী অনেকগুলো বিদেশি জাহাজও থাকায় এই অপারেশন বাংলাদেশের যুদ্ধ এবং যোদ্ধাদেরকে সারা বিশ্বে পরিচিতি পাইয়ে দেয়।

Operation Jackpot
মূল যুদ্ধ: Bangladesh Liberation War and Indo-Pakistan War of 1971
চিত্র:Bansec71.PNG
Partial representation of Operation Jackpot setup in November 1971. Some of the location are indicative because of lack of primary data.
সময়কাল May 15, 1971 – December 16, 1971[২]
অবস্থান Bangladesh, then East Pakistan
ফলাফল মুক্তিবাহিনীর জন্য প্রশিক্ষন এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম সরবরাহ
• পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর শক্তিমত্তার প্রদর্শন
• পাকিস্তানী নৌবাহিনীকে দূর্বল করা
অধিকৃত
এলাকার
পরিবর্তন
Bangladesh
বিবদমান পক্ষ
 বাংলাদেশ
 ভারত
 পাকিস্তান
নেতৃত্ব প্রদানকারী
ভারতLt. Gen. B. N. Jimmy Sarkar[৩] Lt. Gen. Jagjit Singh Aurora
বাংলাদেশ Col. M. A. G. Osmani
Flag of the Pakistani Army.svg Lt. Gen. A. A. K. Niazi
Naval Jack of Pakistan.svg RAdm M. Shariff
Flag of the Pakistani Army.svg BGen Bill Harrison
Naval Jack of Pakistan.svg CDRE David R. Felix
সৈন্য সংখ্যা
Indian Army:[৪]
Brigadier B. C. Joshi – Alpha Sector
Brigadier Prem Singh – Bravo Sector
Brigadier N. A. Salik – Charlie Sector
Brigadier Shahbed Singh – Delta Sector Sector
Brigadier M. B. Wadh – Echo Sector
Brigadier Sant Singh – Foxtrot Sector

Mukti Bahini :[৫]
Sector No. 1 – Major Rafiqul Islam
Sector No. 2 – Lt. Col. Khaled Musharraf
Sector No. 3 – Lt. Col. K M Shafiullah
Sector No. 4 – Col. C. R. Dutta
Sector No. 5 – Lt. Col. Mir Shawkat Ali
Sector No. 6 Wing Commander M. K. Basher
Sector No. 7 – Lt. Col. Q. N. Zaman
Sector No. 8 – Major Abu Osman Chowdhury
Sector No. 9—Major Md Jalil
Sector No. 10: Naval Commando: Col. M. A. G. Osmani
Sector No. 11 – Lt. Col. Abu Taher

Pakistan Army:
14th Infantry Division
9th Infantry Division
16th Infantry Division
39th Ad hoc Infantry Division
36th Ad Hoc Infantry Division
97th Independent Infantry Brigade
40th Army Logistic Brigade
4th Army Aviation Squadron
Pakistan Navy:
Pakistan Naval SEALs
Pakistan Marine Corps
17th Naval SD Squadron
Pakistan Air Force:
No. 14 Squadron

Paramilitary Forces:
East Pakistan Civil Armed Force: 6 Sector HQ wings, 17 operational Wings[৬]
Razakars

পরিচ্ছেদসমূহ

[সম্পাদনা] নৌ-কমান্ডো সেক্টর

বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল তার মধ্য দেশের অভ্যন্তরীন সকল নৌ চলাচল, বন্দর এবং উপকূলীয় এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছিল ১০নং সেক্টর বা নৌ সেক্টর। এ সেক্টরের কোন নির্দিষ্ট সেক্টর কমান্ডার ছিল না। যখন যে সেক্টরে অপারেশন চলত তখন সেই সেক্টরের কমান্ডারদের সহযোগীতায় নৌ-গেরিলাদের কাজ করতে হত। তারা সরাসরি মুজিবনগর হেডকোয়ার্টারের অধীনে কাজ করতেন।

[সম্পাদনা] পেছনের কথা

মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরো ফ্রান্সের তুলন সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে যায় পাকিস্তানি সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্য। সেই ৪১ জন সাবমেরিনারদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি অফিসার। তারা আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা শুনে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে ৮ জন ৩০ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১ তারা দিল্লিতে এসে পৌছান[৭]। এখানে তাদের নাম উল্লেখ করা হলোঃ-[৮]

  1. মোঃ রহমতউল্লাহ।
  2. মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন।
  3. মোঃ শেখ আমানউল্লাহ।
  4. মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
  5. মোঃ আহসানউল্লাহ।
  6. মোঃ আবদুর রকিব মিয়া।
  7. মো আবদুর রহমান আবেদ।
  8. মোঃ বদিউল আলম।

তারপর উক্ত ৮জনের সাথে আরো কয়েকজনকে একত্র করে ২০ জনের একটি গেরিলা দল গঠন করে তাদের ভারতে বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। তারপর তারা দেশে আসলে তাদের সাথে কর্নেল ওসমানীর দেখা করানো হয়। তখন ওসমানী নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

[সম্পাদনা] গেরিলা ট্রেনিং পর্ব

ওসমানীর সিদ্ধান্তে নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলার পর বাছাইকৃত গেরিলাদের ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে ২৩ মে ১৯৭১ তারিখে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় সি-২ পি (C-2 P)। এখানে ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে অন্যান্য সেক্টরসমূহের বিভিন্ন শিবির থেকে জুন মাসের শুরুর দিকে প্রায় ৩০০ জন বাছাইকৃত যোদ্ধা সংগ্রহ করা হয়[৯]। ট্রেনিং ক্যাম্পে এদের কি ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে সে বিষয়টি এতই গোপনীয় ছিল যে, সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যেও শুধুমাত্র যার এলাকায় অপারেশন চালানো হবে তিনি ব্যাতিত আর কেউ এই সম্পর্কে জানতেন না[১০]

ট্রেনিং শুরু হবার আগেই বাছাইকৃত যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয় যে এটি একটি সুইসাইডাল অপারেশন বা আত্মঘাতী যুদ্ধ হবে। তাই অপারেশনের সময় যেকোন মূল্যে অপারেশন সফল করারা উদ্দেশ্যে প্রয়োজনে তাদের প্রাণ দিতে হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীদের ছবি সহ একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর নেয়া হতো।ফর্মে লেখা থাকতো যে, আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।[১১]

নৌ-কমান্ডোদের ঐ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার লেঃ কমান্ডার জি এম মার্টিস। প্রশিক্ষকদের মধ্যে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন সাব-মেরিনার ছাড়াও আরো ছিলেন মিঃ গুপ্ত, পি কে ভট্টাচার্য, কে সিং, এল সিং, মারাঠি নানা বুজ এবং সমীর কুমার দাশসহ আরো কয়েকজন[৮]

ট্রেনিং এর দুটো অংশ ছিল। সবাইকে প্রয়োজনীয় স্থলযুদ্ধ যেমনঃ- গ্রেনেড নিক্ষেপ, এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার, স্টেনগান রিভলবার চালানো, আন-আর্মড কমব্যাট(খালি হাতে যুদ্ধ) ইত্যাদি শিখতে হতো। আর জলযুদ্ধের ট্রেনিঙের মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের সাতার যেমনঃ- বুকে ৫-৬কেজি ওজনের পাথর বেধে সাতার, চিৎ সাতার, কোন মতে পানির উপরে নাক ভাসিয়ে একটানা অনেক্ষন সাতার, পানিতে সাতরিয়ে এবং ডুব সাতার দিয়ে লিমপেট মাইন ব্যবহার, স্রোতের প্রতিকূলে সাতার, জাহাজের কেবল ভাঙা ইত্যাদি কঠিন সব প্রশিক্ষণ দেয়া হত তীব্র খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে। শীত-বর্ষায় একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করতে হয় সব যোদ্ধাকে[১২]

প্রায় টানা দু'মাস ট্রেনিঙের পর আগস্টের প্রথম সাপ্তাহে তাদের ট্রেনিং শেষ হয়।

[সম্পাদনা] অপারেশনের বর্ণনা

যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের শেষদিকে এসে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজানো হতে থাকে। একই সাথে একই সময়ে দুই সমুদ্র বন্দর ও দুই নদী বন্দরে আক্রমণ চালানোর জন্য চার সেক্টরের পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটানো হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রথম ব্যাচকে চার স্থানে আক্রমণের উদ্দেশ্যে মোট চারটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। ৬০ জনের ২টি দল এবং ২০ জনের আরো ২টি দল। চারটি দলের চারজন লিডার ঠিক করে দেয়া হয়েছিল। টিম লিডারদের অপারেশন পরিচালনার জন্য শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল বিশেষ গোপনীয় পদ্ধতি যা টিমের অন্যান্য সদস্যদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল[৮]। টিম লিডারদের বলা হয়েছিল যে, দুটি পুরোনো দিনের বাংলা গানকে সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গান দুটি প্রচার করা হবে কলকাতা আকাশবানীর আলাদা দুটি ফ্রিকোয়েন্সি থেকে,যেই ফ্রিকোয়েন্সি শুধু টিমের টিম লিডাররাই জানতো[১০]। গানদুটি ও তাদের সঙ্কেত হলোঃ-

  1. আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান,তার বদলে চাইনি প্রতিদান......। এটি হবে প্রথম সঙ্কেত, এর অর্থ হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২য় গান প্রচার হবে। এর মধ্যে আক্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন কর।
  2. আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শশুড় বাড়ি......। এটি ২য় এবং চূড়ান্ত সঙ্কেত, অর্থাৎ সুস্পষ্ট নির্দেশ যে নির্ধারিত সময়ে যে ভাবেই হোক আক্রমণ করতে হবে।[১০] [১৩]

দলগুলোর গ্রুপ লিডারদের নাম ও তাদের গন্তব্যগুলো হলঃ-

  • গ্রুপ ১- গ্রুপ লিডারঃ সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। সদস্য সংখ্যাঃ ৬০ । গন্তব্যঃ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর
  • গ্রুপ ২- গ্রুপ লিডারঃ সাবমেরিনার আমান উল্লাহ শেখ। সদস্য সংখ্যাঃ ৬০ । গন্তব্যঃ মংলা সমুদ্র বন্দর
  • গ্রুপ ৩- গ্রুপ লিডারঃ সাবমেরিনার বদিউল আলম। সদস্য সংখ্যাঃ ২০ । গন্তব্যঃ চাঁদপুর নদী বন্দর ।
  • গ্রুপ ৪- গ্রুপ লিডারঃ সাবমেরিনার আবদুর রহমান। সদস্য সংখ্যাঃ ২০ । গন্তব্যঃ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর ।[৮]

যাত্রা শুরু হয়েছিল পলাশির হরিনা ক্যাম্প থেকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, তারা একযোগে পৌছে যাবেন স্ব স্ব এলাকা চট্টগ্রাম,খুলনা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ।তারা যাত্রা করার সময় তাদেরকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিয়ে দেয়া হয়। প্রত্যেক নৌ-কমান্ডোকে একটি করে লিমপেট মাইন,ছুরি,একজোড়া সাঁতারের ফিন আর কিছু শুকনো খাবার দেয়া হয়। প্রতি তিন জনের জন্য একটি করে স্টেনগান এবং গ্রুপ লিডারদের দেয়া হয় একটি করে ট্রানজিস্টার। অপারেশনের দিন ধার্য করা হয়েছিল ১৪ আগস্ট অর্থাৎ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। তবে সূদূর পলাশী থেকে গন্তব্যস্থলে পৌছাতে বা পথের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠার সমস্যার কারণে এসব অভিযান দু'এক দিন বিলম্ব হয়।

এখানে অপারশনগুলোর বর্ননা দেয়া হলঃ

[সম্পাদনা] চট্টগ্রাম বন্দর অপারেশন

চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন পরিচালিত হয় ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে অর্থাৎ ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে।

হরিনা ক্যাম্প থেকে আগত ৬০ জনের দলকে ২০ জন করে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়। ১ ও ২ নং দল তাদের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট বেইজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এবং ১৪ আগস্ট তারা প্রথম গানের সংকেত পায়। এই সংকেত পাবার পর তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীরে চরলক্ষ্যায় তাদের বেইজ ক্যাম্পে পৌছায়। ৩য় দলটির তখনো কোন খবর পাওয়া যায় নি। এরপর ১৫ আগস্ট তারা ট্রানজিস্টারে চূড়ান্ত সংকেত পায়, এবং অপারেশনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এ অপারেশনে ৩১ জন কমান্ডো যোদ্ধা অংশ নেয়। ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে রাত ১টায় নৌ-কমান্ডোরা তাদের অপারেশনের জন্য যাত্রা করে। রাত ১টা ১৫ তে তারা পানিতে নেমে জাহাজের উদ্দেশ্যে সাঁতরানো শুরু করে, এবং বেশ দ্রুততার সাথে নিজ নিজ বাছাইকৃত টার্গেট জাহাজসমূহের গায়ে মাইন লাগিয়ে সাঁতার কেটে সরে পরে। রাত ১টা ৪০ মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। তারপর একে একে সব গুলো মাইন বিস্ফোরিত হয়[১০]। এ সফল অপারেশনে তিনটি বড় অস্ত্রবাহী জাহাজ এবং একটি সোমালি জাহাজসহ আরো অনেকগুলো জাহাজ ধ্বংস্প্রাপ্ত হয়। বড় জাহাজ গুলো হলোঃ

  1. এম ভি হরমুজ। এটি ১৪ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ৯৯১০ টন অস্ত্রসম্ভারবাহী এই জাহাজটি ১৩ নং জেটিতে নোঙর করা ছিল।
  2. এম ভি আল-আব্বাস। এটি ১০৪১৮ টন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ৯ আগস্ট ১২ নং জেটিতে অবস্থান নেয়।
  3. ওরিয়েন্ট বার্জ নং ৬ । এটি ৬২৭৬ টন অস্ত্র,গোলাবারুদ নিয়ে ফিস হারবার জেটির সামনে অবস্থান করছিল[১০]

[সম্পাদনা] মংলা বন্দর অপারেশন

১৬ আগস্ট একই সাথে মংলা বন্দরেও অপারেশন হয়। এ অপারেশনে ৬০ জন অংশ নেন। তারা বন্দরে অবস্থানরত ২টি মারাঠি, ২টি চীনা, ১টি জাপানী ও ১টি পাকিস্তানি অর্থাৎ মোট ৬টি জাহাজ এবং আরো কিছু নৌযান ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হন[১০]

[সম্পাদনা] চাঁদপুর অপারেশন

Op jackpot.JPG


এটিও ১৯৭১ এর ১৫ আগস্ট মধ্যরাত বা ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে হয়েছিল। এ অপারেশনে ১৮জন নৌ-কমান্ডো অংশ নেন। এ গ্রুপের ১৮ জনকে তিনজন করে মোট ৬টি ছোট দলে ভাগ করা হয়[৮]। এই অভিযানে মাইন বিস্ফোরণে ২টি স্টিমার, গমবাহী একটি জাহাজ সহ ছোট বড় আরো অনেকগুলো নৌযান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়[৮]

[সম্পাদনা] নারায়ণগঞ্জ অপারেশন

১৬ তারিখের এ অপারেশনে ২০ জন অংশ নেন এবং ৪টি জাহাজ ডুবিয়ে দেন ও আরো কিছু নৌ-যান ক্ষতিগ্রস্ত করেন।

[সম্পাদনা] ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ

১৫ আগস্টের ঐ অপারেশন গুলোতেই প্রায় ২৬টি জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং আরো অনেক নৌযান ক্ষতিগ্রস্থ হয়[১৩]

আগস্ট মাসের এসব অপারেশন ছাড়াও আগস্ট-নভেম্বর মাসব্যাপী আরো অনেকগুলো নৌ-কমান্ডো অপারেশন পরিচালনা করা হয়। এসব অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হলঃ

  1. প্রায় সর্বমোট ৫০৮০০ টন জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিমজ্জিত।
  2. ৬৬০৪০ টন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত।
  3. এবং বেশ কিছু সংখ্যক পাকিস্তানি নৌযান বাংলাদেশী নৌ-কমান্ডোদের হস্তগত।[১৪]

[সম্পাদনা] অপারেশনের মূল্যায়ন

নৌ কমান্ড মিশনগুলোর সবগুলোই কিন্তু সাফল্যের মুখ দেখেনি । অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের পর পাহারা শক্তিশালী করায় চট্টগ্রামে আর কোন অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি[১৫], যার ফলে চারবার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংস করার চেষ্টা করা হলেও তা বিফলে যায় । [১৬] কয়েকটি কমান্ডো দল শত্রুপক্ষের এম্বুশের কবলে পড়ে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। [১৭] দূর্ভাগ্য ও ভুল হিসাবের কারনেও কিছু অভিযান বিফল হয় । [১৮] শত্রুপক্ষ তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করায় নারায়নগঞ্জ, বগুরা, ফরিদপুর এবং চট্টগ্রাম এর তেলের ডিপোগুলো স্যাবোটাজ করা সম্ভব হয়নি । যদিও পরবর্তীতে মুক্তিবাহিনি হেলিকপ্টার এবং টুইন অট্টার বিমানের সাহায্যে ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম এবং নারায়নগঞ্জের তেল ডিপো দুটো ধ্বংস করতে সক্ষম হয় ।

মোট ৫১৫ জন কমান্ডো সিটুপি (C2P) থেকে প্রশিক্ষন নেন । আটজন কমান্ডো শহীদ হন, ৩৪ জন আহত হন এবং আগস্ট-ডিসেম্বরের মাঝে ১৫ জন কমান্ডো শত্রুর হাতে ধরা পড়েন । [১৯] এই সময় কালের ভেতর নৌ কমান্ডোরা প্রায় ১২৬ টি জাহাজ / কোস্টার/ ফেরি নষ্ট বা ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হন, এবং এক সুত্র মোতাবেক অগাস্ট-নভেম্বর ১৯৭১ এই সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ৬৫টি বিভিন্ন ধরনের নৌযান (১৫ টি পাকিস্তানী জাহাজ, ১১ টি কোস্টার, ৭ টি গানবোট, ১১ টি বার্জ, ২ টি ট্যাংকার এবং ১৯টি সাধারন নৌযান) [২০] তারা ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হন । কমপক্ষে ১০০,০০০ টন নৌযান ডুবিয়ে বা বিকল করে দেয়া হয়, জেটি এবং বন্দর অকার্যকর করে দেয়া হয় এবং চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় । কোনো নিজস্ব সামরিক নৌযান না থাকা সত্তেও , নৌ কমান্ডোরা তদানিং পুর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) নৌপথকে একরকম নিজেদের দখলেই রেখেছিলো [২১]

[সম্পাদনা] অপারেশন 'হটপ্যান্টস

১৬ অগাস্ট এর অপারেশনের পর, সকল কমান্ডো ভারতে ফেরত যায় । এর পরে নৌকমান্ডোরা আর কোন পূর্ব-পরিকল্পিত এবং একযোগে অভিযান পরিচালনা করেননি । তার বদলে, ছোট ছোট দল পাঠানো হতো কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে, এবং সুযোগ পেলেই কমান্ডোরা সেখানে আক্রমন চালাতেন । মেজর জলিল, মুক্তিবাহিনীর সেক্টর ৯ এর কমান্ডার, অগাস্ট মাসে তত্কালীন বাংলাদেশ সরকার প্রধান তাজউদ্দীন আহমদ কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছিলেন একটি নৌ ইউনিট এর গোড়াপত্তন করার [২২] এবং সেই মোতাবেক কমান্ডার এম এন সামান্থ এর কাছে ৪টি গানবোটের জন্য আবেদন করেছিলেন । ১৯৭১ সালের অক্টোবার মাসে কোলকাতা বন্দর ট্রাস্ট ২টি টহলযান (অজয় এবং অক্ষয়) মুক্তিবাহিনীকে দান করে । ৩৮ লাখ ভারতীয় রুপি খরচায় নৌযান দুটি ক্ষিদিরপুর ডকইয়ার্ডে একমাস ধরে মেরামত করা হয় [২৩] যা পরবর্তীতে ২ টি কানাডিয়ান ৪০X৬০ মিমি বোফর গান এবং ২টি হালকা ইঞ্জিন এবং ৮ টি গ্রাউন্ড মাইন (ডেকের দুই পাশে চারটি করে) এবং উপরন্ত আরো ১১টি গ্রাউন্ড মাইন দ্বারা সজ্জিত করা হয় । [২৪] তাদের নতুন নাম দেয়া হয় বিএনএস পদ্মা এবং পলাশ, এবং তাতে মোট ৪৪ জন বাংগালী নাবিক এবং ১২ জন নৌকমান্ডো ছিলেন । জাহাজ দুটোর নেতৃত্বে ছিলেন ভারতীর নৌবাহিনীর সদস্যরা এবং মুক্তিবাহিনীর কাছে তা পুরোপুরি হস্তান্তর করা হয় ৩০, অক্টোবর, ১৯৭১ সালে । প্রবাসী বাংলাদেশে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেইন কামরুজ্জামানের উপস্থিতিতে কোলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট চেয়ারম্যান মিঃ পি কে সেন জাহাজ দুটো কমিশন করেন। লেঃ কমান্ডার কেপি রায় এবং কে মিত্র ছিলেন জাহাজ দুটোর কমান্ডে নিয়োজিত । বাংলাদেশে নবগঠিত এই নৌবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিলো: [২৫]

  • ছালনা প্রবেশমুখ মাইন দ্বারা উড়িয়ে দেয়া
  • পাকিস্তানী জাহাজের উপর হামলা চালানো

ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট এর প্রহরায় , নভেম্বরের ১০ তারিখ জাহাজদুটি সফলভাবে মংলা বন্দরের প্রবেশমুখে মাইন দ্বারা আক্রমন চালাতে সক্ষম হয় । তার পরদিনই ১১ নভেম্বর , ১৯৭১ এ তারা ব্রিটিশ জাহাজ "দ্যা সিটি অফ সেইন্ট এলব্যান্স" কে মংলা বন্দর থেকে তাড়াতে সক্ষম হয় । [২৬]

[সম্পাদনা] অপারেশন জ্যাকপটে শহীদ হওয়া নৌ-কমান্ডোদের নাম

[২৭]

  • কমান্ডো আব্দুর রাকিব, ফুলছড়ি ঘাট অপারেশনে শহীদ হন
  • কমান্ডো হোসেইন ফরিদ, চট্টগ্রামে দ্বিতীয় অপারেশন চলাকালীন সময়ে পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। তিনি অপারেশনের সময় পাকিস্তানী আর্মির হাতে আটক হন এবং পরবর্তীতে পাক সেনারা তাকে ম্যানহোলে দেহের নিম্নভাগ ঢুকিয়ে মেরুদন্ড না ভাঙ্গা পর্যন্ত শরীর বেকিয়ে, নির্মমভাবে হত্যা করে ।
  • কমান্ডো খবিরউজ্জামান, ফরিদপুরের দ্বিতীয় অপারেশনে শহীদ হন
  • কমান্ডো সিরাজুল ইসলাম, এম আজিজ, আফতাব উদ্দিন এবং রফিকুল ইসলাম অপারেশন চলাকালীন নিখোঁজ হন ।

[সম্পাদনা] "জাতীয় বীর" খেতাব পাওয়া নৌ-কমান্ডোদের নাম

[২৮]

  • জনাব এ. ডাব্লিউ. চৌধুরী - বীর উত্তম
  • ডঃ শাহ আলম - বীর উত্তম
  • জনাব মাজহার উল্লাহ - বীর উত্তম
  • জনাব শেখ মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ - বীর উত্তম
  • জনাব আবেদুর রহমান - বীর উত্তম
  • জনাব মোশাররফ হোসেইন - বীর উত্তম (বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তার খেতাবটি বাতিল করে)
  • মোহাম্মদ খবিরউজ্জামান - বীর বীক্রম
  • জনাব মমিন উল্লাহ পাটওয়ারী - বীর প্রতীক
  • জনাব শাহজাহান কবীর - বীর প্রতীক
  • জনাব ফারুক-এ-আজম - বীর প্রতীক
  • মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ - বীর প্রতীক
  • মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেইন - বীর প্রতীক
  • আমির হোসেইন - বীর প্রতীক

[সম্পাদনা] তথ্যসূত্র

  1. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুহম্মদ জাফর ইকবাল(পৃ ১১)
  2. Islam, Major Rafiqul, A Tale of Millions, p. 211, ISBN 984-412-033-0
  3. Jacob, Lt. Gen. J. F. R., Surrender at Dacca: Birth of a Nation, p. 90, ISBN 984-401-322-4
  4. Shafiullah, Maj. Gen. K. M. Bangladesh At War, p. 159, ISBN 984-401-322-4
  5. Islam, Major Rafiqul, A Tale of Millions, p. 228–230, ISBN 984-412-033-0
  6. Jacob, Lt. Gen. J. F. R., Surrender At Dacca: The Birth of A Nation, p. 190, ISBN 984-05-1395-8
  7. সাখাওয়াত হোসেন মজনু. রণাঙ্গনে সূর্য সৈনিক. প্রকাশক: বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র,চট্টগ্রাম. 
  8. ৮.০ ৮.১ ৮.২ ৮.৩ ৮.৪ ৮.৫ শামসুল হুদা চৌধুরী. একাত্তরের রণাঙ্গন. প্রকাশক: আহমদ পাবলিশিং. আইএসবিএন 984-11-0505-0. 
  9. Siddiq Salik. Witness to surrender. প্রকাশক: The University Press Limited. 
  10. ১০.০ ১০.১ ১০.২ ১০.৩ ১০.৪ ১০.৫ রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে. প্রকাশক: অনন্যা প্রকাশনী. আইএসবিএন 984-412-033-0. 
  11. লে কর্নেল(অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী. এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম. প্রকাশক: নাজমহল. pp. পৃষ্ঠা ২৩১-২৩৭. 
  12. ডাঃ মাহফুজুর রহমান. বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম. প্রকাশক: বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র,চট্টগ্রাম. আইএসবিএন 984-8105-01-8. 
  13. ১৩.০ ১৩.১ খলিলুর রহমান (২০০৭). মুক্তিযুদ্ধে নৌ-অভিযান. প্রকাশক: সাহিত্য প্রকাশ. আইএসবিএন 984-465-449-1. 
  14. মঈদুল হাসান. মূলধারা '৭১. প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড. আইএসবিএন 984-05-0121-6. 
  15. Rahman, Md. Khalilur, Muktijuddhay Nou-Abhijan, p. 94
  16. Rahman, Md. Khalilur, Muktijuddhay Nou-Abhijan, pp. 220–223
  17. Rahman, Md. Khalilur, Muktijuddhay Nou-Abhijan, pp. 122, 196-198, 217
  18. Rahman, Md. Khalilur, Muktijuddhay Nou-Abhijan, p. 84, p. 119, p. 201
  19. Rahman, Md. Khalilur, Muktijuddhay Nou-Abhijan, pp. 268–270, ISBN 984-465-449-1
  20. Jacob, Lt. Gen. J. F. R., Surrender at Dacca, p. 91
  21. Ray, Vice Admiral Mihir K., War in the Indian Ocean, pp. 141, 174
  22. Mukul, MR Akthar, Ami Bejoy Dekhechi, p. 36
  23. Islam, Maj. Rafiqul, A Tale of Millions p. 298
  24. Rahman, Md. Khalilur, Muktijuddhay Nou-Abhijan, p. 227, ISBN 984-465-449-1
  25. Islam, Maj. Rafiqul, A Tale of Millions, p. 298
  26. Islam, Maj. Rafiqul, A Tale of Millions, p. 303
  27. Operation Jackpot, Mahmud, Sezan, Mukhobondho
  28. Operation Jackpot, Mahmud, Sezan, mukhobondho

[সম্পাদনা] আরো জানতে পড়ুন

Sezan Mahmud. Operation Jackpot. প্রকাশক: বাংলা প্রকাশ. আইএসবিএন 984-300-000-565-8. 

শামসুল হুদা চৌধুরী. একাত্তরের রণাঙ্গন. প্রকাশক: আহমদ পাবলিশিং. আইএসবিএন 984-11-0505-0. 

রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে. প্রকাশক: অনন্যা প্রকাশনী. আইএসবিএন 984-412-033-0. 

খলিলুর রহমান (২০০৭). মুক্তিযুদ্ধে নৌ-অভিযান. প্রকাশক: সাহিত্য প্রকাশ. আইএসবিএন 984-465-449-1. 

মোঃ মুমিনূর রহমান (ফেব্রুয়ারি ২০০২). মুক্তিযুদ্ধে ফ্রগম্যান. প্রকাশক: সময় প্রকাশন. আইএসবিএন 984-458-273-3. 

[সম্পাদনা] বহিঃসংযোগ

নিজস্ব হাতিয়ারসমূহ
নামস্থান

বিকল্পসমূহ
কার্যক্রম
পরিভ্রমন
মুদ্রণ/এক্সপোর্ট
সরঞ্জাম
অন্যান্য ভাষাসমূহ